০১:০৭ এম
দলীয় পদের বেপরোয়া প্রভাব, পুলিশ কর্মকর্তার অশুভ যোগসাজশ আর পারিবারিক ক্ষমতার দাপটে বরিশালে এক সাধারণ কর্মচারীর সারাজীবনের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেওয়ার জঘন্য চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের রূপাতলী আহমেদ মোল্লা সড়ক এলাকায় ১০ শতাংশ জমি জোরপূর্বক গিলে খেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মহানগর বিএনপির বিতর্কিত নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ। আর এই তাণ্ডবের নেপথ্য শক্তি ও মূল আশ্রয়দাতা হিসেবে আঙুল উঠেছে তাঁরই জামাতা, বরিশাল মহানগর বিএনপির প্রভাবশালী সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারের দিকে।
অভিযোগ রয়েছে, জামাতা জিয়াউদ্দিন সিকদারের উচ্চপদস্থ দলীয় পদবি ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল বানিয়ে সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় ভূমিদস্যুতা ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিঃস্ব করার অপকর্ম চালিয়ে আসছেন।
বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ
আরও পড়ুন: কোম্পানীগঞ্জে কাদের মির্জার অনুসারী শীর্ষ সন্ত্রাসী কেচ্ছা রাসেল গ্রেফতার
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে বরিশাল প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নিজের জীবনের আকুতি ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার দাবি করেন ভুক্তভোগী নাসির হাওলাদার। তিনি বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের একজন সাধারণ উমেদার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ও অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন:
"আমি ও আমার স্ত্রী কষ্টার্জিত টাকায় ২০১৫ সালে রূপাতলীতে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করি। কেনার পর থেকে জমিটি আমাদের পূর্ণ ভোগদখলে রয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে নিয়ম অনুযায়ী নকশা অনুমোদন করাই এবং সরকারি খাজনাও নিয়মিত পরিশোধ করি। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও জমিতে সীমানা ও নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলেই বাধার মুখে পড়ি।"
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আকুল মিনতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন:
আরও পড়ুন: গোমস্তাপুরে সড়ক পার হওয়ার সময় ভটভটিচাপায় গৃহবধূর প্রাণ গেল
"আজকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার দলিলকৃত জমি জবরদখল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন আমার দলেরই প্রভাবশালী নেতা—মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারের শ্বশুর ও সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ এবং মেহেন্দিগঞ্জ থানার এএসআই গোলাম কিবরিয়া। জিয়াউদ্দিন সিকদারের এই লাগামহীন রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে আজ আমি ও আমার পরিবার চরমভাবে নিঃস্ব হতে বসেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে আমার সনির্বন্ধ আকুতি—আপনার দলের এই ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ভূমিদস্যু এবং তাঁদের দোসর এএসআই কিবরিয়া ও ফিরোজ আহমেদের হাত থেকে আমাদের মতো সাধারণ ও নিরুপায় পরিবারকে রক্ষা করুন। আমরা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার চাই।"
এএসআই গোলাম কিবরিয়া ও ফিরোজ আহমেদের ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ চক্রান্ত
সংবাদ সম্মেলনে ওঠা অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত চাল। মেহেন্দিগঞ্জ থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) গোলাম কিবরিয়া হঠাৎ করেই ওই জমির ওপর নিজের দাবি তোলেন। কিন্তু সরকারি চাকরিতে থেকে সরাসরি জমি দখল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তিনি বেছে নেন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ফিরোজ আহমেদকে। এএসআই কিবরিয়া গোপনে সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদকে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দলিল লিখে দেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা কিসের ভিত্তিতে একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতার হাতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেবেন? স্পষ্টতই, জামাতা জিয়াউদ্দিন সিকদারের রাজনৈতিক শক্তি ও ক্যাডার বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে জমি হাতানোর উদ্দেশ্যেই এএসআই কিবরিয়া ও ফিরোজ আহমেদের মধ্যে এই অশুভ চুক্তি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হিলি স্থলবন্দরে ৭ দিন আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক
ক্যাডার বাহিনীর তাণ্ডব ও ৯৯৯-এর ব্যর্থতা
গত ৬ অক্টোবর সকালে এএসআই গোলাম কিবরিয়ার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নাসির হাওলাদারের কেনা জমিতে হামলা চালায়। সেখানে জোরপূর্বক গেট ও হোল্ডিং টাঙিয়ে দখলের মহড়া দেয় ফিরোজ আহমেদ ও কিবরিয়ার লোকজন।
ঘটনার সময় চরম আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করলেও কোনো তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি। এর আগেও তাঁর জমি থেকে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও মালামাল লুট করা হয়েছে। থানায় বারবার লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। পুলিশের অভ্যন্তরীণ লোক এএসআই গোলাম কিবরিয়া এবং মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতা জিয়াউদ্দিন সিকদারের নাম জড়ানো থাকায় স্থানীয় থানা প্রশাসন একপ্রকার নীরব ভূমিকা পালন করছে। ফলে পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই নিরুপায় সরকারি কর্মচারী।
গিরগিটির মতো রাজনীতি, ভাইরাল গালাগালির ভিডিও ও বিএনপির ভাবমূর্তি সংকট
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফ হত্যা: দুর্গাপুরে অপূর্ব নামের যুবক গ্রেপ্তার
অভিযুক্ত ফিরোজ আহমেদের দেউলিয়া রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও নগরজুড়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালে দল বদলে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপি তাঁকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছিল। তবে সংসদ নির্বাচনের আগে রহস্যজনকভাবে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় মহলের দাবি, এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছেন তাঁর জামাতা বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার। জামাতার পদ-পদবি ও প্রভাবকে ঢাল বানিয়েই শ্বশুর ফিরোজ আহমেদ এলাকায় এমন বেপরোয়া ভূমিকায় নেমেছেন।
এদিকে ক্ষমতার দাপটে অন্ধ ফিরোজ আহমেদের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে তাঁর মুখে চরম অকথ্য ও বিচ্ছিরি ভাষায় গালাগাল করতে দেখা ও শোনা গেছে, যা নিয়ে সমগ্র বরিশাল নগরজুড়ে চরম তোলপাড় ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একসময় বহিষ্কৃত হয়েও জামাতার ক্ষমতার জোরে দলে ফেরা এবং এই ধরনের কুৎসিত ভাষা ব্যবহারের ফলে বরিশালে বিএনপির মতো ঐতিহ্যবাহী বড় একটি দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের এই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে দলের সুনামে বড় ধরনের দাগ পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন রাজনৈতিক মহল।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি অভিযুক্তরা
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে মেহেন্দিগঞ্জ থানার এএসআই গোলাম কিবরিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিযুক্ত সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দায়সারাভাবে বলেন, "এখন একটি সালিশিতে ব্যস্ত আছি। পরে সরাসরি সাক্ষাতে কথা হবে।"
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফের পরিবারকে ১ লাখ টাকা সহায়তা, স্ত্রীকে চাকরির আশ্বাস ডেপুটি স্পিকারের
প্রেশনের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা ও জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি
political পরিচয় ও পুলিশি পদবি ব্যবহার করে সাধারণ কর্মচারীকে নিঃস্ব করার এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী নাসির হাওলাদার ও স্থানীয় সচেতন মহল অনতিবিলম্বে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জমির সমস্ত নথিপত্র সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, কোনো দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাবে প্রভাবিত না হয়ে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার জোর দাবি জানানো হয়। অভিযুক্ত এএসআই গোলাম কিবরিয়া, সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ এবং নেপথ্যের কুশীলবদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে প্রেমের টানে বাংলাদেশে এলেন চীনা যুবক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন