১০:৪৪ এম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষিখাতকে সহায়তা করবে এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করবে। আজ শনিবার বে অব বেঙ্গল কনফারেন্স অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬" আয়োজনের জন্য সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজকে ধন্যবাদ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জনগণের সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। অগ্রাধিকারগুলো হলো জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। তিনি বলেন, "আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।"
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সকল খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা অপরিহার্য, আর দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতা সেই নিশ্চয়তা প্রদান করবে।
আরও পড়ুন: ডার্ক ওয়েবে ১৮ লাখ বাংলাদেশির ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা অগ্রাধিকার পান। "ফ্যামিলি কার্ড" এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছাবে, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। "কৃষক কার্ড" কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষি সেবা ও বাজার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করবে। "হেলথ কার্ড" নিশ্চিত করবে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা। চূড়ান্তভাবে, "ইউনিভার্সেল কার্ড" নাগরিকদের এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবাসমূহ গ্রহণের সুযোগ দেবে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের কাজ চলছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সনদের জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য তৈরি করবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগও থাকবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। সরকার প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি প্রদান করবে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারিত করা হবে।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী জাতীয় অগ্রগতির এক অনন্য চালিকাশক্তি। এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে প্রয়োজন দক্ষতা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান। ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গ্রহণ করা হচ্ছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্ট-আপগুলোকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেওয়া হবে এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশন এ রূপান্তর করা হবে।
আরও পড়ুন: ডেপুটি স্পিকার তরুণদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন
অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিখাত। প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে শক্তিশালী বাংলাদেশ।
পরিবেশ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফাইড ফ্যাকটরির মধ্যে ৫৩টি বাংলাদেশে অবস্থিত। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সুদৃঢ় করা হচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলব, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
বাংলাদেশ একই সাথে একটি বড় বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। প্রধান লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন। সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান করাও জরুরি; যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও মিয়ানমারেই হতে হবে।
আরও পড়ুন: অর্থমন্ত্রী: চলতি বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বঙ্গোপসাগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাগ্য নির্ধারণ করে চলেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতি পুরো বিশ্বের সাথে যুক্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারিত করা সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করা এবং তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একত্রিত করেছে; জনগণের সাথে নিবিড় সম্পর্ক আমাদের আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হবে। একই সাথে, সকল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে ইতিবাচকভাবে কাজ করা হবে। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতি যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি এমন একটি এলাকায় পরিণত হবে যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসাথে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং শুভ দিন কামনা করেন। আল্লাহ হাফেজ।
আরও পড়ুন: বিএসএফ ১৪ ঘণ্টা পর দুই বাংলাদেশি পুলিশ সদস্যকে ফেরত দিল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন