প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বর্ষা এবং বন্যার মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে ব্রহ্মপুত্রের তীরে কোনোমতে মাথা গুঁজে বছরটি পার করার পরিকল্পনা করেছিলেন মাইদুল ইসলাম। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ব্রহ্মপুত্রের জলস্তর বেড়ে গেছে। চরগুলোতে ভাঙন চলছে। এতে টিকতে না পেরে নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে নৌকায় মালপত্র বোঝাই করে চলেছেন তারা।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের চর কালির আলগা ও গোয়ালপুরী যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন এই চরগুলোতে বর্তমানে ভাঙনের তাণ্ডব চলছে। তিন দিক থেকে ব্রহ্মপুত্র চরগুলোকে গিলে ফেলতে চাইছে। তাই নতুন ঠিকানার খোঁজে বাসিন্দারা চতুর্থ দিকে পাড়ি দিচ্ছেন।
মাইদুল তাদের মধ্যে একজন। বৃহস্পতিবার বিকেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এ প্রতিবেদকের। এ সময় মাইদুল বলেন, ‘দুই মাসে হাফ কিলোমিটার ভাঙল। এই চরে আমার থাকার আশ্রয় নাই। বাধ্য হয়ে তিন কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ কালির আলগা চরে চলে যাচ্ছি। ওখানে কী হবে আল্লাহ জানেন।’
আড়াই হাজার টাকা নৌকাভাড়া করে মাইদুল নতুন গন্তব্যে যেতে পারলেও ভাঙনে চরম দুর্ভোগে পড়া অনেক পরিবার তা করতে পারছে না। গোয়ালপুরী চরে অন্তত ৫০টি পরিবার ঘর ভেঙে ফাঁকা জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। কিছু পরিবার জায়গা ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। অর্থ ও জমির অভাবে নতুন ঠিকানা তৈরির সামর্থ্য নেই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, গোয়ালপুরী ও রলাকাটায় গত দুই সপ্তাহে প্রায় দেড়শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ দুটি চরে ৩০০ পরিবার ভিটে হারিয়েছে। কালির আলগা চরের শেষ চিহ্ন মুছে যাচ্ছে। সেখানে এ বছর গৃহহীন হয়েছে প্রায় অর্ধশত পরিবার।
ইউপি সদস্য আরও জানান, গত দুই সপ্তাহে গোয়ালপুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়ালপুরী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ মাঠ ও একটি মাদরাসা ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৫০টি পরিবারকে কিছু সহায়তা প্রদান করা হলেও বাকিরা তেমন কোনো সহায়তা পায়নি।
গোয়ালপুরী চরের বাসিন্দা খায়রুন্নেসা জানান, তার ঘর ভেঙে ফাঁকা জমিতে রেখেছেন। জমি এবং টাকা নেই। কোথায় যাবেন জানেন না। তিনি বলেন, ‘ভাঙা বাড়িঘরে আছি বাবা। ট্যাহা-পয়সা নাই। অভাবী সংসার। যামু কই? ট্যাহা-পয়সা জোগাড় কইর্যা কোনোহানে যামু। তার আগে ভাইস্যা গেলে যামু।’
খায়রুন্নেসার প্রতিবেশী জেলেমন বেওয়ার গোয়ালঘরের অর্ধেক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দুটি ঘর ভেঙে রেখেছেন পাশের জমিতে। মালামাল পড়ে আছে যত্রতত্র। এখনও গন্তব্য ঠিক করতে পারেননি। অসহায় এই বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘ঘর দুইটা হ্যাঙ্গা দিয়া রাখছি। ট্যাহা না থাকলে জাগা-জমি কিনি কী কইর্যা।’
একই অবস্থা আল আমিন, পনির উদ্দিন, আব্দুল খালেকসহ অনেকের। নতুন চরে প্রতিবিঘা জমির মূল্য ৩০-৪০ হাজার টাকা। এই টাকা সংগ্রহ করতে না পেরে টিনের চাল ও ঘরের মালামাল খোলা জায়গায় ফেলে রেখেছেন। তারা চালাঘর তুলে মাথা গুঁজে আছেন।
তারা জানান, কেউ কেউ মহাজনের কাছে দাদন নিচ্ছেন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ধার-দেনা করছেন। আর যারা টাকা জোগাড় করতে পারছেন না, তারা পড়ে আছেন ভাঙা সংসারে।
কালির আলগা চরের হামেদ আলী, মর্তুজা ও আনোয়ার হোসেন জানান, পুরনো কালির আলগা থেকে ৩০০টি পরিবার দক্ষিণ কালির আলগায় নতুন চরে চলে গেছে। ঠিকানা না পেয়ে ২০-২২টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে পড়ে রয়েছেন। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে কালির আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, রলাকাটা, কালির আলগা, গোয়ালপুরী ছাড়াও শিবেরপাচি, অষ্ট্রআশিসহ কয়েকটি চরে কমবেশি ভাঙন চলছে। অনেকেই ঘর তুলতে পারেননি। দিন দিন গৃহহীন মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এমনকি সাবমেরিন ক্যাবল নাইনের মাধ্যমে যাওয়া বিদ্যুতের খুঁটি ভাঙনের মুখে পড়লেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ইউপি চেয়ারম্যান জানান, ভাঙনের শিকার কয়েকটি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ঘর নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঢেউটিন ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্না হক বলেন, চরাঞ্চলে নদীভাঙন রোধে জিওব্যাগ ফেলার সুযোগ নেই। তবে ভাঙন রোধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অনেক সময় বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে কাজ করা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন