১০:৫৪ পি.এম
কালীগঞ্জ উপজেলার একজন শিক্ষক চাকরির পাশাপাশি অধিক অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ফলের চাষ শুরু করেছেন। ছয় বছর আগে, একটি পতিত জমি ছিল অনাবাদি। সেই জমিতে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন পাঁচ ভাইরাভাই। শুরু করেছিলেন মাত্র ২ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ। বর্তমানে তাঁদের উদ্যোগের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ বিঘায়। ড্রাগনের পাশাপাশি বাগানে মাল্টা ও কমলার চাষও হচ্ছে। তিনি এসব ফলের আবাদ করছেন ঝিনাইদহের সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়িয়া গ্রামে। এই কৃষি উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এম এম গ্রিন ফিল্ড’। পাঁচ ভাইরাভাইয়ের সঙ্গে পরে যুক্ত হয়েছেন ষষ্ঠ ভাইরাভাই রাজিবুল ইসলাম রাজ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন চাকরিজীবী, আর একজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।
উদ্যোক্তারা জানান, শুরুতে ৫ জন মিলে প্রায় ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। প্রত্যেকে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা করে বিনিয়োগের অর্থ ইতিমধ্যে তুলে নিয়েছেন। এর বাইরে প্রত্যেকের প্রায় ৬ লাখ টাকা করে লাভ হয়েছে। এ বছর ভালো ফলন হয়েছে। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বাগান থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়েছে। মৌসুম শেষ হলে বিক্রির পরিমাণ ২০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তাঁদের আশা। বাগানটি গড়ে উঠেছে তাঁদের শ্বশুরের পতিত জমিতে। শুরুতে ২ বিঘা জমিতে ড্রাগনের চারা লাগানো হলেও ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রায় ৬ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ হচ্ছে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে আরও দুই বিঘা জমি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে অ্যাভোকাডো, মাল্টা ও কমলা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাগানটি পরিচালনায় উদ্যোক্তারা পেশাদার ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করেছেন। বাগান দেখাশোনার জন্য একজন শিক্ষিত ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁকে মাসিক সম্মানজনক বেতন দেওয়া হয়। এ ছাড়া সারা বছর চার থেকে ৫ জন শ্রমিক বাগানে কাজ করেন। যে ভাবনা থেকে শুরু হয়েছিল সে সম্পর্কে মেজো ভাইরাভাই শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকেই মূলত এই উদ্যোগের শুরু। তিনি কৃষি খামার পরিদর্শনে অন্য ভাইরাভাইদের নিয়ে যেতেন। বিভিন্ন ফলের বাগান ও কৃষি উদ্যোগ দেখে তাঁদের মধ্যেও কৃষি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই ছয় বছর আগে ২ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। জমির পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন ফলের জাত। বড় ভাইরাভাই ও শিক্ষক লিয়াকত বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা করে বিনিয়োগ করেছিলাম। সেই টাকা ইতিমধ্যে তুলে নিয়েছি। এর বাইরে প্রত্যেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা করে লাভ পেয়েছি। চাকরির পাশাপাশি কৃষি থেকে বাড়তি আয় আমাদের জন্য বেশ উৎসাহের।’ চার নম্বর ভাইরাভাই শিপলু একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। তাঁর কাছে বাগানটি শুধু বাড়তি আয়ের উৎস নয়, মানসিক প্রশান্তির জায়গা। শিপলু বলেন, ‘সপ্তাহের পাঁচ দিন ব্যাংকের কাজের চাপে থাকতে হয়। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাগানে আসার চেষ্টা করি। এখানে এলে মনটা ভালো হয়ে যায়। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে এই বাগান আমাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়।’ ৩ নম্বর ভাইরাভাই রাহাত খানও বেসরকারি চাকরিজীবী। বিভিন্ন ছুটিতে বাড়িতে এলে তিনি বাগানে সময় কাটান। রাহাত খান বলেন, ‘আমি বেসরকারি চাকরি করি। বিভিন্ন ছুটিতে বাড়িতে এলে বাগানে আসি। ফলের গাছ, সবুজ পরিবেশ সবকিছুই ভালো লাগে। এর পাশাপাশি বাড়তি একটা আয় হচ্ছে, যা জীবনকে কিছুটা সহজ করে।’
আরও পড়ুন: সিলেটের জকিগঞ্জে বিয়ের এক মাসের মাথায় সড়কে যুবক ফরহাদ আহমদের প্রাণ ঝরল
উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা মূলত চাকরির পাশাপাশি কৃষিকে একটি বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে দেখেছিলাম। কিন্তু এখন এটি আমাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়, ভালো লাগারও জায়গা। পতিত জমিকে আমরা উৎপাদনশীল করতে পেরেছি। নিজেরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই কৃষি প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে বলে আমরা মনে করি। দেশে ফলের উৎপাদন বাড়লে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে অন্যদিকে ফল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।’ ৬ ভাইরাভাইয়ের এই উদ্যোগ এখন শুধু একটি ফলের বাগান নয়, চাকরিজীবীদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা গল্প। কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে পতিত জমিতে বিনিয়োগ করে তাঁরা দেখিয়েছেন পরিকল্পনা, শ্রম ও আগ্রহ থাকলে চাকরির পাশাপাশি কৃষিও হতে পারে বাড়তি আয়ের একটি কার্যকর পথ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন