০২:০৮ পি.এম
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ‘বীরাঙ্গনা’ রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বার্ধক্য এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স ছিল ৮৪ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ শুক্রবার বিকেলে প্রশাসনের তরফ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।
ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার বলেন, তার মা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি ব্রেইন স্ট্রোক করেন, যার ফলে তার ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি নিজ ঘরেই মারা যান।
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে মাদক সেবনের দায়ে দুজনের কারাদণ্ড
লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ ফুলমতির জীবনের কিছু তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাকে ‘ফুলমতি রানী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতির পিতার নাম অর্জুন রবিদাস এবং মাতার নাম ফু রানী রবিদাস। তিনি সাদুল্লাপুর থানার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার সংসারে এক মেয়ে সপ্তমী এবং চার ছেলে রয়েছে।
ফুলমতির বাড়ি ছিল সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায়। তার স্বামী প্রয়াত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার। স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৮৮ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে তাকে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে এসে তাকে ঘর থেকে বের করে নির্মম নির্যাতন করে।
আরও পড়ুন: বরিশাল সদরে ৯৫ গ্রাম পুলিশের হাতে বাইসাইকেল-ইউনিফর্ম তুলে দিলেন এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ফুলমতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পরে ২০১৬ সালের মার্চে তিনি বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে এর জন্য তাকে সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে। তাকে ৪৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
২০১০ সালে ঢাকার স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য জেনেসিস ও উপজেলা সামাজিক উদ্যোক্তা দল তাকে সম্মাননা প্রদান করে এবং কিছু উপহার দেয়।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তা মেলে।
আজমী আরও বলেন, শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলমতির চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।
আরও পড়ুন: সিম খেতে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ গেল কিশোর দিনমজুরের
তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অসম সাহসী নারীকে হারালাম।
স্থানীয়রা বলছেন, ফুলমতি শুধু একজন নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন