০৬:৫১ পি.এম
স্বচ্ছ, শীতল ও সবুজ জলধারা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যাদুকাটা নদী সুনামগঞ্জের রূপেশ্বরী এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। রাতের অন্ধকারে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার ফলে বিশ্বখ্যাত জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান, ঘাগটিয়া এবং মানিগাঁওসহ পূর্ব-পশ্চিম তীরের ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বসতভিটে, গাছপালা এবং পরিবেশ-প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রতি রাতে ড্রেজার ও সেইভ মেশিনের মাধ্যমে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে শত শত নৌযানে বালু ভর্তি করে পাচার করা হচ্ছে। ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প, কাঁচা-পাকা সড়ক, ফলদ এবং বনজ গাছের বাগান নদীগর্ভে হারাতে বসছে।
গত দুই মাস ধরে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা মেশিন, বেলচা, বালতি ও শ্যালু মেশিনের সেইভসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে দিন-রাত নদীর তীর কেটে বালু বোঝাই করা হচ্ছে। কখনো রাতের অন্ধকারে ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার করে, আবার কখনো দিনে নৌকা নোঙর করে বেলচা ও বালতি দিয়ে তীরে গভীর গর্ত খোলা হচ্ছে। এর ফলে পুরো তীর ধসে পড়ছে। শত শত কাঠের তৈরি বারকি এবং স্টিলের নৌকা নদীর তীরে জড়ো হয়ে দিন-রাত সাহায্য করছে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: সকাল হলে ভাগ্য নির্ধানের পালা
এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পূর্ব এবং পশ্চিম তীরের ঘাগটিয়া, মানিগাঁও, লামাশ্রম, রাজাগাঁও, সোহালা, মিয়ারচর, বারিকটিলা, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি ও গড়কাটিসহ ২০টি গ্রাম বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব গ্রামের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতু, কৃষিজমি ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে রয়েছে।
নদীর তীর ভাঙনের শিকার অনেক বাসিন্দা তাদের ভেঙে যাওয়া বসতঘরের পুরোনো মরিচা পড়া ঢেউ টিন, বাঁশ-পালা ও কাঠের চটিসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী নৌকায় বোঝাই করে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট গ্রামের বাসিন্দাদের বসতভিটের ঠিক সামনে থেকে তীর কাটায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সিন্ডিকেটের ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের বসতঘর, গোয়ালঘর, খড়ের ঘর থেকে শুরু করে রান্নাঘর, কৃষিজমি ও বাঁশবাগান সবকিছু বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
তীর কাটার ফলে বিভিন্ন গাছগাছালির শিকড় মাটির গভীর থেকে নদীর পানিতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও আস্ত বাঁশঝাড় নদীতে ধসে পড়ছে। এইভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সবুজ বৃক্ষরাজির শোভিত যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী গ্রামের পরিণতি মরু প্রান্তরে পরিণত হবে।
আরও পড়ুন: বালিয়াডাঙ্গীতে পতিলাভাষা যুব সমাজের উদ্যোগে তাফসিরুল কুরআন মাহফিল অনুষ্ঠিত
এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে দেশের বৃহত্তম জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগানও এখন বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। বাগানের কয়েক হাজার শিমুল গাছ ও লেবু বাগান নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বাগানের উত্তর ও পূর্ব দিকে নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে। পূর্ব দিকে যদি আর মাত্র ১০০ মিটার তীর কাটা হয়, তবে বাগানের সামনের অংশ নদীতে তলিয়ে যাবে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে শুরু হওয়া যাদুকাটা নদীর প্রস্থ একসময় ছিল মাত্র ৫৭ মিটার। কিন্তু বিগত তিন দশকে অনবরত তীর কেটে বালু উত্তোলনের কারণে নদীটির প্রস্থ সর্বনিম্ন ২০০ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ১ কিলোমিটার বেড়ে গেছে।
নদী রক্ষা এবং বালু মহালের ইজারা বাতিল করে এই এলাকায় পরিবেশ প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণার দাবিতে সুনামগঞ্জ এবং সিলেটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস করেন না। তারা এই বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিবেশ দফতরের পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম আদালতের আদেশের অজুহাত দেখান। তিনি বলেন, ‘আদালতের আদেশের কারণে আমরা বোমা মেশিন, ড্রেজার ও সেইভ দিয়ে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছি না।’
আরও পড়ুন: কাউনিয়া থানা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, টার্গেটে মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ‘তীর কেটে বালু উত্তোলন বন্ধ করার জন্য পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’
অবশ্য সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান নদীর পাড় কাটা বন্ধে সকল বাহিনী মিলে যৌথ অভিযানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এখন থেকে জরিমানার পরিবর্তে কারাদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এবং উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (৫ জুন) যাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের সময় তীর ধসে পড়লে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে হাফেজ শিক্ষার্থীদের স্পোকেন ইংলিশ কোর্স সম্পন্ন, সনদ ও বই বিতরণ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন