প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও কিছু সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে যদি চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের হাতে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র থাকে এবং তারা সেটি ব্যবহার করে। সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময়ে নিয়োগ পাওয়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একটি অংশ চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে অবস্থান করেন। একই স্থানে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারেও পাল্টা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটে।
পরে চাকরিচ্যুত এস আলমের লোকজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেন। এরই মধ্যে চাকরিচ্যুতদের সিংহবাগই ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন তারা। পরে তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরিতে বহাল না থাকলে আইডি কার্ড ব্যবহার করা যায় না। যারা করছে তারা ঠিক করেনি।
ব্যাংকাররা জানান, চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ওই ব্যাংকের আইডি কার্ড ব্যবহার করা সরাসরি নিষিদ্ধ। এটি কেন হচ্ছে, তা তারা জানেন না। তবে কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, এভাবে আইডি কার্ড ব্যবহার করা নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও তারা আইডি কার্ড ব্যবহার করতে পারেন না। তাদের তো আইডি কার্ড জমা দেওয়ার কথা ছিলো।
তিনি বলেন, পৃথিবীর কোন প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ওই প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড এভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
চাকরি নেই, পরিচয়পত্র কেন?
একজন কর্মীর চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক কর্মসম্পর্কও শেষ হয়। এ অবস্থায় কর্মীর ব্যবহৃত পরিচয়পত্র, প্রবেশ কার্ড, অফিসের বিভিন্ন ডিজিটাল সিস্টেমে প্রবেশাধিকার এবং অন্যান্য অনুমোদন প্রত্যাহার করা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিশেষ করে ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচয় ও প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি ব্যাংকের পরিচয়পত্র শুধু কর্মীর নাম বা পদবির পরিচায়ক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো ব্যক্তি চাকরিতে না থেকেও পুরোনো পরিচয়পত্র ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এখনও ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হতে পারেন।
এতে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের প্রতিনিধিত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে শুধু পরিচয়পত্র হাতে থাকা এবং সেটি ব্যবহার করে ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রবেশ বা কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয় এক নয়। তাই অভিযোগটি কতটা গুরুতর, তা নির্ভর করবে ওই ব্যক্তিরা কোথায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন তার ওপর।
চাকরিচ্যুতদের আন্দোলন অব্যাহত:
ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি পুনর্বহালের দাবি নতুন নয়। চলতি বছরও চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে কয়েক হাজার চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।
জুলাই মাসেও চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে চাকরিতে পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য পরিশোধের দাবি জানানো হয়। দাবি পূরণ না হলে বৃহত্তর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কতটা ঝুঁকি?
ব্যাংকিং খাতে কর্মীদের পরিচয়পত্র ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একজন কর্মী চাকরি হারানোর পর তার পুরোনো পরিচয়পত্র সক্রিয় থাকলে বা সেটি দেখে কেউ তাকে ব্যাংকের বৈধ কর্মকর্তা মনে করলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, শাখা, ভল্ট, নথি সংরক্ষণ এলাকা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত অংশে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরিচ্যুত কোনো ব্যক্তি যদি পুরোনো পরিচয়পত্র দেখিয়ে এসব এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পান, তাহলে বিষয়টি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বর্তমানে চাকরিচ্যুত কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছেন বা পুরোনো আইডি দেখিয়ে কোনো ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন— এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ব্যাংকের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।
ব্যাংকের করণীয় কী?
অভিযোগের সত্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুরোনো পরিচয়পত্র ফেরত নেওয়া, হারানো বা ব্যবহৃত পরিচয়পত্র বাতিল করা এবং ব্যাংকের প্রবেশাধিকার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো চাকরিচ্যুত ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচয় ব্যবহার করে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীর অফিসের পরিচয়পত্র, প্রবেশাধিকার, ই-মেইল, অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার ও অন্যান্য অনুমোদন বাতিলের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী পুরোনো পরিচয়পত্র নিজের কাছে রাখলেও সেটি ব্যবহার করে বর্তমান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলে তা ভিন্ন বিষয়। তাই অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘আইডি কার্ড থাকা’ এবং ‘আইডি কার্ড ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করা’—এই দুই বিষয় আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ইনকিলাবকে বলেন, চাকরিচ্যুত বা চাকরি ছেড়ে দিলে ওই প্রতিষ্ঠানে আইডি কার্ড ব্যাবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব না। শুধু ব্যাংক নয়, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি ছেড়ে দিলে বা চাকরিচ্যুত হলে, ওই প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ব্যবহার করা যায় না।
তিনি বলেন, এটার জন্য কোনো ব্যাংকিং আইন লাগে না। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যার সাথে আপনার সম্পর্ক ছেদ ঘটছে, তার পরিচয়পত্র আপনি কীভাবে ব্যবহার করেন?
চাকরিচ্যুতরা ইসলামী ব্যাংকের আইডি কার্ড এখনো ব্যবহার করছে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি আপনাকে কমন যেটা প্র্যাকটিস সেটা বললাম।
এ বিষয়ে কথা বলতে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসাইনকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেনি। পরে তাকে টেক্সস পাঠানো হলেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন