প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়, দেড় বছর আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাঁজাসহ সাত কিশোরকে আটক করা হয়েছিল।
ছবিতে একজনকে ফাহাদ বলে দাবি করা হলেও পরিবারের সদস্য এবং তৎকালীন সহকারী প্রক্টর জানিয়েছেন, ছবির ছেলেটি ফাহাদ নয়, বরং তিনি মাহিম। এ বিষয়ে মাহিম নিজেও একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বর থেকে সাত কিশোরকে গাঁজাসহ আটক করা হয়। ওই সময় ছবিটি দেখে তৎকালীন সহকারী প্রক্টর জানিয়েছিলেন, ছবির ছেলেটি ফাহাদ। অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারও একই দাবি করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে পরবর্তীতে তৎকালীন সহকারী প্রক্টর জানান, ছবির ছেলেটি ফাহাদ নয়, তিনি মাহিম।
সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। তিনি বলেন, "ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে আমি অনেক মাদকসেবী ও মাদককারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। ওই ঘটনার কারণে আমার ছেলে অপ্রতিমকে টার্গেট করা হয়ে থাকলে আমি তা মেনে নেব না।"
জানা গেছে, সাত কিশোরকে গাঁজাসহ আটকের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন তৎকালীন কুবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. নাহিদা বেগম। এ সময় দুই সহকারী প্রক্টর মাহমুদুল হাসান রাহাত ও মুতাসিম বিল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে জব্দ করা গাঁজাও ধ্বংস করা হয়েছিল।
ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ড. নাহিদা বেগমের ছেলে অপ্রতিম। পরদিন শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ফাহাদও রয়েছে। তবে দেড় বছর আগে কুবিতে গাঁজাসহ আটক হওয়ার ছবিতে থাকা ছেলেটি ফাহাদ নয় বলে জানিয়েছেন মাহিম। অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেফতার তিন আসামি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
ভিডিও বার্তায় মাহিম যা বললেন
ভিডিও বার্তায় মাহিম বলেন, ‘২০২৫ সালে ভার্সিটির একটা কনসার্ট ছিল। কনসার্টে আমরা গিয়েছিলাম। তারপর আমরা বন্ধুরা পাহাড়ের উপরে উঠছিলাম একটু আড্ডা দেব, গানটান করব—এই হিসেবে। তারপর ম্যাম (ড. নাহিদা বেগম) এসে অভিযান চালিয়েছিলেন। আমাদের কাছ থেকে কিছু পাননি। সেখান থেকে একটু দূরে পেয়েছিলেন। এরপর ম্যাম এসে আমার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছিলেন। নেওয়ার পর বলেছিলেন, তোমাদের পরীক্ষা সামনে। এরপর অভিভাবক ডেকে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন ওই নিউজটা আবার ছাড়তেছে। আর ওই ছবির ভেতরে আমি মাহিম ছিলাম, কোনো ফাহাদ না। ওইটা আমার ছবি ছিল। আর ওদের সঙ্গে যে তুহিন, তারপরে ফাহাদ, আরও কে কে—ওদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। ওদের আমি চিনিও না।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘মাহিমের পরিবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা বলেছে, এটা ফাহাদ না। এটা মাহিম।’
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কুবি ক্যাম্পাসের লালন চত্বর থেকে গাঁজাসহ আটক হওয়ার একটি ছবি প্রতিনিধির হাতে এসেছে। ছবিতে একজনকে চেক শার্ট, ট্রাউজার ও সাদা-কালো শীতের পোশাক পরা অবস্থায় দেখা যায়। ছবিটিকে শুরুতে কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে ফাহাদের ছবি বলে জানিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, ছবির ছেলেটি মাহিম।
এর আগে গণমাধ্যমকে ড. নাহিদা বেগম বলেছিলেন, প্রক্টরিয়াল টিমের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আজ আমরা মাদকসহ এ সাতজনকে আটক করেছি। তাদের ভাষ্যমতে, সবার বয়স ১৮ বছরের কম। ভবিষ্যতে তারা যাতে কোনো বড় অপরাধে জড়িত না হয়, সেজন্য মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের হাতে তাদের হস্তান্তর করা হয়েছে।
ফাহাদকে নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
মামলার আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোরিকশাচালক। ফাহাদ ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
জানা যায়, চলতি মাসের ২ তারিখে অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের ইলেকট্রিক অফিসে চাকরি নেয় ফাহাদ। তিনি বলেছিলেন, দেড় বছর আগে কুবিতে গাঁজাসহ আটকের সময় সাত কিশোরের সঙ্গে থাকা ছেলেটিই ফাহাদ।
তবে ফাহাদের মা জুলি আক্তার এ দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘এখানে ফাহাদ নেই।’ যদিও তৎকালীন সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহ বলেছিলেন, ‘এটা ফাহাদ। তারা সবাই মুচলেকা দিয়ে প্রক্টর অফিস থেকে গিয়েছে। তাদের পরিবারের লোকজনও এসেছিল।’ পরে তিনি এ বক্তব্য সংশোধন করেন।
‘আমার ছেলেকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা হচ্ছে’
এদিকে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে বিভিন্ন আইডি থেকে ব্লেম করা হচ্ছে। আমার ছেলে কিছু বোঝে? আমার দুধের শিশুকে অপরাধী বানাতে চাইলে আমি এটা কখনই মেনে নেব না। আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বিচার চাই না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত বাচ্চার জীবন নেবে, কত বাচ্চার জীবন ধ্বংস করবে—সেটা নিয়েও আমি চিন্তিত। আমি চাই, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।’
ড. নাহিদা বেগম আরও বলেন, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে নানা উপায়ে অপ্রতিমকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি অনেক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। ওই ঘটনার কারণে তার ছেলেকে টার্গেট করা হয়ে থাকলে তিনি তা মেনে নেবেন না।
তিনি বলেন, আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যদি আমার অপরাধ হয়, তাহলে তার শাস্তি আমি পাব। আমার ছেলে কেন এর শাস্তি পাবে? আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেলা হলো? আমার ছেলেকে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেও তাদেরই একজন। অথচ আমার ছেলে নিষ্পাপ, ছোট বাচ্চা। সে এসবের কিছুই বোঝে না।
এ সময় কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌসুলি (পিপি) কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) তারেক আবদুল্লাহ, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শহীদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক খন্দকার এবং সাবেক সভাপতি শরীফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন