মোঃ শরীফ উদ্দিন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
০৭:০৫ পি.এম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মাদকবিরোধী অভিযানে নিজের চাচাতো ভাই জসীমকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আলোচনায় এসেছেন উপজেলা যুবদলের সভাপতি মোহাম্মদ জামাল আহমেদ। আত্মীয়তার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তার এ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) উপজেলার চাপরতলা ইউনিয়নের খান্দুরা এলাকার সালাম বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করেন জামাল আহমেদ। এ সময় নিজের চাচাতো ভাই জসীমকে আটক করে নাসিরনগর থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুল আলমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় এএসআই জামাল তাকে গ্রেপ্তার করেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর শনিবার (৩১ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ এরফান উদ্দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। মোবাইল কোর্টে জসীমকে ২০০ টাকা অর্থদণ্ড ও দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের মতে, মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে পরিবার কিংবা আত্মীয়তার পরিচয়ের চেয়ে আইনের শাসন ও সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিজের চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধেও মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় জামাল আহমেদের ভূমিকা এলাকায় আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
এলাকাবাসী মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিকানা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইংলিশ ফুটবল ক্লাবটি কিনতে গত এক বছরে সৌদি আরব, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ প্রকাশ করে যোগাযোগ করেছেন, এমনটি জানিয়েছেন সাংবাদিক বেন জ্যাকবস। তবে, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও আসেনি।
প্রতিবেদন অনুসারে, সৌদি আরবের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা একটি জোট গঠন করে সম্ভাব্য অধিগ্রহণের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করছেন। কিন্তু ক্লাব কেনার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এখনও সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি অগ্রসর হয়েছিল। প্রাথমিক যোগাযোগের পর আলোচনা আরও গভীর হয়েছে, তবে তা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে রূপান্তরিত হয়নি। বাহরাইন থেকেও আগ্রহের খবর পাওয়া গেছে, কিন্তু দেশটির কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগকারী এখন পর্যন্ত প্রস্তাব দেয়নি।
এদিকে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কেনার জন্য ২০২৩ সালে আলোচনায় থাকা শেখ জাসিম বিন হামাদ আল থানিকে বর্তমান কোনো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মনে করা হচ্ছে না। তিনি কাতারের একটি বিনিয়োগ গোষ্ঠীর মাধ্যমে ক্লাবটির পূর্ণ মালিকানা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিকানা ২০০৫ সাল থেকে গ্লেজার পরিবারের হাতে রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ ধনকুবের স্যার জিম র্যাটক্লিফ ক্লাবটির সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব কিনেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান আইএনইওএস এরপর থেকে ক্লাবটির ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
তবে, বর্তমান আগ্রহগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিকানা পরিবর্তনের কোনো নিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সৌদি আরব, বাহরাইন এবং আমিরাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ থাকলেও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব না আসা পর্যন্ত বিষয়টি কেবল সম্ভাব্য অধিগ্রহণের আগ্রহ হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে চোরাচালানের সময় দুটি ড্রাম ট্রাক থেকে ৩০২ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধার করেছে জোরারগঞ্জ থানা-পুলিশ। আটজনকে পুলিশ আটক করেছে, যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জোরারগঞ্জ থানাধীন ইছাখালী ইউনিয়নের মুহুরী প্রজেক্টের ৪০ নম্বর গেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে সারবোঝাই ট্রাক দুটি আটক করা হয়।
পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসআই (নিঃ) মো. মতিউর রহমান সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানের সময় চোরাচালানের উদ্দেশ্যে বহন করা দুটি ট্রাকে মোট ৩০২ বস্তা ইউরিয়া সার পাওয়া যায়।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে ৫০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য এক প্রবাসী ব্যবসায়ীকে মুঠোফোনে ভয়ংকর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের পাশাপাশি চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্যও বেরিয়ে এসেছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে সাব্বির হোসেন ওরফে সানি নামে ওই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। সাতক্ষীরার বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরের হামজারবাগে বসবাস করছিলেন এই ব্যক্তি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টে নগরের হামজারবাগের মোহাম্মদ ইউসুফ নামের এক প্রবাসীর ছেলে মোহাম্মদ শওকতকে ফোন করে চাঁদা দাবি করেন সাব্বির। মোহাম্মদ শওকতও একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী।
মুঠোফোনে সাব্বির তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, “একটার মধ্যে যোগাযোগ করবে, ঠিক আছে?....একবার যদি ছেলেপুলে পাঠাতে হয়, ঘটনা ঘটাতে হয়, তবে ৫০ লাখ ১ কোটি হয়ে যাবে, কমবে না।”
শওকত নামের ওই ব্যবসায়ীকে সাব্বির আরও বলেন, “ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করো। তার সঙ্গে কথা বলো। ওনার কাতারের নম্বরটাতে যোগাযোগ করে ক্লিয়ার করে ফেলো। যদি ক্লিয়ার না করো, তবে ফ্যামিলির যেকোনো একজনের শরীর প্রথমে বোলতার বাসা বানিয়ে খেলা শুরু হবে। এরপর আস্তে আস্তে তোমার দিকে আসবে। তোমার বাবাকে কল দিলাম না। তিনি হার্টের রোগী, আবার মরে-টরে যাবে। তাই তোমারে জানালাম।”
পুলিশ জানায়, এ হুমকির একটি অডিও রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে। হুমকির ঘটনার পর ইউসুফ নামের ওই প্রবাসীর ভবনের ফটকে গুলিও করা হয়। ঘটনার পর থেকে সাব্বিরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছিল, কিন্তু তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, বড় সাজ্জাদের কাছ থেকে মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতন পেতেন সন্ত্রাসী সাব্বির। কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের পরিবর্তে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়েছিল। সাজ্জাদের পাশাপাশি তার সহযোগী বোরহান উদ্দিনের নির্দেশনায় মুঠোফোনে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন সাব্বির।
এসপি মাসুদ আলম আরও বলেন, সাব্বির প্রকাশ্যে কম আসতেন। তার কাজ ছিল সাজ্জাদ ও বোরহানের নির্দেশনা অনুসারে ফোন করে চাঁদা দাবি করা। চাঁদার জন্য যে ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিকে ফোন করা হবে, তার বিষয়ে আগে থেকেই বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হতো। মূলত বড় সাজ্জাদ অন্য একটি দলের মাধ্যমে সেই তথ্য সংগ্রহ করতেন। সাব্বির ফোন করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চাঁদার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিতেন। চাঁদা দিতে রাজি না হলে লোক পাঠিয়ে হামলা কিংবা গুলির হুমকি দিতেন তিনি; হুমকি অনুযায়ী সশস্ত্র হামলাও করতেন।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার সাব্বিরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী থানায় দুটি মামলা রয়েছে। তিনি চাঁদা দাবি করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লোকজন ভয়ে মামলা করেননি।
গত ২০ জুন চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে সাব্বিরকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৩৭ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে বিষয়টি ধরা পড়ে। এতে দেখা যায়, সড়কে দাঁড়িয়ে কারখানার দিকে তাক করে ফাঁকা গুলি ছুড়ছেন টি-শার্ট পরা সাব্বির। পরে সড়ক ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় পিস্তল উঁচিয়ে আবার গুলি করতে দেখা যায় তাকে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকার কাটাবন থেকে আটকের পর বরিশালে মৃত্যু, কথিত বন্দুকযুদ্ধের আড়ালে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ; বিশেষ র্যাব ইউনিটকে দিয়ে অভিযান পরিচালনার পেছনে কার ভূমিকা ছিল, তদন্তের দাবি বরিশালবাসীর।
বরিশালের ছাত্ররাজনীতির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি এবং মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মশিউল আলম সেন্টু হত্যাকাণ্ডের ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার নেপথ্যের রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। ২০০৮ সালের ১৫ জুলাই রাজধানীর কাটাবন এলাকা থেকে আটকের পর ১৬ জুলাই ভোরে বরিশালের কাশীপুরের বিল্লবাড়ি এলাকায় র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যুর ঘটনা আজও নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য ছিল, অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সেন্টুর সহযোগীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগ সরকারি সেই ভাষ্যকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে সেন্টুর মৃত্যু নিছক বন্দুকযুদ্ধ, নাকি আটকের পর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
সেন্টু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও অভিযোগ প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউল হাসানের ভূমিকা নিয়ে।
বরিশালের একাংশের মানুষের অভিযোগ, বিএনপি সরকারের আমলে সেন্টুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে হামলার একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেই পুরোনো বিরোধের জের ধরে ওয়ান-ইলেভেনের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের সন্দেহ।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত অভিযোগ অনুযায়ী, মেজর জিয়াউল হাসান তৎকালীন র্যাবের একটি বিশেষ ইউনিটকে সেন্টুকে আটকের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, নাকি কোনো নির্দেশনা বা প্রভাব প্রয়োগ করেছিলেন—এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ধারণা, রাজধানীর কাটাবন থেকে সেন্টুকে আটক করে বরিশালে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার মধ্যে ওই বিরোধের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।
তাদের আরও অভিযোগ, সেন্টুকে আটকের পর গভীর রাতে বরিশালের নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যার পর ঘটনাটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মেজর জিয়াউল হাসানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি নির্দেশ, যোগাযোগ কিংবা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার প্রামাণ্য নথি জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
তাই এ বিষয়ে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা, র্যাবের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য, অভিযানের পরিকল্পনাকারী এবং ঢাকা থেকে বরিশালে সেন্টুকে স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
২০০৮ সালের ১৫ জুলাই রাজধানীর কাটাবন এলাকা থেকে র্যাব সদস্যরা মশিউল আলম সেন্টুকে আটক করেন। পরদিন ১৬ জুলাই ভোরে বরিশাল নগরীর কাশীপুরের বিল্লবাড়ি এলাকায় র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যু হয়েছে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
র্যাবের তৎকালীন ভাষ্য অনুযায়ী, সেন্টুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বরিশালে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছিল। এ সময় তার সহযোগীরা র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে পাল্টা গুলিতে সেন্টু নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছিল।
কিন্তু এ সরকারি ভাষ্যের বিপরীতে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়, সেন্টুর মৃত্যু কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় হয়নি; বরং তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে কাশীপুরের বিল্লবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মরজিনা বেগমের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ভোরে র্যাব সদস্যরা একটি গাড়ি থেকে একজনকে নামিয়ে ধানখেতে নিয়ে যান। এরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি মরদেহ দেখতে পান। তার দাবি, মরদেহের পাশে প্রথমে কোনো অস্ত্র ছিল না, পরবর্তী সময়ে অস্ত্র রাখা হয়।
অধিকারের অনুসন্ধানে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাহতাবসহ স্থানীয় আরও কয়েকজনের বক্তব্যও উঠে আসে। এসব বক্তব্য সরকারি বন্দুকযুদ্ধের বর্ণনাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অধিকারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেন্টুর মায়ের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি দাবি করেন, একজন সেনা কর্মকর্তা তাকে ছেলের জীবন বিপন্ন হওয়ার বিষয়ে আগাম সতর্ক করেছিলেন। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেন।
অধিকারের প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তাকে মেজর মামুন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তৎকালীন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪-ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এখানে মেজর মামুন এবং আলোচনায় আসা মেজর জিয়াউল হাসানের পরিচয় ও ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। একই ব্যক্তি কি না, নাকি আলাদা কর্মকর্তা—তা নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক ধরপাকড়, অভিযান এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
সেন্টু ছিলেন বরিশালের ছাত্ররাজনীতির পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতা। বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচিতি এবং মহানগর ছাত্রদলের নেতৃত্বে তার অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তার হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত বিরোধ, স্থানীয় প্রতিপক্ষের ইন্ধন কিংবা তৎকালীন প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার—কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা এখনো নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায়।
বিশেষ করে বিএনপি সরকারের আমলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে হামলার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের আমলে সেন্টুর হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সেন্টু হত্যাকাণ্ড শুধু বরিশালের স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকেনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ ঘটনা গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের ২০০৯ সালের প্রতিবেদনে মশিউল আলম সেন্টুর হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে ১৫ জুলাই আটকের পর ১৬ জুলাই তার মৃত্যুর বিবরণ এবং তৎকালীন র্যাবের বক্তব্যের পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০০৮ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে অধিকার ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যের ভিত্তিতে সেন্টু হত্যাকাণ্ড, পরিবারের অভিযোগ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
এসব নথি প্রমাণ করে, সেন্টুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সে সময় থেকেই গুরুতর মানবাধিকার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল।
সেন্টুর পরিবারের অভিযোগ, তৎকালীন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভীতি এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছিল, সেন্টুর মা র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলেও আইনজীবীরা বাহিনীর প্রতিশোধের আশঙ্কায় মামলা নিতে আগ্রহী হননি বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছিল।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভিপি সেন্টু হত্যাকাণ্ডেরও পুনঃতদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও স্থানীয় সচেতন মহল।
সেন্টুকে কেন রাজধানীর কাটাবন থেকে আটক করা হয়েছিল? কোন ইউনিটের নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় তাকে বরিশালে আনা হয়েছিল? ঢাকা থেকে বরিশালে স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্বে ছিলেন? তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউল হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিশোধের অভিযোগের ভিত্তি কী? র্যাবের কোন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি ভাষ্যের এত পার্থক্য কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে তৎকালীন র্যাবের অভিযানসংক্রান্ত নথি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিচয়, আটক ও হস্তান্তরের রেকর্ড, ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, অস্ত্র উদ্ধারের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
মশিউল আলম সেন্টুর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হলে শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নির্দেশনা প্রদানের পর্যায়ে কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিও তদন্ত করতে হবে।
এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রকৃত ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অজানা তথ্য উদ্ঘাটনে তালাশ বিডির অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে এ বিষয়ে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সত্য উদ্ঘাটন ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে তালাশ বিডি।
ভিপি সেন্টু হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় পর্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে হাজির হবে তালাশ বিডি। সত্যের অনুসন্ধানে তালাশ বিডির সঙ্গেই থাকুন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ