প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ইন্টারনেট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক যুবক ও তার বন্ধুর ওপর দুই দফায় হামলা, ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম, শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টা এবং নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনের বিরুদ্ধে লিখিত এজাহার দিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. শামীম আহমেদ (৩০)।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা এবং অফিসের সামনে মাদক সেবন ও বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে গত ৩ ও ৪ অক্টোবর পরপর দুই রাতে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। দ্বিতীয় দিনের হামলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিঠ ও কাঁধে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করার পাশাপাশি গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
থানায় দেওয়া এজাহারে যা বলা হয়েছে:
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে মো. শামীম আহমেদ উল্লেখ করেন, তিনি ইকুরিয়া টিলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার বন্ধু রাবেদ হোসেনের ইকুরিয়া মুসলিমনগর এলাকায় অবস্থিত ‘আরআর অনলাইন ইন্টারনেট সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করেন।
এজাহারে সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন—রাখাল শুভ (২৮), জাহাঙ্গীর ওরফে সিএনজি চোর জাহাঙ্গীর (৫০), ইয়াবা সুজন (৪০), আরিফ (২৬), মো. বিআলম ওরফে লেংরা বিআলম (৫৫), হানিফ (৪৫) ও মিজান (৪৫)। তাদের সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, অভিযুক্তরা এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা প্রায়ই আরআর অনলাইন ইন্টারনেট সার্ভিস অফিসের সামনে আড্ডা দিতেন এবং সেখানে মাদক সেবন ও বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এতে অফিসের পরিবেশ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শামীম আহমেদ ও তার বন্ধু রাবেদ হোসেন তাদের মাদক সেবন ও বিক্রিতে বাধা দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে অভিযুক্তরা তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন সময় খুন ও জখমের হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে দাবি করেছেন বাদী।
৩ অক্টোবর প্রথম দফা হামলার অভিযোগ:
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন বেয়ারা মুসলিমনগর এলাকায় কিউট ফার্নিচারের পাশে ১২ বিল্ডিংয়ের সামনে শামীম আহমেদ ও তার বন্ধু রাবেদ হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়।
বাদীর অভিযোগ, অভিযুক্তরা অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে লাঠি, সোটা, লোহার রডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালান। এতে শামীম ও রাবেদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।
হামলার পর অভিযুক্তরা তাদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি পরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজনকে জানানো হয় বলে দাবি করেছেন বাদী। কিন্তু এতে অভিযুক্তরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
ইন্টারনেট সংযোগ খুলে ফেলার চাপ:
এজাহারে শামীম আহমেদ আরও দাবি করেন, প্রথম দফা হামলার পর অভিযুক্তরা তাদের ইন্টারনেট ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। বিশেষ করে ইন্টারনেটের সংযোগ ও লাইন খুলে ফেলার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে ব্যবসা বন্ধ বা ইন্টারনেট সংযোগ খুলে দিতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, এরই ধারাবাহিকতায় ৪ অক্টোবর রাতে অভিযুক্তরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে আবারও তাদের ওপর হামলা চালান।
৪ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা হামলা:
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৪ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বেয়ারা মুসলিমনগর এলাকায় কিউট ফার্নিচারের পেছনে শামীম আহমেদের ওপর দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়।
বাদীর অভিযোগ, ওই সময় অভিযুক্তরা অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে লাঠি, লোহার রড, রামদা, সুইস গিয়ার চাকুসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। তারা শামীমকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর একে একে কয়েকজন অভিযুক্ত তার ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
পিঠে চাকুর আঘাতের অভিযোগ:
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময় প্রথম অভিযুক্ত রাখাল শুভ তার হাতে থাকা সুইস গিয়ার চাকু দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে শামীমের পিঠের ডান পাশে লম্বা করে আঘাত করেন। এতে তার পিঠে রক্তাক্ত কাটা জখম হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর তৃতীয় অভিযুক্ত ইয়াবা সুজনও সুইস গিয়ার চাকু দিয়ে শামীমের পিঠের বাম পাশে আঘাত করেন বলে দাবি করেছেন তিনি। এতে পিঠের ওই অংশেও রক্তাক্ত কাটা জখম হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চতুর্থ অভিযুক্ত আরিফ তার হাতে থাকা রামদা দিয়ে শামীমের বাম কাঁধে কোপ দেন। এতে কাঁধে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়েছে বলে দাবি করেন বাদী।
গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ:
এজাহারের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—হামলার একপর্যায়ে দ্বিতীয় অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর ওরফে সিএনজি চোর জাহাঙ্গীর শামীমের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যার চেষ্টা করেন।
বাদীর অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম করেন। একপর্যায়ে তিনি ডাক-চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে থাকেন।
স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসায় হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগদ ৩৬ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ:
হামলার সময় শামীম আহমেদের কাছে থাকা নগদ ৩৬ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
এজাহারে বাদী দাবি করেছেন, প্রথম অভিযুক্ত তার কাছে থাকা ওই টাকা নিয়ে নেন। পাশাপাশি হামলার পর অভিযুক্তরা তাকে ও তার বন্ধুকে হত্যার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাদের খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
চিকিৎসা নিয়েছেন ভুক্তভোগীরা:
হামলার পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় শামীম আহমেদ ও তার বন্ধু রাবেদ হোসেন কেরানীগঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ৪ অক্টোবরের হামলায় শামীম আহমেদের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
চিকিৎসা নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে এবং পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে কিছুটা সময় লেগেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন শামীম আহমেদ।
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাদী:
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, হামলার পর থেকে তিনি ও তার বন্ধু রাবেদ হোসেন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। অভিযুক্তদের ভয় ও হুমকির কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
তার আশঙ্কা, অভিযুক্তরা যেকোনো সময় তাদের ওপর আবারও হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেন। এ কারণে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে নিজের ও তার বন্ধুর নিরাপত্তা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তদন্তের দাবি:
ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় লিখিত এজাহার দেওয়া হয়েছে। পুলিশ অভিযোগটি তদন্ত করে দেখবে এবং অভিযোগের সত্যতা, হামলায় কারা জড়িত ছিলেন, অস্ত্র ব্যবহার ও টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন