০৫:১৩ পি.এম
বগুড়া শহরে পকেটমারদের কার্যকলাপ যেন থামার নাম নিচ্ছে না। বাজার, বিপণিবিতান, বাসস্ট্যান্ড এবং রেলস্টেশন—জনসমাগমের স্থানগুলোতে সক্রিয় রয়েছে পকেটমার চক্র। গ্রাম-গঞ্জ থেকে জীবিকার তাগিদে কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে আসা মানুষরা তাদের খপ্পরে পড়ে হারাচ্ছেন টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র।
সম্প্রতি, পকেটমার সন্দেহে একজনকে আটক করার সময় পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হামলার শিকার হয়েছেন। এই ঘটনার পর পুলিশ পকেটমার চক্রের সর্দার হিসেবে পরিচিত রতন ব্যাপারীকে আটক করেছে। পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, ছিনতাই ও পকেটমারির সঙ্গে সম্পর্কিত ২৮টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, বগুড়া শহরের উত্তর চেলোপাড়ায় অন্তত ৩০০ জন পকেটমার বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন নারী এবং ৩০ জন শিশু রয়েছে। তালিকায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধও অন্তর্ভুক্ত আছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় পকেটমারদের কার্যকলাপ চললেও তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গণগ্রেপ্তার, আটক ও অস্ত্র আইনে মামলা—কোনো পদক্ষেপেই তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। অনেকের অভিযোগ, অজ্ঞাত কারণে তাদের অপরাধ নির্মূলে পুলিশের সমন্বিত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
আরও পড়ুন: ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপি নেতা শামছুল হকের সংবাদ সম্মেলন
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত ৩০০ জনের মধ্যে অন্তত শতাধিক বগুড়া শহরের বাইরে গিয়ে পকেটমারির সঙ্গে জড়িত। তারা রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, বিভিন্ন হাট-বাজার, মেলা ও জনবহুল এলাকায় সক্রিয় থাকেন। নিয়মিত যাতায়াত করেন নওগাঁ, সান্তাহার, জয়পুরহাট, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী এবং সিরাজগঞ্জে। পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে যে, কয়েকজন পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও গিয়ে পকেটমারি করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উত্তর চেলোপাড়ার চিহ্নিত পকেটমার পাথারু, মমতাজ ও শাহ আলম পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে ভারতে গিয়ে পকেটমারি করেন। তাদের বিরুদ্ধে বগুড়াতেও একাধিক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া আরো অন্তত ২০ জন একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পকেটমার ধরতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ
গত ২০ অক্টোবর দুপুরের পর বগুড়া শহরের দত্তবাড়ী এলাকায় যানজট নিরসন ও পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষ অভিযান চালায় সদর থানা পুলিশ। এই অভিযানের সময় মাটিডালীগামী সড়কে শতাব্দী ফিলিং স্টেশনের বাঁ পাশে রতন ব্যাপারীকে আটক করতে যান এএসআই উজ্জ্বল। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রতনের মারধরে ওই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন বলে পুলিশের দাবি। পরে রতনের সহযোগী ও স্থানীয় কয়েকজন নারীও তার ওপর চড়াও হন বলে জানায় পুলিশ।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং লিডার বগার ৪ সহযোগী গ্রেপ্তার
পুলিশ জানায়, রতন ব্যাপারীর বিরুদ্ধে অস্ত্র, ছিনতাই ও পকেটমারিসহ ২৮টি মামলা রয়েছে। তাকে আটক করার মাধ্যমে চক্রটির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ। তবে একের পর এক মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও পকেটমারদের দৌরাত্ম্য কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা টাকা খুইয়ে থানায় যেতে চান না।
বগুড়া শহরে পকেটমারদের তৎপরতার শিকার হচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বগুড়ার ফটো সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, সদর থানার সামনে থেকেই তার পকেট থেকে মোবাইলফোন চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করেও আজ পর্যন্ত ফোনটি উদ্ধার করতে পারেননি।
মহাস্থান এলাকার মোস্তফা আলম জানান, গত ১৫ অক্টোবর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খোয়া যায়। টাকা হারিয়ে কেনাকাটা না করেই বাড়ি ফিরতে হয় তাকে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লা সীমান্তে ৩৮ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ
থানায় অভিযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, থানায় গিয়ে কী হবে? আরো ঝামেলা বাড়বে মনে করে বাড়ি ফিরে যাই।
ভুক্তভোগীদের এমন অনীহা পকেটমারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে পুলিশ মনে করছে। অনেকেই টাকা হারানোর পর থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে সন্দেহভাজন কাউকে আটক করা হলেও নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। আবার কাউকে ধরে মামলা দিয়ে চালান দিলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলীর।
পকেটমারের হটস্পট
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের সাতমাথা, নিউমার্কেট, সদর থানা মোড়, রেলগেট, দত্তবাড়ী, রেলস্টেশন, শজিমেক হাসপাতাল, মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, বড়গোলা, চেলোপাড়া ব্রিজসহ বিভিন্ন এলাকায় পকেটমারদের উৎপাত বেশি।
আরও পড়ুন: সরকার বিতর্কিত ইসিএ আইন বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছে
সপ্তপদী মার্কেটের ব্যবসায়ী গোলাম হোসেন জানান, সাতমাথা এলাকায় প্রতিনিয়ত পকেটমারদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ।
রহমাননগরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, শজিমেক ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে পকেটমারদের উৎপাত থাকে। অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছে এদের খপ্পরে।
প্রতি মাসে হারায় দুই শতাধিক মোবাইল
বগুড়া সদর থানা সূত্র জানায়, পকেটমারের খপ্পরে পড়ে টাকা খোয়া গেলে খুব কমসংখ্যক মানুষ থানায় অভিযোগ করতে আসেন। তবে মোবাইলফোন হারালে অনেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। মোবাইল হারানো সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতি মাসে থানায় দেড় থেকে দুই শতাধিক জিডি হয়। এর অধিকাংশই শহরে পকেটমারের খপ্পরে পড়ে মোবাইল হারানোর ঘটনা বলে পুলিশের ধারণা। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচটি মোবাইলফোন হারানোর ঘটনা থানার নথিতে আসছে।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে কনসার্ট থেকে ফেরার পথে সড়কে ঝরল দুই বন্ধুর প্রাণ
বগুড়া জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম রুবেল বলেন, পকেটমাররা গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে এলেও মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র যথাযথভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় অনেক সময় জামিন পেয়ে যায়।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, পকেটমার চক্রের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের পুলিশ ভালোভাবেই চেনে। অথচ রহস্যজনক কারণে তাদের গ্রেপ্তারে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী বলেন, প্রায় ৩০০ পকেটমার আছে চেলোপাড়া এলাকায়। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। তালিকা ধরে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন মার্কেট ও জনবহুল পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পকেটমারদের সর্দার রতন ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওসি আরো বলেন, পকেটমারের খপ্পরে পড়ে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় থানায় অভিযোগ করতে চান না। এতে পকেটমার আটকের পর পুলিশকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তবে যারা অভিযোগ করেন, তাদের অনেকের খোয়া যাওয়া টাকাও উদ্ধার করে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: যশোরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৪৫ বছর বয়সী নারীর মৃত্যু
পুলিশের তালিকায় ৩০০ পকেটমার, একের পর এক গ্রেপ্তার ও মামলা, তবু থামছে না তাদের দৌরাত্ম্য। প্রশ্ন উঠছে, এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে কারা? কারা দেয় তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়? আসল গডফাদার কে? বারবার গ্রেপ্তারের পরও কীভাবে তারা একই অপরাধে ফিরে আসে? প্রশাসন তাদের দমনে সমন্বিত উদ্যোগ কেন নেয় না? চুনোপুঁটিদের পাশাপাশি চক্রের মূল হোতা ও নেপথ্যের মদদদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি বগুড়াবাসীর।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন