১১:১৯ পি.এম
দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ মানেই সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় বাড়তি উন্মাদনা।
আর সেখানে যদি কোনো বিতর্কিত ঘটনার সম্মিলন থাকে, তবে সেটি তো কথাই নেই; সমর্থকদের তর্ক এবং আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় ওই বিষয়গুলোই।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচে সবচেয়ে বড় বিতর্কিত ঘটনাটি ১৯৯০ বিশ্বকাপে ঘটেছিল।
আরও পড়ুন: তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে ৮ লাখ টাকা, ২ ভরি সোনা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরি: ডেমরায় চাঞ্চল্য
সে বিশ্বকাপে একটি অভিযোগ উঠেছিল আর্জেন্টাইন ফিজিও'র বিরুদ্ধে, যে ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানি খাইয়ে দেয়া হয়েছিল।
তবে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো দলিল বা প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি মূলত ১৯৯০ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর খেলায় ঘটে।
১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালিতে অনুষ্ঠিত রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিলের।
আরও পড়ুন: ভিনিসিয়াস ছাড়া সেভিয়াকে ৪-১ গোলে হারালো রিয়াল মাদ্রিদ
সেই ম্যাচকে ঘিরেই মূলত 'ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানি' খাওয়ানোর অভিযোগটি ওঠে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে, যা ঐতিহাসিকভাবে 'হলি ওয়াটার' স্ক্যান্ডাল নামে পরিচিত।
এখন যেমন, তখনও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল তুমুল উন্মাদনা।
ফলে দুদলের খেলোয়াড়দের মধ্যে জয়ের তীব্র মানসিকতা ছিল।
১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে এই দুই দল বিশ্বকাপে তিনবার মুখোমুখি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ঢামেকে ভুয়া চিকিৎসক মো. রাকিব আটক, থানায় হস্তান্তর
এর মধ্যে ১৯৭৪ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপে জিতেছিল ব্রাজিল এবং ১৯৭৮ বিশ্বকাপে অনুষ্ঠিত দুই দলের মধ্যকার ম্যাচটি অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছিল।
এদিকে, বিশ্বকাপের এই মঞ্চে প্রথমবারের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখছিল আর্জেন্টিনা।
তবে আর্জেন্টিনার অবস্থাও তখন তেমন ভালো ছিল না।
ম্যারাডোনার নৈপূণ্য দিয়ে আগের বিশ্বকাপটি জিতলেও, ওই বিশ্বকাপের অনেক তারকা ইনজুরি এবং খারাপ ফর্মের কারণে ১৯৯০ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন না।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করার তিন দাবি
এছাড়া, বিশ্বকাপের শুরুটাও ছিল আর্জেন্টিনার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।
নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে তারা ১-০ গোলে হারিয়ে বসে!
গ্রুপপর্বের পরের ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-০ গোলে হারালেও রোমানিয়ার সাথে ম্যাচটি ১-১ গোল ড্র করে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে কোনোমতে রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে, ব্রাজিল ছিলেন ওই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল।
আরও পড়ুন: বিএমইউতে ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের
সেবাস্তিও ল্যাজারনির নেতৃত্বে একটি গোছানো দল নিয়ে সেলেসাওরা ঐ বিশ্বকাপে এসেছিল।
গ্রুপপর্বের সবগুলো ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে তারা।
এ কারণে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণে ব্রাজিলই ফেভারিট ছিল।
১০ জুন তুরিনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে অনুমেয়ভাবেই ব্রাজিল শুরু থেকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে।
আরও পড়ুন: শ্বাসকষ্টে হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি নেতা বুলু, দোয়া চাইলেন পরিবার
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ফর্মের অভাবে ছিল ব্যাকফুটে।
মিডফিল্ডে দুই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডারের দুঙ্গা ও অ্যালেমাওর দাপটে বলই পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা।
কিন্তু জালের দেখা মিলছিল না কোনোমতেই।
ব্রাজিলের টানা আক্রমণে দিশেহারা আর্জেন্টিনার পরিকল্পনার সবটা জুড়েই ছিলেন ম্যারাডোনা।
দলে কাউন্টার অ্যাটাকে গোল আদায় করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল তারা।
কিন্তু সেদিন শুরু থেকেই ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা ম্যারাডোনাকে কড়া পাহারায় রাখায় তার সুবিধা করতে পারেননি।
বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক ব্রাংকো সেদিন অসাধারণ খেলছিলেন।
তিনি বেশ কয়েকবার ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলেও ম্যারাডোনা সেটা কিছুতেই করতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রগলিও আহত হয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ ছিল।
কিন্তু পরে খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্রাংকোকে আগের মতন চনমনে লাগছিল না, এবং তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, কিছু হয়েছে।
ব্রাংকোর হুট করে এই পরিবর্তনের সুযোগটাই নিলেন ম্যারাডোনা। ৮১ মিনিটে ব্রাংকোকে অনায়াসেই ফাঁকি দিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন ম্যারাডোনা।
হঠাৎ করেই ব্রাংকো এভাবে খেই হারানোয় পুরো ম্যাচে অসাধারণ ডিফেন্স করা ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ সেটআপ ভেঙে গেলো।
ম্যারাডোনাকে আটকাতে গিয়ে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডাররা তাকে ঘিরে ধরার সময় আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড ক্ল Claudio Kanižia হয়ে যান আনমার্কড।
ম্যারাডোনাও তাই বল বাড়িয়ে দিলেন ক্যানিজিয়ার দিকে।
ব্রাজিলের গোলকিপার তাফারেলকে একা পেয়ে ক্যানিজিয়া বল জালে জড়াতে ভুল করলেন না।
পুরো ম্যাচে আক্রমণে দাপট দেখালেও প্রথম গোলটা পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
তবে গোলের পর থেকেই ব্রাংকোকে অজানা কারণে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল যেন তিনি সতীর্থদের কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।
এদিকে, মেজাজ হারিয়ে খেলার ৮৫ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ব্রাজিলের অধিনায়ক রিকার্ডো গোমেজ।
এভাবে ম্যাচটিতে ব্রাজিল ১-০ গোলে হেরে যায়।
এই হারের ফলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায়।
বিতর্কটি মূলত ম্যাচ শেষের পর শুরু হয়।
ম্যাচ শেষে ব্রাংকো দাবি করেন, দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো ত্রগলিওর ইনজুরি কারণে খেলা যখন বন্ধ ছিল, তখন নাকি আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে একটা বোতল পানি নিয়ে পান করেছিলেন।
আর সেই পানি পান করেই ব্রাংকোর মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে এবং অসুস্থতা তিনি অনুভব করেন।
ব্রাংকো যে আর্জেন্টিনার ফিজিওর আনা পানি খেয়েছিলেন সেটার প্রমাণও ছিল।
কিন্তু পানিতে কিছু মেশানোর অভিযোগ প্রমাণের কোনো সুযোগ ছিল না।
তাছাড়া, ব্রাংকোর বক্তব্যের পর আর্জেন্টিনার প্রেস ব্রাংকোর অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
এ কারণে অভিযোগটি নিয়ে তখন খুব একটা চর্চা হয়নি।
১৫ বছর পর ২০০৫ সালে এই ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বড় বোমাটা ফাটান ম্যারাডোনা নিজেই।
আর্জেন্টিনার এক টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন যে, সেদিন ব্রাংকোকে দেয়া পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন!
আর এই বক্তব্যের পরেই পুরনো সেই আগুন আবার জ্বলে ওঠে।
সেসময়কার সিবিএফ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টোনিও টেক্সেইরা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে চান।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিকার্ডো টেক্সেইরা অভিযোগ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এতে বিষয়টি বেশিদূর এগোয়নি।
ওই ম্যাচের সময়ে আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দোও এ অভিযোগটি অস্বীকার করেন এবং ম্যারাডোনাকে বাস্তবে ফেরার পরামর্শ দেন।
এদিকে, যে ফিজিওকে নিয়ে এত গণ্ডগোল সেই ফিজিও নিজেও পুরো ঘটনা অস্বীকার করেন।
তবে ফিজিওর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড বেবেতো।
তিনি বলেন, 'লরেঞ্জো যদি এ ঘটনা অস্বীকার করে থাকেন তবে তিনি মিথ্যা বলেছেন, লরেঞ্জো পরে আমার কাছে পুরো ঘটনাটি স্বীকার করেছিলেন।'
তখনকার ব্রাজিল কোচ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'এটা কিছুতেই স্পোর্টসসম্যানশিপের অংশ হতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ নোংরা একটা খেলা।
ঘটনা ১৪ বছর আগে অথবা ১৪ দিন, ফিফার উচিত এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের কঠিন শাস্তির আওতায় এনে একটি উদাহরণ স্থাপন করা।
কে নিশ্চয়তা দিতে পারে আর্জেন্টিনা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে এমন কোনো নোংরা খেলতে বাধ্য হয়নি?'
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন