১০:৩০ পি.এম
কক্সবাজার জেলায় এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ভয়াবহ ফল বিপর্যয় ঘটেছে। জেলায় পাসের হার ৪৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, এবারে মাত্র ৫৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২০৬ জন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ফলাফলে দেখা যায়, জেলায় ২৬টি কলেজের মধ্যে ১৯টিতে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে, একমাত্র রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ শতভাগ পাসের কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অমনোযোগিতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে পড়ালেখা করেনি।"
আরও পড়ুন: রাঙ্গামাটিতে বজ্রপাত রোধে মাসব্যাপী তালবীজ রোপণ শুরু
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নানা সমস্যা ছিল। ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে খারাপ ফলের কারণে সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হয়েছে। তিনি জানান, আগামী বছর যাতে ফলাফল ভালো হয়, সে জন্য শিক্ষার মান বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের ভালো ফল অর্জনে শিক্ষা প্রশাসন সচেষ্ট থাকবে।
জেলায় পরীক্ষার্থী ও ফলাফলের চিত্র অনুযায়ী, এবার কক্সবাজার জেলায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ হাজার ৮৪৩ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১১ হাজার ৪৫৮ জন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫ হাজার ১৬২ জন ছেলে এবং ৭ হাজার ৫৩৬ জন মেয়ে। মোট উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ হাজার ৩৪ জন। জেলায় গড় পাসের হার ৪৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে। ছেলেদের পাসের হার ৪১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, আর মেয়েদের ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৫৩ জন।
গত বছর জেলায় পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সে বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২০৬ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমেছে ১৫৩ জন।
আরও পড়ুন: বগুড়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদের ইন্তেকাল
ভালো ফল করা কলেজ
শতভাগ পাস করা রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার ৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই উত্তীর্ণ হয়েছে।
এ ছাড়া পাসের হারে জেলার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সরকারি কলেজ। এ কলেজের ১ হাজার ২২৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯৪৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৪ জন। পাসের হার ৭৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
রামু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ২২ জন। পাসের হার ৭৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কক্সবাজার ডিসি কলেজে ১৮৮ জনের মধ্যে পাস করেছে ১২১ জন। পাসের হার ৬৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন: সোনাপাহাড় ও তেমুহানীতে জোরারগঞ্জ পুলিশের অভিযান: চোলাইমদ ও চোরাই অটোরিকশাসহ গ্রেফতার ৫
কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজে ৯৬৫ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৮১ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন। পাসের হার ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ।
চকরিয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজে ৫৯৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ৩০৬ জন। পাসের হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। রামু সরকারি কলেজে ১ হাজার ৬২ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৩৯ জন। পাসের হার ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
উত্তরণ মডেল কলেজে ৬৪ জনের মধ্যে পাস করেছে ৩০ জন। পাসের হার ৪৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। চকরিয়া সরকারি কলেজে ১ হাজার ৯৭ জনের মধ্যে পাস করেছে ৫০০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। পাসের হার ৪৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
উখিয়া সরকারি মহিলা কলেজে ৬১০ জনের মধ্যে পাস করেছে ২৭৩ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। পাসের হার ৪৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মহেশখালী ডিগ্রি কলেজে ৩৭২ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৬০ জন। পাসের হার ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বাপাজসের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক হলেন নোবিপ্রবির ইফতেখার হোসাইন
বেশির ভাগ কলেজে হতাশাজনক ফল
জেলার অন্যান্য কলেজের ফলাফল আরও হতাশাজনক। মহেশখালী সরকারি মহিলা কলেজে ৪৬৬ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৮১ জন। পাসের হার ৪০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
চকরিয়া আবাসিক মহিলা কলেজে ৪৬৬ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৮২ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। পাসের হার ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ডুলাহাজারা কলেজে ৪২৬ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৬৩ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। পাসের হার ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কুতুবদিয়া সরকারি কলেজে ৫৩৬ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৯২ জন। পাসের হার ৩৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ঈদগাঁও রশিদ আহমদ কলেজে ৩৪৩ জনের মধ্যে পাস করেছে ১০৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ জন। পাসের হার ৩০ দশমিক ৩২ শতাংশ। উখিয়া ডিগ্রি কলেজে ৫০২ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৪৪ জন। পাসের হার ২৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
আরও পড়ুন: পূর্বধলায় গাঁজাসহ আটক ব্যক্তি, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ দিনের কারাদণ্ড
কক্সবাজার সিটি কলেজে ৯৩৭ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৪৭ জন। কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। পাসের হার ২৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। টেকনাফ সরকারি কলেজে ৭৪১ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৯২ জন। কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। পাসের হার ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।
বদরখালী কলেজে ১৭৩ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৪৩ জন। পাসের হার ২৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কক্সবাজার কমার্স কলেজে ১৫৭ জনের মধ্যে পাস করেছে ৩৫ জন। পাসের হার ২২ দশমিক ২৯ শতাংশ। মহেশখালীর হোয়ানক কলেজে ৮৮ জনের মধ্যে পাস করেছে ১৯ জন। পাসের হার ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
কুতুবদিয়া মহিলা কলেজে ১১৪ জনের মধ্যে পাস করেছে ২১ জন। পাসের হার ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। কক্সবাজার হাভার্ড কলেজে ৮১ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১০ জন। পাসের হার ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। কুতুবদিয়া ধুরুং স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭৯ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৭ জন। পাসের হার ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
জেলার সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে চকরিয়া সিটি কলেজ। এ কলেজের ১৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৯ জন। পাসের হার ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় যুবদল ও ছাত্রদল নেতাদের হয়রানির অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা
গত এক দশকের ফলাফল
জেলার গত এক দশকের এইচএসসি ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০২২ সালে ৭৪ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৮৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা ছাড়াই সব পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।
এর আগে ২০১৯ সালে পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৫৫ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৬৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সার্বিক ফলাফল বলছে, কক্সবাজারের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় এবার বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিশেষ করে অধিকাংশ কলেজে জিপিএ-৫ না পাওয়া এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসা শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিতি, নিয়মিত মূল্যায়ন ও শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন