প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশাল এক সময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ এবং নদী-খালের সৌন্দর্যে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে পরিচিত ছিল। বন্দরে দূর-দূরান্তের বণিকদের আনাগোনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বরিশাল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কৃষি উৎপাদন কমে গেছে, শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। যদিও গ্যাসের বড় মজুদ রয়েছে, তবুও সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, দেশের দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে এই হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দেশের আট বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পূর্বে রংপুর ছিল দেশের দরিদ্রতম বিভাগ, কিন্তু এখন বরিশাল সেই অবস্থানে রয়েছে।
নতুনভাবে নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে বরিশালের মানুষ ঢাকায় চলে যাচ্ছে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, বরিশালের স্থানীয় বাসিন্দাদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিবাসীর প্রায় ১৩ শতাংশ বরিশালের।
বরিশালকে এক সময় শস্যভাণ্ডার বলা হলেও বর্তমানে ধান উৎপাদনে বিভাগটি পিছিয়ে পড়ছে। বিবিএসের ইয়ারবুক অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৫ অনুযায়ী, আউশ উৎপাদনে বরিশাল চতুর্থ, আমনে পঞ্চম এবং বোরো উৎপাদনে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশালে আউশ উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার ২০ টন, যা পরবর্তী অর্থবছরে কমে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯৯ টনে দাঁড়িয়েছে। আমন উৎপাদনও ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৯ টন থেকে কমে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ টনে নেমেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরিশাল একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বাড়ার ফলে অনেক জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকরা বিকল্প হিসেবে চিংড়ি চাষসহ অন্যান্য কাজে যাচ্ছেন।
শিক্ষাসচিব জানিয়েছেন, বিভিন্ন কলেজে সোলার প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বরিশালের মৎস্যসম্পদেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে নেমেছে। তিন বছরে উৎপাদন প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
বিবিএসের ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ধান, গম ও শস্য উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভোলায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ সম্পদকে ঘিরে বড় শিল্পায়ন হয়নি।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে শিল্প-কারখানা কার্যত সীমিত। বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরিশাল ছাড়া বাকি পাঁচ জেলায় উল্লেখযোগ্য কলকারখানা নেই। বরিশাল জেলায় কারখানা রয়েছে ৪০৯টি, যেখানে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক।
বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, যে ধরনের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কৃষি ও মৎস্যকে ঘিরে আগের অর্থনৈতিক তৎপরতাও কমেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিল্পায়নের অভাব বরিশালের অর্থনৈতিক বিকাশে বড় বাধা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বড় রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। পুরো অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি বদলাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ভোলাকে মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা এবং দুর্গম যোগাযোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠেনি। ভোলার গ্যাসের সঠিক ব্যবহার, পায়রা বন্দর সচল, কুয়াকাটায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক কাঠামো দ্রুত বদলে যেতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন