প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের টাইগ্রে অঞ্চলের আলামাতা শহর ও এর আশপাশে তিন দিনের তীব্র সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই তথ্যটি হাসপাতাল সূত্রের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে। সংঘর্ষের পর সরকারি বাহিনী আলামাতা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহরের রাস্তায় সরকারি বাহিনীর ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান চলাচলের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
আলামাতা দখলের পর সরকারি বাহিনী টাইগ্রের প্রধান শহর মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেকেলে আলামাতা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলামাতা টাইগ্রে ও আমহারা অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা সামরিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েক মাস ধরে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও টাইগ্রে নিয়ন্ত্রণকারী টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। গত সপ্তাহে এই উত্তেজনা নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ২০২২ সালে দুই বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানে হওয়া প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তি ভঙ্গের জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। ২০২০-২২ সালের ওই যুদ্ধে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব রয়েছে।
সর্বশেষ সংঘাতটি শুধু টাইগ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পার্শ্ববর্তী আমহারা ও আফার অঞ্চলেও লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। টিপিএলএফসহ সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী চলতি মাসে একটি জোট গঠন করেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। আফার অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়াকে জিবুতি ও লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এদিকে সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য লালিবেলা শহরেও। সেখানে এক সপ্তাহ ধরে অন্তত ৩৩ জন বিদেশি পর্যটক আটকা পড়েছেন। ১৩ শতকে পাথর কেটে নির্মিত ১৩টি গির্জার জন্য বিখ্যাত লালিবেলা অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। সংঘর্ষের কারণে বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ পর্যটক শহর ছাড়তে পারেননি।
লালিবেলায় অবস্থানরত এক ব্রিটিশ পর্যটক বিবিসিকে জানান, "কয়েক দিন ধরে সেখানে গুলির শব্দ ও ভারী কামানের গোলাবর্ষণ শোনা গেছে।" শহরে সরকারি বাহিনীর বড় উপস্থিতিও রয়েছে। সোমবার সামরিক হেলিকপ্টারে ১৪ জন ইসরায়েলি পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে একটি বেসরকারি সংস্থার গাড়িবহরে আরও পাঁচজন শহর ছাড়েন। এখনো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশের নাগরিক সেখানে আটকা রয়েছেন।
আলামাতা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত শহর ও আশপাশে ব্যাপক গোলাবর্ষণ হয়েছে। ভারী কামান ও বিস্ফোরক ব্যবহারে আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিন দিন বয়সী শিশুসহ নারী ও গবাদিপশু চরানো মানুষও রয়েছেন। একটি হামলায় শহরের বাজারে একসঙ্গে ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে ওই চিকিৎসক জানান।
সংঘাতের মাত্রা বোঝা যায় চিকিৎসা সহায়তার পরিসর থেকেও। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে টাইগ্রের তাদের সহায়তাপ্রাপ্ত হাসপাতালগুলোতে ৭০০-এর বেশি আহত মানুষ ভর্তি হয়েছেন। যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
টাইগ্রেতে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি অঞ্চলটির বাইরে থাকা টাইগ্রিয়ানরাও সমস্যায় পড়েছেন। আলামাতায় পালিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু সেখানে বিদ্যুৎ, ফোন, ইন্টারনেট ও অর্থ লেনদেনের সেবা না থাকায় মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
নতুন সংঘাতের সূচনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। টিপিএলএফের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর হামলা ও ড্রোন হামলার জবাবেই তারা পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার সরকার বলছে, টিপিএলএফ যোদ্ধারাই প্রথম হামলা চালায় এবং কয়েকটি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংঘাত শুরু হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব দাবির স্বাধীন যাচাই কঠিন।
এদিকে সংঘাতে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। ইথিওপিয়া অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। তবে আসমারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল নতুন করে সংঘাত বন্ধ ও সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতের পর দুর্বল হয়ে পড়া টাইগ্রেতে আবারও খাদ্য, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও মানবিক সহায়তা সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন