০১:১৯ পি.এম
চলতি মাসের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে গিয়েছিলেন। সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় হঠাৎ করে ট্রাম্প নিজের এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটি পরিবর্তন করেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ঘটনার পেছনের কারণগুলি পরিষ্কার হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্প এবং তার বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ লক্ষ্য নিয়ে আকাশপথে হামলার পরিকল্পনা করছিল। এই নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্পের এড়ানো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-জাপান চুক্তি: ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসংস্থান চুক্তি
এ বিষয়ে সরাসরি অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
সংবেদনশীলতার কারণে কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য প্রদান করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ন্যাটো সম্মেলন চলাকালেই এই সুনির্দিষ্ট হুমকির বিষয়টি সামনে আসে।
ট্রাম্প তুরস্কের আঙ্কারায় গিয়েছিলেন কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে। তবে এটি পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাসহ অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নেই বলে সংবাদমাধ্যমে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল।
হুমকি শনাক্ত হওয়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনী ‘সিক্রেট সার্ভিস’ ট্রাম্পকে বিমান বদলাতে জোর পরামর্শ দেয়। পরে ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা করেন যে, তুরস্ক থেকে ফেরার জন্য তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটি ব্যবহার করবেন।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার শিকার প্রতিমন্ত্রী ইশরাক
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইরানপন্থী প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীর মূল লক্ষ্য কোন নির্দিষ্ট বিমান ছিল না। বরং ট্রাম্প এবং তিনি যে বিমানেই থাকুন, সেটি আকাশে ধ্বংস করাই ছিল তাদের পরিকল্পনা।
ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "তারা মার্কিন নেতাকে—অর্থাৎ আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আজ সকালেও আমি দেখেছি যে, তাদের করা প্রতিটি হিটলিস্টে আমার নাম রয়েছে। এত দিন ধরে আমি হয়তো কিছুটা ভাগ্যবান ছিলাম, তবে এ ভাগ্য হয়তো খুব বেশি দিন না-ও টিকতে পারে।"
তবে ট্রাম্প শুরুতে বিমান বদলের বিষয়ে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, ব্রিটেনে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যদের নতুন বিমান ঘুরে দেখার সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে সময় তিনি নিরাপত্তাজনিত কোন কারণ পুরোপুরি অস্বীকার করেন। কিন্তু পরে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় যে, মূলত সিক্রেট সার্ভিসের চাপেই ট্রাম্প বিমান বদলাতে বাধ্য হন।
হামলার এই হুমকির তথ্যটি মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরেও মাত্র কয়েকজনের মধ্যে রাখা হয়। বহু কর্মকর্তাকে শুধুমাত্র ‘ইরানসংক্রান্ত সাধারণ নিরাপত্তা উদ্বেগের’ কথা বলে বিমান বদলের সিদ্ধান্তটি জানানো হয়। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের শীর্ষ সদস্যদেরও এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কোন আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি। তবে প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ট্রাম্পকে হত্যায় ইরানের ধারাবাহিক চেষ্টার কথা স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট এবং তার প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে ইয়াবা কারবারিদের ধরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ, থানার ক্যাশিয়ার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
এই ঘটনার সময় অন্য একটি গোয়েন্দা তথ্যও আলোচনাধীন ছিল। ইসরায়েল ট্রাম্পকে হত্যায় ইরানের কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুনির্দিষ্ট তথ্য ভাগ করে। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ইসরায়েলের ওই তথ্যকে সন্দেহের চোখে দেখেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার লক্ষ্যে ইসরায়েল এই তথ্য সরবরাহ করছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তুরস্কে বিমান বদলের পেছনের সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা হুমকি ইসরায়েলি সূত্রের তথ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় (তেহরান থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে) অবস্থানের সময়ে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে বিমান হামলা শুরু করে।
কাতার থেকে পাওয়া নতুন বিমানের নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের আগের প্রতিবেদনের প্রকাশের পর মার্কিন সরকার তথ্য ফাঁসের তদন্ত শুরু করে। এর অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিকের গ্র্যান্ড জুরি সাক্ষ্য নেওয়ার পাশাপাশি তাদের এবং তাদের আত্মীয়দের ফোন রেকর্ড চেয়ে আইনি নোটিশ জারি করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার পর বৃহস্পতিবার মার্কিন বিচার বিভাগ সেসব নোটিশ প্রত্যাহার করে নেয়।
গত রবিবার ট্রাম্প নিজেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন যে, কাতারের উপহার দেওয়া বিমানে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান-এর সকল ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এখনও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কোনও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই বলে সাংবাদিকদের মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এটিকে সর্বোচ্চ আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগের পর স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা আধুনিকায়নের জন্য আগামী শরতে প্রায় এক মাসের জন্য নতুন বিমানটিকে সাময়িকভাবে সেবার বাইরে রাখা হবে। ওই সময়ে ট্রাম্প তার পুরোনো বিমানেই যাতায়াত করবেন। তবে এত অল্প সময়ে ঠিক কী ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
ট্রাম্পের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সিক্রেট সার্ভিসের উদ্বেগ এখন তুঙ্গে। গত বুধবার ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার’-এর আগে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সিক্রেট সার্ভিসের পরিচালক শন কারান জানান, তাদের সুরক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের প্রতি বর্তমান হুমকির মাত্রা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর আগে গত এপ্রিলে একজন বন্দুকধারী নিরাপত্তাচৌকি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ায় ওই একই অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছিল। শন কারান ট্রাম্পের দুই মেয়াদী সময়ে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের প্রধান ছিলেন এবং ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্প গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়ও তার পাশে ছিলেন।
ইরানসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে বলেও মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা। এই শত্রুতার মূল কারণ হচ্ছে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে (২০২০ সালের জানুয়ারি) ইরানের প্রভাবশালী কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার ঘটনা। ট্রাম্প ১৯৯০ সাল থেকে ব্যবহৃত পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমান দুটির অবস্থার ব্যাপারে দীর্ঘ দিন অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। এর মধ্যে গত বছরে কাতার তাকে একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ উপহার দেয়। প্রায় ১৪ বছরের পুরোনো ওই বিমানটিকে দ্রুত ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হলেও পুরোনো বিমানের সমপর্যায়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযুক্ত করা যায়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, মেয়াদ শেষে বিমানটি তার প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির অংশ হিসেবে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য ২০০ ট্রলি প্রদান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন