প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার ভয়াবহ হামলা প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ধারণাকেও পরিবর্তন করে দেয়। ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু হয়। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, পরে ইরাক যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ২৫ বছর পর দেখা যাচ্ছে, আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের মতো সংগঠনগুলো তাদের পূর্বের সক্ষমতা হারালেও সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং এর কাঠামো ও কৌশল পরিবর্তিত হয়ে আরও বিচ্ছিন্ন ও বিকেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে।
৯/১১-এর আগে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী নেতৃত্ব, সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি করে, সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন রোধে ব্যবস্থা নেয় এবং নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে। তবে ৯/১১-পরবর্তী সময় এটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; সেই তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ এবং সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তনের ফলে আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় কাঠামো বড় ধাক্কা খায়। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেন এবং ২০২২ সালে তার উত্তরসূরি আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহত হন। আফগানিস্তানে সংগঠনটির পুরোনো ঘাঁটিও আর আগের অবস্থানে নেই। কিন্তু আল-কায়েদা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং আফ্রিকার সাহেল, সোমালিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এর প্রভাব টিকে আছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, সংগঠনটি এখন আগের তুলনায় বেশি বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোয় কাজ করছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে।
ইসলামিক স্টেটের ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন দেখা গেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় একসময় বিশাল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী আইএস তাদের তথাকথিত খেলাফত হারিয়েছে। তবে সংগঠনটির বিভিন্ন শাখা এখনো সক্রিয় রয়েছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও আইএস এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সময়ে সংগঠনটির কার্যক্রম ২২টি দেশ থেকে কমে ১৫টি দেশে সীমাবদ্ধ হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের সামগ্রিক মাত্রায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সন্ত্রাসী হামলায় ৫ হাজার ৫৮২ জন নিহত হন এবং হামলার ঘটনা ঘটে ২ হাজার ৯৪৪টি। আগের বছরের তুলনায় প্রাণহানি ২৮ শতাংশ এবং হামলার সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে। ২০০৭ সালের পর এটিই সবচেয়ে কম মাত্রা। তবে একই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, উদীয়মান বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে এই অগ্রগতি ধরে রাখা অনিশ্চিত।
সন্ত্রাসবাদের ভৌগোলিক কেন্দ্রও বদলে গেছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্য এবং আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রধান ক্ষেত্র হলেও এখন সাব-সাহারান আফ্রিকা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের ছয়টি সাব-সাহারান আফ্রিকায় অবস্থিত। একই প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৫টি হামলার ঘটনা ঘটে।
এই পরিবর্তনের অর্থ হলো, সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য এখন আর ইরাক ও সিরিয়ার মতো বিশাল ভূখণ্ড দখল করে তথাকথিত ‘রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য নয়। দুর্বল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সীমান্তের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে ছোট আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলো অর্থ সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ এবং হামলা চালাতে সক্ষম। ফলে কোনো একটি ঘাঁটি ধ্বংস বা শীর্ষ নেতাকে হত্যা করলেই পুরো নেটওয়ার্কের অবসান হচ্ছে না।
সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তিত রূপে প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ উগ্রপন্থী প্রচারণা ও সদস্য সংগ্রহের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বিশেষভাবে সতর্ক করছেন, অনলাইনে তরুণদের উগ্রপন্থায় আকৃষ্ট করা এবং সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
একই সঙ্গে বেড়েছে একক হামলাকারীর ঝুঁকি। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ বলছে, ২০২১ সালের পর তরুণদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত তদন্তের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে একই সময়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার ৯৩ শতাংশই একক হামলাকারীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ বড় কোনো সংগঠনের সরাসরি সদস্য না হয়েও অনলাইন উগ্রপন্থী প্রচারণা থেকে প্রভাবিত হয়ে একজন ব্যক্তি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজও আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। ৯/১১-এর আগে বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ, অর্থায়ন এবং সাংগঠনিক কাঠামো শনাক্ত করা ছিল অন্যতম লক্ষ্য। এখন একই সঙ্গে নজর রাখতে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক, স্থানীয় সংঘাত, অনলাইন উগ্রবাদ এবং একক হামলাকারীর ওপর। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান কেন ম্যাককালাম ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকীতে সতর্ক করেছেন, অতীতের হুমকির ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে নতুন এবং অপ্রত্যাশিত হুমকি যেন নজর এড়িয়ে না যায়।
৯/১১-পরবর্তী ২৫ বছরের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, শুধুমাত্র সামরিক অভিযান দিয়ে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আফগানিস্তান এবং ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ দেখিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং উগ্রপন্থা প্রতিরোধকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
গোয়েন্দা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। ৯/১১-এর আগে বিভিন্ন মার্কিন সংস্থার কাছে আল-কায়েদা এবং বিন লাদেনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল, কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে সমন্বয় ও কাজে লাগানো যায়নি। পরবর্তী সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময়ের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবু বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে, বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্য থেকে ভবিষ্যৎ হুমকি সঠিকভাবে অনুমান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি সাইবার হামলা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রাষ্ট্রীয় সংঘাত এবং বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিরাপত্তার হিসাবকে বদলে দিয়েছে। ৯/১১-এর পর গড়ে ওঠা নিরাপত্তা কাঠামোকে তাই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাচ্ছে।
২৫ বছর পর ৯/১১-এর চিত্র তাই দ্বিমুখী। একদিকে বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর আগের মতো ব্যাপক হামলা চালানোর সক্ষমতা কমেছে এবং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার সামগ্রিক মাত্রাও নেমেছে। অন্যদিকে হুমকিটি আরও ছড়িয়ে পড়েছে—আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়া, আবার সংগঠিত নেটওয়ার্ক থেকে অনলাইন উগ্রপন্থায় প্রভাবিত একক হামলাকারী পর্যন্ত।
অর্থাৎ, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় অনেক কিছু শিখেছে, কিন্তু হুমকিটি শেষ হয়নি। আল-কায়েদা এবং আইএসের পুরোনো কাঠামো দুর্বল হলেও সন্ত্রাসবাদ নতুন ভূগোল, নতুন নেটওয়ার্ক এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। ২৫ বছর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা নয়, বরং কোন পরিবেশে তারা আবার সংগঠিত হতে পারে এবং প্রযুক্তি কীভাবে সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে—তা আগে থেকে বুঝতে পারা। তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন