০৯:১৯ পি.এম
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে কর্মকর্তাদের ডিউটি কার্ড পাশের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক ভুয়া টিকিট বা ট্রাভেল পাশ ইস্যুর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চারটি স্টেশনে বুকিং সহকারীরা এই টিকিট কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাকরির সুবাদে রেলওয়ে কর্মকর্তারা ট্রেনে এককভাবে এবং পারিবারিকভাবে ভ্রমণের সুযোগ পান। এ কারণে ভ্রমণের আগে বা ভ্রমণের দিন বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে ডিউটি পাশ ইস্যু করা হয়। এই ডিউটি পাশ দেখিয়ে তারা স্টেশনের টিকিট কাউন্টার থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ট্রেনের টিকিট বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারেন এবং তাতে ট্রেনে ফ্রি ভ্রমণ করতে পারেন। এটাকে বলা হয় কর্মকর্তাদের ডিউটি পাশ বা ট্রাভেল পাশ। ডিউটি পাশধারী কর্মকর্তা কর্তব্যকাজে বছরজুড়ে ফ্রি পাশে রেল ভ্রমণ করতে পারেন। আবার পরিবার নিয়েও ভ্রমণ করতে পারেন, তবে তা অস্বাভাবিক হারে নয়।
এদিকে যারা বিভিন্ন ট্রেনে নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাদেরও বছরের প্রথমে ডিউটি পাশ ইস্যু করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, গত তিন বছরে এই সুবিধার বিপুল অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলে। বড় বড় স্টেশনের বুকিং কাউন্টার থেকে অস্বাভাবিক হারে ডিউটি পাশের বিপরীতে বিনামূল্যে টিকিট বা ট্রাভেল পাশ ইস্যুর অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নবীন বিসিএস কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা করার আহ্বান
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) সম্প্রতি বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান হিসাব কর্মকর্তার দপ্তরকে। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মাত্র চারটি স্টেশনে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়া দুর্নীতির পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯ টাকা। গত তিন বছরে এই দুর্নীতির পরিমাণ ৩ কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হলে পশ্চিম রেলের সদর দপ্তর রাজশাহী ও অধীনস্থ লালমনিরহাট ও পাকশী বিভাগে তোলপাড় চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধান হিসাব কর্মকর্তার দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিউটি বা ট্রাভেল পাশের বিপরীতে টিকিট ইস্যু দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা মূল্যের টিকিটের কালোবাজারি হয়েছে। এমনও হতে পারে সংশ্লিষ্ট ডিউটি পাশধারী কর্মকর্তারা হয়তো বিষয়টি জানেনও না। কিন্তু তাদের পাশের বিপরীতে লাখ লাখ টাকার ফ্রি পাশ বা টিকিট ইস্যু হয়ে তা কালোবাজারে গেছে। বুকিং সহকারীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে হিসাব বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
আরও পড়ুন: এপারে আসতে হলে ফিটফাট হয়ে আসতে হবে: মৎস্য প্রতিমন্ত্রী টুকু
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুক্তিবদ্ধ রেলওয়ের সার্ভার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সহজ-এ সংরক্ষিত ও নিবন্ধিত তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চারটি স্টেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি পাশ বা ডিউটি কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৭১৬ বার ডিউটি ও ভ্রমণ পাশ ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাশের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯ টাকা। এই বিপুলসংখ্যক পাশ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরে তোলপাড় চলছে। কোন কর্মকর্তার ডিউটি পাশের বিপরীতে কতসংখ্যক টিকিট ইস্যু করা হয়েছে, সেসব তথ্যও সংগ্রহ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পশ্চিমের হিসাব ও অর্থবিভাগ এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জানা গেছে, অস্বাভাবিক ডিউটি কার্ড পাশ ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে গত ১৩ জুলাই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (সিসিএম) পক্ষে উপ-প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন পশ্চিমাঞ্চল সদর দপ্তরের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তার কাছে একটি চিঠি দেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবহিত করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, ডিউটি পাশের বিপরীতে এত বিপুলসংখ্যক টিকিট ইস্যু করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। বুকিং সহকারীরা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের টিকিট কালোবাজারি করেছেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পশ্চিমের চার স্টেশনের ডিউটি পাশে কোটি টাকার হিসাব:
আরও পড়ুন: জাবি ছাত্রদলের ১১ নেতাকে শোকজ নোটিশ, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে হবে
জানা গেছে, সহজের সার্ভারের রেজিস্ট্রেশন তথ্যের বরাতে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমের চারটি স্টেশনের তথ্যাবলি পৃথকভাবে পেয়েছে অর্থ ও হিসাব বিভাগ।
দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের টি/আই-এ (ট্রাভেলিং ইন্সপেক্টর-অ্যাকাউন্টস) দিনাজপুরের কার্ড পাশ নম্বর সিপি-০৩৪১৬৭। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই ডিউটি পাশ বা কার্ড ব্যবহার করে ১ হাজার ৯৫০ বার ডিউটি পাশ বা ট্রাভেলস টিকিট ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাশের বিপরীতে নথিভুক্ত ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ টাকা।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ডিউটি পাশ নম্বর সিপি-০৩৪১৬৮। এর বিপরীতে একই সময়ে ১ হাজার ৫০০ বার টিকিট ইস্যু বা ডিউটি পাশ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ৩৫ লাখ ৭ হাজার ৮১৩ টাকা।
ঈশ্বরদীর ডিউটি কার্ড পাশ নম্বর সিপি-০৩৪১৬৯ এর বিপরীতে ৯৬৫ বার ডিউটি পাশ বা ট্রাভেলস টিকিট ইস্যু করা হয়েছে। এর বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৪ টাকা।
আরও পড়ুন: ফেনীতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আট ডাকাত সদস্য গ্রেপ্তার
পার্বতীপুরের ডিউটি কার্ড পাশ নম্বর সিপি ০৩৪১৬১-এর বিপরীতে ৩০১ বার টিকিট ইস্যু বা ট্রাভেলস পাশ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিপরীতে নিরূপিত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪২ টাকা। এই চারটি ডিউটি পাশ পশ্চিম রেলের একজন সাবেক জিএমসহ বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তার নামে ইস্যু করা বলে জানা গেছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যেসব কর্মকর্তার নামে এসব ডিউটি পাশ বা ট্রাভেলস টিকিট ইস্যু করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকৃতই এতসংখ্যকবার ট্রেন ভ্রমণ করেছেন কিনা— সেটার নথি চেক করে দেখা হচ্ছে। চারজন কর্মকর্তার ডিউটি পাশের বিপরীতে রেলওয়ের ১ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯ টাকা মূল্যের টিকিটের সমান ট্রেন ভ্রমণ করেছেন কিনা, তা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এসব কার্ড ব্যবহার করে হাজার হাজার ফ্রি টিকিট ইস্যু হয়ে কালোবাজারে গেছে বলে হিসাব বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে শনাক্ত হয়েছে।
বুকিং সহকারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ:
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, রাজশাহী রেলস্টেশনের দুই বুকিং সহকারী পুরো রেল অঞ্চলজুড়ে টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। একেকটি ডিউটি পাশের বিপরীতে কোনো কোনো দিন শতাধিক ফ্রি টিকিট ইস্যু করা হয়েছে। এসব টিকিট দালালের হাত ঘুরে যাত্রীদের কাছে চলে গেছে।
আরও পড়ুন: পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ, আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একজন কর্মকর্তার স্ত্রী রাজশাহী সদর দপ্তরে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তরে কর্মরত। ওই কর্মকর্তার স্ত্রীও ডিউটি পাশ কেলেঙ্কারি সিন্ডিকেটে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মেদ হোসেন মাসুমের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে পশ্চিম রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) মোহাম্মদ আসহান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনই তিনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। পরে জানাবেন।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে পশ্চিম রেলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব কর্মকর্তা গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেবনাথ জানান, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাওয়ার পর আমরা চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করি। তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে আমরা প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি। তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে। আমরা সেটাও বলেছি; যা করার তারাই করবেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার অফিসার্স সম্মেলন অনুষ্ঠিত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন