০১:২৭ পি.এম
নব্বই পেরোনো হাসমত বেপারীর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নিজের ভিটেমাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন বারবার ভেঙে দিয়েছে সর্বগ্রাসী পদ্মা নদী। গত কয়েক দশকে সাতবার তার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এবারও পদ্মার ভয়াল ভাঙনের কবলে পড়ে স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে ভাড়া বাসায়।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা হাসমত বেপারী বর্তমানে স্ত্রী, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। তার একমাত্র ছেলে সৌদি আরবে কর্মরত। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মাথা গোঁজার স্থায়ী কোনো ঠাই নেই এই বৃদ্ধের। চোখের সামনে বারবার ভেঙে যেতে দেখেছেন নিজের হাতে গড়া বাড়ি, আবাদি জমি আর বহু বছরের স্মৃতি।
কাঁপা কণ্ঠে হাসমত বেপারী বলেন, "জীবনে আটবার ঘর তুলেছি। সবই গিলে খেয়েছে পদ্মা। এই বয়সে এসে আর নতুন করে কিছু করার শক্তি নেই। বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছি। জানি না, শেষ বয়সে নিজের একটা ঘরে মরতে পারব কি না।"
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় প্রবাসী আকাশ মিয়ার বিরুদ্ধে বানোয়াট কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ করায় একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে জখম
হাসমত বেপারীর মতো এমন বেদনাময় গল্প সদরপুর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকার অসংখ্য মানুষের। প্রতি বছরই নদীভাঙনের কারণে ভিটেমাটি হারাচ্ছে শত শত পরিবার। বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লেই বাড়ে আতঙ্ক, কাটে নির্ঘুম রাত। নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমানে উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী ও বেপারীডাঙ্গী এবং আকোটেরচর ইউনিয়নের ছলেনামা ও আকোট গ্রামে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয়, আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রাম, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিয়াজখালী বাজার এবং আকোট গুচ্ছগ্রামসহ অন্তত ১০টি গ্রাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন ধরে পদ্মার তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে পল্টন হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বি-ক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং কার্যকর নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে আকোটেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী বলেন, "ভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।"
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুনাহার বলেন, "আমরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু করেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানানো হয়েছে।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন বলেন, "পদ্মা নদীর ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
আরও পড়ুন: বর্ষপূর্তিতে ম্যাগাজিন বর্ষবার্তা বের হচ্ছে
পদ্মার ভয়াল থাবায় বছরের পর বছর ধরে সর্বস্ব হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন থামছেই না। হাসমত বেপারীর মতো অসংখ্য মানুষ আজও অপেক্ষায়—কবে মিলবে নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান, কবে ফিরবে নিজের ভিটেমাটিতে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন