প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো মানব শরীরে স্থাপন করা হয়েছে জৈবভাবে ক্ষয় হয়ে যায় এমন বিশেষ একট চিকিৎসাযন্ত্র, যা ছিদ্র বন্ধ করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৪ বছর বয়সী লিলি ইয়েলের হৃদযন্ত্রে বসানো যন্ত্রটি আগামী কয়েক মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে শরীরের সঙ্গে মিশে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
লিলির হৃদযন্ত্রের ওপরের দুটি প্রকোষ্ঠের মাঝের দেয়ালে প্রায় ১০ পেন্স মুদ্রার সমান একটি ছিদ্র ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে অ্যাট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট (এএসডি) বলা হয়। লিলির চিকিৎসায় প্রচলিত ধাতব যন্ত্র ব্যবহার করলে তাকে রাগবি খেলা থেকে বিরত থাকতে হতো। পেশাদার রাগবি খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন থাকায় বিষয়টি তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
নতুন প্রযুক্তির যন্ত্র ব্যবহারের ফলে সেই সীমাবদ্ধতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
গত জুনে লিভারপুলের অ্যাল্ডার হে শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা লিলির হৃদযন্ত্রে ‘মেমোসর্ব’ নামের যন্ত্রটি স্থাপন করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো রোগীর চিকিৎসায় এ যন্ত্র ব্যবহারের এটিই প্রথম ঘটনা। চিকিৎসাটি সম্পন্ন করতে হাসপাতালকে সংশ্লিষ্ট ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে বিশেষ অনুমোদন নিতে হয়েছিল।
মেমোসর্ব এমন একটি উপাদান দিয়ে তৈরি, যা শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। এই ধরনের উপাদান গলে যায় এমন চিকিৎসা-সেলাই তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।
শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সালিম জিভানজির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রচলিত ধাতব ডিভাইসের মতো নতুন যন্ত্রটিও প্রথমে হৃদযন্ত্রের ছিদ্রটি বন্ধ করে দেয়। তবে পার্থক্য হলো, এটি স্থায়ীভাবে শরীরে থেকে যায় না। তিনি জানান, যন্ত্রটি হৃদযন্ত্রের দেয়ালের জন্য একটি অস্থায়ী কাঠামো হিসেবে কাজ করে।
সময়ের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের নিজস্ব টিস্যু সেই কাঠামোর ওপর তৈরি হতে থাকে। পরে যন্ত্রে থাকা পলিমার ধীরে ধীরে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিতে রূপান্তরিত হয়ে শরীর থেকে বিলীন হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা আশা করছেন, ছয় থেকে ২৪ মাসের মধ্যে যন্ত্রটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তখন হৃদযন্ত্রের দেয়ালটি স্বাভাবিক টিস্যুর মতো দেখাবে এবং ছিদ্রটিও বন্ধ হয়ে যাবে।
জিভানজি বলেন, লিলির ক্ষেত্রে স্থায়ী ধাতব যন্ত্র ব্যবহার করলে হৃদযন্ত্র পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাগবি খেলা ঝুঁকিপূর্ণ হতো। খেলাধুলার সময় শক্ত আঘাতে ধাতব ডিভাইসটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। নতুন যন্ত্রটি ধীরে ধীরে শরীরের টিস্যুতে প্রতিস্থাপিত হওয়ায় সেই ঝুঁকি কমেছে। চিকিৎসার পর লিলি দ্রুত স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফিরেছে। তার মা ৩৮ বছর বয়সী বেচি নিকোলস জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পর মেয়েটি পাঁচ কিলোমিটার দৌড়েছে, বিনোদন পার্কে ঘুরেছে এবং আবার রাগবিও শুরু করেছে।
লিলি নিজেও নতুন চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট। যুক্তরাজ্যে এই ধরনের যন্ত্র প্রথম তার শরীরে স্থাপন করা হয়েছে- এটি জানতে পেরে তিনি আনন্দিত বলে জানিয়েছেন। হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের পছন্দের কাজগুলো করতে পারছেন বলেও জানান তিনি। লিলির হৃদযন্ত্রের সমস্যার বিষয়টি তার জন্মের পরই জানা যায়। ৩৩ সপ্তাহে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তার এএসডি শনাক্ত করেন। এরপর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চললেও দীর্ঘ সময় তার কোনো উপসর্গ ছিল না।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা দেখতে পান, লিলির হৃদযন্ত্রের ডান পাশ স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে গেছে। এরপর চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, প্রায় দুই বছরের মধ্যে লিলির হৃদযন্ত্রে ডিভাইস বসানো হতে পারে। তবে মেয়ের জিসিএসই পরীক্ষার সময় যাতে চিকিৎসাজনিত জটিলতা না থাকে, সে জন্য দ্রুত চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন তার মা। এরপর লিলিকে জানানো হয়, প্রচলিত ধাতব ডিভাইস ব্যবহার করা হলে তাকে রাগবি খেলা বন্ধ রাখতে হবে। নতুন জৈবভাবে ক্ষয়যোগ্য যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার খেলাধুলায় ফেরার পথও খোলা থাকে।
মেয়ের চিকিৎসায় যুক্ত চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশংসা করেছেন নিকোলস। তার ভাষ্য, চিকিৎসক দল শুধু চিকিৎসা সম্পন্ন করেই দায়িত্ব শেষ করেনি; বরং লিলি যাতে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। নিকোলস বিশেষভাবে ডা. জিভানজি ও তার দলের পাশাপাশি হাসপাতালের ওয়ার্ড ১সি-এর নার্সদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তার মতে, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় তারা লিলি ও তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন