০৯:১১ এম
গিটারের তারে যখন আঙুল চলে, তখন চারপাশে যেন অন্য এক আবহ তৈরি হয়। মঞ্চের সামনে উপস্থিত হাজারো মানুষ তখন একসঙ্গে গলা মেলায়। কখনো প্রেমের গান, কখনো বিরহের সুর, কখনো জীবনের গল্প- তাঁর গানে শ্রোতারা নিজেদের কথা খুঁজে পান। আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই চেনা হাসি, সেই চেনা ভঙ্গিতে তিনি বলে ওঠেন, ‘তোমরাই আমার জান, তোমরাই আমার প্রাণ।’
কারও কাছে তিনি ‘গুরু’, কারও কাছে ‘নগর বাউল’। তাঁর ভক্তদের দেওয়া এসব নাম নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবেন না। বরং নিজের স্বভাবসুলভ ঢঙে বলেন, ‘থুরাই কেয়ার’।
এই মানুষটিই ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। বাংলাদেশের রকসংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখ। গিটার, কণ্ঠ এবং নিজস্ব জীবনবোধ দিয়ে যিনি কয়েক দশক ধরে তৈরি করেছেন নিজের আলাদা একটি জগৎ। আজ ২ অক্টোবর তাঁর ৬২তম জন্মদিন।
আরও পড়ুন: অস্কারে বাংলাদেশের সিনেমা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা
ঘর ছাড়ার সেই দিনগুলো
১৯৬৪ সালে নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন জেমস। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। সেখানেই কৈশোরে সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর। সংগীতচর্চার সিদ্ধান্তে পরিবারের পুরো সমর্থন শুরুতে পাননি জেমস। কিন্তু তিনি নিজের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি। একসময় গানকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিয়ে ঘর ছাড়েন। আশ্রয় নেন চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে। আজিজ বোর্ডিংয়ের সেই দিনগুলোই পরে তাঁর সংগীতজীবনের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। সেখানে থেকেই গড়ে ওঠে সংগীতের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই তরুণ একদিন বাংলাদেশের রকসংগীতের অন্যতম পরিচিত নাম হয়ে উঠবেন।
‘ফিলিংস’ থেকে ‘নগর বাউল’
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। এরপর ১৯৮৮ সালে আসে জেমসের একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’। এই অ্যালবাম দিয়েই তিনি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর তাঁর ক্যারিয়ারে আসে একের পর এক উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম-‘জেল থেকে বলছি’, ‘নগর বাউল’, ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘কালেকশন অব ফিলিংস’।
আরও পড়ুন: পরীমণির জন্মদিন উদ্যাপন পারিবারিক আবহে, সন্তানদের সঙ্গে কেক কাটলেন
নব্বইয়ের দশকে জেমসের কণ্ঠ ও গায়কির নিজস্ব ধরন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচলিত ধারার বাইরে তাঁর গায়কির ভঙ্গি, পোশাক, মঞ্চে উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় আলাদা এক পরিচয়। ‘ফিলিংস’ পর্বের পর নতুন লাইনআপে গড়ে ওঠে ‘নগর বাউল’। আর ধীরে ধীরে ব্যান্ডের নামটিই যেন মিশে যায় শিল্পীর পরিচয়ের সঙ্গে। জেমস হয়ে ওঠেন ‘নগর বাউল জেমস’।
গান যখন নিজের গল্প বলে
জেমসের গান শুধু রকসংগীতের শ্রোতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর গানের বিষয়বৈচিত্র্যও তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে নানা বয়সের মানুষের কাছে। ‘মা’, ‘বাবা কত দিন’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘মিরাবাঈ’, ‘পাগলা হাওয়া’ কিংবা ‘জেল থেকে আমি বলছি’—প্রতিটি গানের সঙ্গে তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা শ্রোতাস্মৃতি। একইভাবে ‘বাংলাদেশ’, ‘বিজলী’ কিংবা ‘দুষ্টু ছেলের দল’-এর মতো গান তাঁকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচিতি। অ্যালবামের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। ‘পালাবি কোথায়’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তুফান’ ও ‘কাল যমুনা’-সময়ের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে এসব একক অ্যালবাম।
অতঃপর বলিউডে
আরও পড়ুন: আবারও বড়পর্দায় ফিরছেন এশা দেওল, মুক্তি ২০ নভেম্বর
দেশের গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেননি জেমস। ২০০৪ সালে কলকাতার সংগীত পরিচালক প্রিতমের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। পরের বছর বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় প্লেব্যাক করে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যান। ‘ভিগি ভিগি’ গানটি প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০০৬ সালেও বলিউডের একটি সিনেমায় কণ্ঠ দেন তিনি।
২০০৭ সালে অনুরাগ বসুর ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ সিনেমায় জেমসের কণ্ঠে শোনা যায় ‘রিশতে’ ও ‘আলবিদা’। হিন্দি ভাষার গান হলেও তাঁর কণ্ঠের নিজস্বতা সেখানে অটুট ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৭ সালে ‘সত্ত্বা’ সিনেমায় আবার প্লেব্যাক করেন জেমস। ছবির ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ আমি’ গানটি জনপ্রিয় হয়। এই গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি।
বয়স বাড়ে, মঞ্চের জেমস বদলায় না
সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলেছে। বদলেছে গান প্রকাশের মাধ্যমও। ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-শ্রোতার গান শোনার অভ্যাসে এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু জেমসের মঞ্চে সেই পরিবর্তনের খুব একটা ছাপ নেই। গিটার হাতে তিনি এখনো মঞ্চে উঠলে সামনে তৈরি হয় উচ্ছ্বসিত জনসমুদ্র। দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও নিয়মিত কনসার্ট করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াতেও গান করেছেন তিনি। এত বছর পরও তাঁর কণ্ঠ শুনে অনেকের মনে ফিরে আসে পুরোনো কোনো বিকেল, কোনো প্রেম, বন্ধুত্ব কিংবা জীবনের কোনো কঠিন সময়ের স্মৃতি।
আরও পড়ুন: বলিউডে প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন হয় না: মনোজ বাজপেয়ী
তিনি শুধু একজন গায়ক নন
জেমসের সংগীতজীবনকে শুধু অ্যালবাম, গান কিংবা পুরস্কারের হিসাব দিয়ে মাপা কঠিন। কারণ তাঁর গান বাংলাদেশের কয়েকটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গে মিশে আছে। যে তরুণ একদিন সংগীতের টানে ঘর ছেড়ে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে উঠেছিলেন, তিনিই পরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রকস্টারে পরিণত হয়েছেন। তাঁর কণ্ঠ পৌঁছেছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বলিউডে। আবার শেষ পর্যন্ত তাঁকে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নিজের পরিচিত জায়গায়-মঞ্চে, হাতে গিটার নিয়ে।
আজ তাঁর ৬২তম জন্মদিন। বয়সের সংখ্যাটা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু মঞ্চে দাঁড়ানো জেমসের সামনে এখনো যখন হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে, তখন বোঝা যায়-কিছু শিল্পীর সঙ্গে শ্রোতার সম্পর্ক কেবল সময়ের হিসাব মেনে চলে না।
তাঁর ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কের নামই হয়তো-‘গুরু’, ‘নগর বাউল’, কিংবা শুধু ‘জেমস’।
আরও পড়ুন: মাহিরা খান-ওয়াহাজ আলীর নতুন নাটকে দর্শক মজেছেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন