১০:৪৫ এম
চারপাশে থমথমে সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনী, আর মাঝখানে প্রমত্তা শিবসা নদীর বুক চিরে ভেসে বেড়াচ্ছে এক খণ্ড আস্থার ঠিকানা—‘ভাসমান হাসপাতাল’। খুলনার পাইকগাছায় শুরু হয়েছে একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী কার্যক্রম, যা চিকিৎসা বঞ্চিত উপকূলের অবহেলিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। নদীবেষ্টিত দুর্গম জনপদের মানুষের কাছে এই দৃশ্য যেন অনেকটা স্বপ্নের মতো। কারণ, পাইকগাছা উপকূলে এমন উদ্যোগ এই প্রথম।
বাংলাদেশ সরকারের এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ সৌদি আরবের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার ফলে অবহেলিত গড়ইখালী ও আশপাশের অঞ্চলের দুস্থ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য বঞ্চনার অবসান হতে চলেছে।
তবে, পাঁচটি জাহাজে পরিচালিত এই ফ্রেন্ডশিপ ‘ভাসমান হাসপাতাল’ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। এতে উপকৃত হচ্ছে চিকিৎসা বঞ্চিত উপকূলের অসহায় মানুষ। এই পর্যন্ত পাঁচটি ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ জন রোগী। তবে এসব রোগীকে মোট ৯ লাখ ৬১ হাজার ৪০২ বার বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৫ মাসের বকেয়া বেতন ছাড়, ২১৪ স্বাস্থ্যকর্মীকে অব্যাহতির আদেশ
ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ম্যানেজার (জনসংযোগ) জিলফুল মুরাদ শানু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর থেকে খুলনার পাইকগাছা উপকূলে নোঙর করেছে একটি ভাসমান হাসপাতাল। যা সোমবার (২ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে। শিবসা নদীর তীরে ফিতা কেটে এই ভাসমান হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের অর্থায়নে বাংলাদেশে পরিচালিত ভাসমান হাসপাতাল প্রকল্পটির নাম ‘কিং আবদুল্লাহ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’। প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের স্মরণে এবং তার চ্যারিটি প্রোগ্রাম (কেএএপি)-এর অধীনে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) এই প্রকল্পের অর্থায়ন করছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর যৌথ উদ্যোগে এই বিশেষায়িত ৫টি ভাসমান হাসপাতাল জাহাজ ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলের নদী পথগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
মোট ৫টি ডেডিকেটেড হাসপাতাল জাহাজ তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর নাম রাখা হয়েছে কিং আবদুল্লাহ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল ১ থেকে ৫।
আরও পড়ুন: মানিকগঞ্জে ডেঙ্গুতে নতুন ২৯ আক্রান্ত, হাসপাতালে ৭৫ ভর্তি
এই বহরের সবচেয়ে বড় জাহাজটি ৩১ মিটার দীর্ঘ, যাতে রয়েছে সাধারণ সার্জারি এবং চোখের অপারেশনের জন্য দুটি আলাদা আধুনিক অপারেশন থিয়েটার। বাকি ৪টি জাহাজ ২৫ মিটার দীর্ঘ, যা মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা ও ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত হয়।
চোখের ছানি অপারেশন ও সাধারণ ওয়ান-ডে সার্জারি। এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে প্রসূতি ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবা, দাঁতের চিকিৎসা (ডেন্টাল কেয়ার), ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ জন ক্রু ও স্বাস্থ্যকর্মী সার্বক্ষণিক থাকেন, যার মধ্যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সরা জাহাজের কেবিনেই অবস্থান করেন।
মেঘনা, পদ্মা ও যমুনা নদীর তীরবর্তী দুর্গম চরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের উপকূলীয় জেলাগুলোতে (যেমন: চাঁদপুর, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও খুলনা) জাহাজগুলো বিভিন্ন চরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নোঙর করে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ১ হাজার প্রান্তিক রোগীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা দেয়।
আরও পড়ুন: ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ লাখ ছানি অস্ত্রোপচার ও এক কোটি চশমা বিতরণের লক্ষ্য সরকারী
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নটি সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এবং নদীবেষ্টিত হওয়ায় এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত। সামান্য চিকিৎসার জন্যও এই অঞ্চলের মানুষকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘপথ, যা গরিব ও দুস্থ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে আজীবন বঞ্চিত এই অঞ্চলের মানুষের কষ্ট দূর করতেই শিবসা নদীতে নোঙর করেছে এই বিশেষ হাসপাতালটি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাসপাতালের প্রশাসক শাহ আলম, প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আক্তার, মাওলানা আমিনুল ইসলাম, মাওলানা জিএম বুলবুল আহমেদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ভাসমান হাসপাতালটি আগামী তিন মাস একটানা শিবসা নদীতে অবস্থান করবে। এর মাধ্যমে গড়াইখালী এবং এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার অসহায়, দুস্থ ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষ ঘরে বসেই বিনামূল্যে মূল্যে জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেক দরিদ্র মানুষ রয়েছেন, যাদের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া কঠিন। নদীতে ভাসমান হাসপাতাল চালু হওয়ায় তারা কাছাকাছি থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। এটি আমাদের এলাকার মানুষের জন্য খুবই উপকারী উদ্যোগ।’
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছে মেডিকেল রিসার্চ বাংলাদেশ
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ বলেছেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের মানুষ চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খান। ভাসমান হাসপাতালটি তিন মাস সেবা দিলে এলাকার অনেক অসহায় মানুষ উপকৃত হবেন বলে আশা করছি।’
ভাসমান হাসপাতালটির উদ্বোধনকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকার চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই ভাসমান হাসপাতালটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব মানুষ কখনও ভালো ডাক্তারের মুখ দেখেননি, তারা এখন নদীর বুকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।’
প্রকল্প ব্যাবস্থাপক ফিরোজ আকতার বলেন, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে সৌদি সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পাঁচটি ভাসমান হাসপাতাল উপকূলীয় অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। এর একটি বাগেরহাটের মোংলা এবং খুলনার দাকোপ উপকূলে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে গত ২৮ অক্টোবর থেকে একটি জাহাজ খুলনার পাইকগাছা উপকূলে নোঙ্গর করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী তিন মাস একইস্থানে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ম্যানেজার (জনসংযোগ) জিলফুল মুরাদ শানু জানান, মোট ৫টি জাহাজের মাধ্যমে এই পর্যন্ত ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। মোট ৯ লাখ ৬১ হাজার ৪০২ বার বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে কার্যক্রম শুরু করে কেএএপি-এমএইচবি-১ জাহাজটির বর্তমান অবস্থান বরগুনার আমতলীতে। এর মাধ্যমে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭১৬ জন রোগী মোট ২ লাখ ৩ হাজার ৭৯৯ বার সেবা পেয়েছেন।
আরও পড়ুন: ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ লাখ ছানি অপারেশন ও ১ কোটি চশমা বিতরণের ঘোষণা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-৩ জাহাজটির বর্তমান অবস্থান পাবনার বেড়ায়, যেখান থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৭৬ জন রোগীকে মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭২০ বার সেবা দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে খুলনা উপকূলে সেবা প্রদানকারী কেএএপি-এমএইচবি-৪ জাহাজ থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১৩ জন রোগী মোট ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯৪ বার সেবা পেয়েছেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে কার্যক্রম শুরু করা সর্বশেষ কেএএপি-এমএইচবি-৫ জাহাজটি বর্তমানে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে অবস্থান করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের নদীমাতৃক ও চিকিৎসাবঞ্চিত এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এই ভাসমান হাসপাতালগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় এই ‘ভাসমান হাসপাতাল’ কেবল একটি চিকিৎসা কেন্দ্রই নয়, বরং এটি উপকূলবাসীর মনে বেঁচে থাকার নতুন এক স্বপ্ন ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সূত্র: বাসস
আরও পড়ুন: শিশুদের বিকাশে সচেতনতা ও চিকিৎসার সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরলেন ডা. শাহাদাত হোসেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন