০৭:৫৩ পি.এম
রেজিনগরে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ মুসলিম ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে। নিজের গ্রেপ্তারের ঠিক আগে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) প্রধান হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী যখন কেন্দ্রের বাইরে অলস দাঁড়িয়ে ছিল এবং পর্যবেক্ষকদের ফোন বন্ধ ছিল, ঠিক তখন পোশাক পরা পুলিশ নিজেরাই ভোট লুটে অংশ নেয়।
নন্দীগ্রাম বিধানসভার সুভাষণী চকে গত ৬ অক্টোবর দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। এক নারী সংবাদমাধ্যমকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, "আমার ভোটারের স্লিপ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির লোকেরাই এটা করেছে, তাই আমি ভোট দিতে পারিনি।"
অন্যদিকে রেজিনগরে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর দাবি, ৩১৫টি বুথের মধ্যে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টিতে তাদের এজেন্ট ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। এ দিকে এজেইউপি প্রধান হুমায়ুন কবিরকে কার্যত টানাহেঁচড়া করে পুলিশ গাড়িতে তোলে। সন্ধ্যায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল কলকাতায় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তরে গিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। শুভঙ্করবাবু বলেন, "নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর প্রমাণ করে দিল কীভাবে দিনদুপুরে ভোট চুরি হচ্ছে। এখানকার ভোট বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন করতে হবে।"
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা, পিটিআইর আইনি লড়াই শুরু
তবে অন্যরকম পরিবেশ দেখা গেল নন্দনায়ক বার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মডেল বুথে। গোলাপি ও সাদা বেলুনে সাজানো সেই বুথে ভোট দিতে আসেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ঘরের ভেতরের সবকটি পোলিং এজেন্টের গলায় ছিল গেরুয়া উত্তরীয়। শুভেন্দুবাবু সাংবাদিকদের বলেন, "২০১৬ সালে আমি ৮২,০০০ ভোটে জিতেছিলাম। আশা করি এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে যাবে।"
তার দল বিজেপি অবশ্য লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে এক লাখ ৯ হাজারের ফাল্টা উপনির্বাচনের ব্যবধান পার করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২,৬৬,৪১৫ জন ভোটারের মধ্যে এক লাখের ব্যবধান পেতে হলে বিজয়ী প্রার্থীকে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পেতে হবে।
স্মৃতির পাতায় চোখ মেলা যাক ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ঝাড়গ্রামের এক জনসভায় শুভেন্দু নিজেই ফাঁস করেছিলেন ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের নেপথ্য কাহিনী। তিনি বলেছিলেন, "বিডিও অফিসগুলো সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে রাখত যাতে বিরোধীরা মনোনয়ন জমা দিতে না পারে। বিরোধী কর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো বা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হতো। রাতের অন্ধকারে পুলিশের সাহায্যে ফল বদলে দেওয়া হতো।"
সেই সময় তিনি তৃণমূলের পরিবহন মন্ত্রী এবং মুর্শিদাবাদ, মালদা ও পূর্ব মেদিনীপুরের সংগঠনের পর্যবেক্ষক ছিলেন। তবে এই ঘটনাগুলোর কয়েক দিন আগেই মালদা কলেজ অডিটোরিয়ামে এক সভায় দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অভিপ্সার কথা প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, "আমাদের একমাত্র লক্ষ্য—বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত বোর্ড গঠন করা।"
আরও পড়ুন: স্পেনের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লাটভিয়ায় ইসরাইলি অস্ত্র সরবরাহ
পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি
পশ্চিমবঙ্গের ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন সত্যিই এক অদ্ভুত ইতিহাস তৈরি করেছিল। মোট ৫৮,৬৯২টি পঞ্চায়েত আসনের মধ্যে ২০,১৫৯টিতে (প্রায় ৩৪ শতাংশ) কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি এবং তার মধ্যে ২০,০৭৬টি আসনেই বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় জয়ী হয় তৃণমূল। এর আগে ২০১৩ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় জয়ের হার ছিল মাত্র ১০.৬৬ শতাংশ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, বিরোধীদের ওপর বাধার কারণে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়াতে হয়েছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও একে তৃণমূল গণতন্ত্রের মারাত্মক বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছিল।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অপকর্মের কোনো প্রমাণ আদালতে মেলেনি। তবে তিনি যে রাজনৈতিক কৌশলের কথা মুখে প্রকাশ করেছিলেন এবং দায়িত্বে থাকাকালীন যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট লেখা রয়েছে।
সাম্প্রতিক উপনির্বাচনের প্রচারের দিকে তাকালে সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। প্রথম দুটি ধাপ—মিথ্যা মামলা দায়ের করা এবং লড়াই শুরুর আগেই বিরোধীদের সরিয়ে দেওয়া। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী প্রচারের ১৬ দিনের মধ্যে ১১ দিনই হাজতে কাটিয়েছেন, আর তা-ও আবার ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের পুরনো পরোয়ানার ভিত্তিতে। বাম মনোনীত সিপিআই প্রার্থীকে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।
আরও পড়ুন: হুথিরা সউদীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সফল হামলা চালাচ্ছে
রেজিনগরে এজেইউপি সমর্থিত প্রার্থী গ্রেপ্তার হন এবং ভোটের দিন হুমায়ুন কবিরকে আটক করা হয়। নিজেদের প্রতীক না পাওয়ায় আরএসপি লড়াই থেকে সরে দাঁড়ায়। আবার ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) তাদের পূর্ববর্তী প্রতীক 'খাম' চাইলেও তাদের দেওয়া হয় 'আলমারি'। ফলাফল দাঁড়াল—দুজন গ্রেপ্তার, একজন নিগৃহীত, একজন নাম প্রত্যাহারকারী এবং দুজন দলীয় প্রতীকহীন!
তৃতীয় কৌশলটি হলো পুলিশের ব্যবহার। ৬ অক্টোবরের মূল অভিযোগ ছিল—নির্বাচনী নজরদারি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কংগ্রেস ও বাম নেতাদের দাবি, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ মদতে নন্দীগ্রামে মুসলিম ভোটারদের স্লিপ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রেজিনগরে ভিডিওতে দেখা গেছে পুলিশ ভোটারদের আটকে দিচ্ছে।
চতুর্থ কৌশলটি হলো নির্বাচনের পর বিরোধী শূন্য করা। ২০১৬ সালে শুভেন্দু ঘোষণা করেছিলেন ২০১৭ সালের মধ্যে মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ঘটেছিলও তাই; ২৫ জন জেলা পরিষদ সদস্য একে একে তৃণমূলে যোগ দেন। ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের দিনেও একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটে। মালদা জেলা পরিষদে তৃণমূলের দলত্যাগীদের কাজে লাগিয়ে দখল নেয় বিজেপি।
এর পাশাপাশি এবার এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে—অনলাইন মাধ্যমের ওপর কোপ। প্রচার থেকে বঞ্চিত হয়ে যখন হুমায়ুন কবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করেছিলেন, ঠিক তখনই একাধিক ফেসবুক পেজ বন্ধ হয়ে যায়। অনুসন্ধানকারী সংস্থা 'অল্ট নিউজ' জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিধিনিষেধের দোহাই দিয়ে মুর্শিদাবাদের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের পেজ ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিমানবন্দরে স্যুটকেস খুলতেই আঁতকে উঠলেন কর্মকর্তা, ভেতরে ৩৭টি জীবিত বিষধর সাপ
রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির বর্তমান শক্ত অবস্থান এবং নন্দীগ্রামে তাদের বিগত ভোটের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে জয়ের বিষয়ে সংশয় ছিল না। আসল লড়াই ছিল—জয়ের মার্জিন বা ব্যবধান কত বড় হবে। শুভেন্দু অধিকারী লাখের বেশি ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন।
শুভেন্দুবাবু প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক ব্যানার্জির ৬৮.৪৮ শতাংশ ভোট পাওয়া ছিল কারচুপির ফল। কিন্তু একই যুক্তি যদি পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে দেখা যাবে যে সময় শুভেন্দুবাবু মেদিনীপুরে তৃণমূলের শক্ত কাণ্ডারি ছিলেন, তখন ২০১৪ সালের তামলুক লোকসভা আসনের নন্দীগ্রাম ব্লকে তিনি নিজেই পেয়েছিলেন ৬৮.৩৭ শতাংশ ভোট। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি পান ৬৬.৭৮ শতাংশ ভোট। দুটি পরিসংখ্যানে ডায়মন্ড হারবারের ফলাফলের খুবই কাছাকাছি।
তখনকার বুথভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে নন্দীগ্রামের ২৪২ নম্বর বুথে ৭২১টি ভোটের মধ্যে ৭০৪টিই পেয়েছিলেন শুভেন্দু। একাধিক বুথে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল তার পক্ষে। ২০১৮ সালে ময়না বিধানসভার ১০টি টানা বুথে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৯০.৮ থেকে ৯৮.৯ শতাংশ।
আজ শুভেন্দু অধিকারী যখন ১ লাখ ভোটের ব্যবধানের কথা বলেন, তখন তিনি কার্যত নিজেরই পুরোনো রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যেমনটা ২০২৪ সালে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক ব্যানার্জি করেছিলেন নিজের রেকর্ড ভেঙে ৭ লাখ ব্যবধানের লক্ষ্য রেখে। রাজনৈতিক রঙের বদল হলেও পুরোনো অভ্যাস বদলানো যে সহজ নয়, রাজ্য উপনির্বাচন আবারও তা প্রমাণ করল।
আরও পড়ুন: গাম্বিয়ার উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে নিহত ১২, উদ্ধার অভিযান চলছে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন