০৮:৫৪ পি.এম
ভারত প্রথম বুলেট ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জাপানের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, যারা উচ্চগতির রেলের উদ্ভাবক এবং সহজ শর্তে অর্থায়নে আগ্রহী। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই রেলপথে এখনো কোনো যাত্রী পরিবহন সম্ভব হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, লাগামহীন খরচ বৃদ্ধি এবং সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে একটি তিক্ত বিরোধ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে দেশ দুটির অবকাঠামোগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খবর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে মুম্বাই ও আহমেদাবাদকে সংযুক্তকারী ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেললাইনটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল।
গতি, নির্ভরযোগ্যতা এবং দক্ষতার জন্য জাপানের বুলেট ট্রেন বিশ্বজুড়ে ঈর্ষণীয়। তাই দিল্লি এ কাজের জন্য টোকিওর সঙ্গে চুক্তি করে। ২০১৫ সালে দেশ দুটি ১ হাজার ৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ডলারের—যা প্রায় ৯৮ হাজার কোটি রুপি—একটি চুক্তিতে সম্মত হয়। এই চুক্তির আওতায় জাপান ৫০ বছর মেয়াদি ঋণ প্রদান করে, যার সুদের হার মাত্র ০.১ শতাংশ।
আরও পড়ুন: ইসরাইলি সেনাদের নৃশংসতা নিয়ে ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রের আলোচনা
ট্রেন চালুর প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২৩ সাল। তবে জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেক পিছিয়ে যায়। দিল্লি সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি ডলারে (প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি রুপি) দাঁড়িয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশ দুটির মধ্যে টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে।
জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা গত জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, "প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে শতভাগ দায়ী ভারত। তারা কখনোই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না।"
এদিকে জাপানি কর্মকর্তারা দিল্লির বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, সিগন্যালিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান জার্মান শিল্পগোষ্ঠী সিমেন্সকে দেওয়া হয়েছে। জাপানের বুলেট ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং সময়ানুবর্তিতা বজায় থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার কারণে। সেখানে জাপানি রেল ট্র্যাক, ইউরোপীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ভারতীয় ট্রেনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পরীক্ষাহীন।
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ ‘জেআর ইস্ট’-এর নেতৃত্বাধীন জাপানি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
আরও পড়ুন: ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলেন মেহেরদাদ আখলাঘি কেতাবচি
জাপানি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি পরিস্থিতিকে ‘বিশৃঙ্খলাপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, আলোচনা বর্তমানে অচলাবস্থায় রয়েছে। তবে জেআর ইস্ট সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এই প্রকল্প তদারকির জন্য জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করতে পারে, যা জাপানি ট্রেনগুলোর সক্ষমতার সমতুল্য হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, "উভয় পক্ষ এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত এবং বিস্তারিত আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।"
ইতোমধ্যে আহমেদাবাদ-মুম্বাই রুটে ভারতে তৈরি ‘সেমি হাইস্পিড’ বন্দে ভারত ট্রেন চলাচল করছে। তা ছাড়া রেল মন্ত্রণালয় প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সাতটি হাইস্পিড রেল করিডোর চিহ্নিত করেছে। এর মাধ্যমে ১৬ লাখ কোটি রুপি (১৬৭ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে বলে দেশটি আশা করছে।
আরও পড়ুন: নুডুলস খেয়ে একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ভারত জানিয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে এই উচ্চগতির রুটের মাত্র ১০০ কিলোমিটারের একটি অংশ চালু হবে। এতে অপেক্ষাকৃত ধীরগতির ভারতে তৈরি ট্রেন ব্যবহার করা হবে। যদিও জাপানি কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপটি মাত্র ৫০ কিলোমিটারজুড়ে হতে পারে। তবে এই সময়সীমার বিষয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন