০২:৪৪ পি.এম
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির বৃহৎ সংস্থাগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত হয়েছে। গুগল, অ্যামাজন এবং মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানেরা বিশাল আকারের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার তৈরি ও পরিচালনা করছে।
এটি তথাকথিত গবেষণার একটি নতুন দিক, যেখানে বলা হচ্ছে যে, এই ডেটা সেন্টারগুলো শুধু প্রযুক্তির ওপরই নয়, বরং আশপাশের পরিবেশেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে এর ফলে স্থানীয় এলাকার মাটির তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মীরসরাইয়ে নবাগত ইউএনও’র সাথে সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাকিব চৌধুরীর সৌজন্য সাক্ষাৎ
স্থানীয় এলাকাতেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এআই ডেটা সেন্টারের আশপাশের জমির তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু এলাকায় এই বৃদ্ধি ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে দেখা গেছে।
গবেষকরা এই ঘটনা ‘ডেটা হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব নামকরণ করেছেন, যা শহরের ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের অনুরূপ, যেখানে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামের তুলনায় বেশি থাকে।
এআই ডেটা সেন্টারগুলো কী এবং কেন এত বিদ্যুৎ খরচ হয়?
আরও পড়ুন: জামায়াতের উদ্বেগ, সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার লাশ উদ্ধারে শাস্তির দাবি
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো এআই ব্যবহারের সময়, ব্যবহারকারীর অনুরোধগুলো ডেটা সেন্টারে চলে যায়। এই ডেটা সেন্টারগুলো হলো বিশাল আকারের সার্ভারভিত্তিক কম্পিউটারের কেন্দ্র।
এই সার্ভারগুলো ২৪ ঘণ্টা কার্যকর থাকে। এআই মডেল চালাতে শক্তিশালী চিপসগুলো ব্যবহার করা হয়, যা একই সঙ্গে হাজার হাজার হিসাব করতে পারে। ফলে সাধারণ ইন্টারনেট সার্ভারের তুলনায় এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা অনেক বেশি হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১.৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এই ব্যবহারের হার বছরে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে।
হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার, কী?
সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টারগুলোকে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার বলা হয়। এগুলো সাধারণত বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তৈরি করে। একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারে সাধারণত অন্তত পাঁচ হাজার সার্ভার থাকে এবং এটি কমপক্ষে দশ হাজার বর্গফুট জায়গা জুড়ে থাকে। এ ধরনের একটি কেন্দ্র চালাতে ১০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ লাগে। এই ব্যবহৃত বিদ্যুৎ দিয়ে কয়েক লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব।
আরও পড়ুন: পাঞ্জাবে শিখ-হিন্দু-মুসলিমের সহযোগিতায় মসজিদ পুনর্নির্মাণ
তাপ ও পানির ব্যাপক ব্যবহার
এত বেশি বিদ্যুতের ব্যবহার হওয়ায় প্রচুর তাপ তৈরি হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে উন্নত কুলিং বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যেখানে বিপুল পরিমাণ পানি লাগে। যুক্তরাজ্য সরকারের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ২৫০ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করতে পারে। এই পানি দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের এক বছরের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের দ্রুত বৃদ্ধি
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিশ্বে ১১ হাজার ৬০০টির বেশি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ৪ হাজার ৩০০টির বেশি কেন্দ্র আছে। ইউরোপে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এশিয়ায় চীন ও ভারত দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড পরিষেবার ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২১ সালের পর থেকে বিশ্বে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭০০ থেকে বেড়ে প্রায় ১,৩০০-এর বেশি হয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
ডেটা সেন্টারের ফলে স্থানীয় উষ্ণতা
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণার সিদ্ধান্তে দেখা গেছে যে, একটি এআই ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার পর আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই প্রভাব প্রায় দশ কিলোমিটার পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে। গবেষকরা নাসার স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে ২০০৪ থেকে ২০২৪ বছরের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার বিশ্লেষণ করেছেন। তারা ১১ হাজারেরও বেশি এআই ডেটা সেন্টারের অবস্থান মিলিয়ে দেখেছেন এবং ছয় হাজারের বেশি কেন্দ্রের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। ফলস্বরূপ দেখা গেছে, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ০.৩ ডিগ্রি থেকে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দশ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৩৪ কোটি মানুষ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে ভুগতে পারেন।
পরিবেশ ও জীবনে সম্ভাব্য প্রভাব
গবেষকদের মতে, এই 'ডেটা হিট আইল্যান্ড' প্রভাব স্থানীয় পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে, পানির সংকটের ফলে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: লিবিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হলো আরও ১৭২ বাংলাদেশি
বিশ্বজুড়ে বিশাল বিনিয়োগ
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চারটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি- মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট এবং মেটা মিলিয়ে ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোতে প্রায় ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-মেটার ২৭ বিলিয়ন ডলারের হাইপেরিয়ন ক্যাম্পাস, মাইক্রোসফটের ২০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ, অ্যামাজনের ২৫ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্প। এছাড়াও রয়েছে ওরাকল এবং ওপেনএআইয়ের বৃহৎ এআই সুপারক্লাস্টার প্রকল্প।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন