০২:০৯ পি.এম
ক্রিকেট বিশ্বকাপ এখন বড় দলের জন্য নিশ্চিত কিছু ম্যাচের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে ভারত এবং পাকিস্তান, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল একই গ্রুপে থাকাটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু দুই দশক আগে বিশ্বকাপের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। গ্রুপ পর্বে অঘটনের সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি, সহযোগী দেশগুলোর জন্যও ছিল বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ।
বিশ্বকাপের চেহারা পরিবর্তনে ২০০৭ সালের দুটি ম্যাচের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ধাক্কাটি দিয়েছিল বাংলাদেশ। হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন দলটি ভারতকে হারিয়ে দিয়েছিল। এরপর পাকিস্তান প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছিল আয়ারল্যান্ডের কাছে। দুই এশীয় পরাশক্তির এমন আগেভাগে বিদায় বিশ্বকাপের মাঠের ফলের পাশাপাশি ক্রিকেট বাণিজ্যকেও প্রভাবিত করেছিল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ হকি দলের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি মিশন শুরু
পাকিস্তানের সেই হারের পরদিন আসে আরো বড় দুঃসংবাদ। পাকিস্তান দলের কোচ বব উলমারকে হোটেলকক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যু নিয়ে শুরুতে নানা জল্পনা তৈরি হলেও পরে পুলিশ জানায়, সেটি ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু।
যেভাবে শুরু হয়েছিল
২০০৭ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে ভারত ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে একই গ্রুপে। ১৭ মার্চ ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেনে বাংলাদেশ ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে দেয়। মাশরাফি, রফিক ও রাজ্জাকের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে। বড় দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অঘটন সৃষ্টি করে।
সেদিনই জ্যামাইকার কিংস্টনে আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তান হেরে যায়। দুই ম্যাচের দুটিতেই হেরে পাকিস্তানের সুপার এইটে ওঠার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপে খেলতে আজারবাইজানে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দল
আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের পরদিন পাকিস্তানের কোচ বব উলমারের মৃতদেহ তার কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
পরদিন ১৮ মার্চ কিংস্টনের হোটেল কক্ষে অচেতন অবস্থায় ৫৮ বছর বয়সী উলমারকে পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অঘটনের ধাক্কা মাঠের বাইরেও
ভারত ও পাকিস্তানের বিদায় শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক দিকেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ভারতীয় দর্শকদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোর টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
আরও পড়ুন: হ্যারির অনন্য রেকর্ড, ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি
সমসাময়িক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুপার এইট পর্বে ম্যাচগুলোর গড় টেলিভিশন রেটিং ভারতের প্রথম পর্বের ম্যাচগুলোর তুলনায় অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল।
পৃষ্ঠপোষক ও বিজ্ঞাপনদাতারাও সমস্যায় পড়ে। ভারত ও পাকিস্তান দ্রুত বিদায় নেওয়ার পর কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। এমনকি আইসিসির অন্যতম বড় অংশীদার এলজি বিশ্বকাপে আর স্পন্সরশিপ রাখবে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করেছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ দুটি অঘটনের ফল মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বকাপের দর্শক, সম্প্রচার, পর্যটন ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়েছিল আইসিসিকে।
এর পরই বদলাতে থাকে বিশ্বকাপের কাঠামো
আরও পড়ুন: স্যাম কারানের বাজে রেকর্ডে পাকিস্তানে ত্রিদেশীয় সিরিজে হারল ইংল্যান্ড
আগে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বড় দলের বিদায়ের ঝুঁকি ছিল। ২০০৭ সালে সেটিই বাস্তবে পরিণত হয়। ভারত ও পাকিস্তান—দুই জনপ্রিয় দলের বিদায়ে টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক আকর্ষণেও ধাক্কা লাগে।
২০১১ সালে পরবর্তী বিশ্বকাপ ১৪ দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করে আয়োজন করা হয়। প্রতিটি গ্রুপে সাতটি করে দল ছিল এবং সবাই নিজেদের গ্রুপের অন্য ছয় দলের বিপক্ষে খেলেছে। এরপর প্রতি গ্রুপের শীর্ষ চার দল কোয়ার্টার ফাইনালে যায়। অর্থাৎ বড় দলগুলোকে গ্রুপ পর্বে আগের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। ওই আসরে ভারত-পাকিস্তান সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল।
২০১৫ বিশ্বকাপেও ১৪ দল ছিল। দুটি গ্রুপে সাতটি করে দল ভাগ করা হয়েছিল। এবার ভারত ও পাকিস্তান একই গ্রুপে ছিল এবং টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই মহারণ।
সহযোগী দেশগুলো ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে
আরও পড়ুন: প্রথমবারের মতো শুরু হচ্ছে এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপ
২০১৯ বিশ্বকাপ থেকে কাঠামো আরো বদলে যায়। মাত্র ১০ দল নিয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ। প্রতিটি দল অন্য ৯টি দলের বিপক্ষে খেলে—অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্টই চলে পূর্ণ রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে।
এর ফলে বিশ্বকাপের মূল পর্বে সহযোগী দেশগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ আগের তুলনায় আরো সীমিত হয়ে যায়। যোগ্যতা অর্জনের পথ অবশ্য খোলা ছিল; ২০১৯ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে বিশ্বের বিভিন্ন সহযোগী সদস্য দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। কিন্তু সহযোগী কোনো সদস্য মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। বরং আইসিসির দুই পূর্ণ সদস্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানকেই বাছাই পেরিয়ে মূল পর্বের টিকিট পেতে হয়েছিল।
সর্বশেষ বিশ্বকাপে সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে শুধু নেদারল্যান্ডস খেলার সুযোগ পায়। ছবি: আইসিসি
২০২৩ বিশ্বকাপে তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাছাইয়ের গণ্ডিই টপকাতে পারেনি। এমনকি শ্রীলঙ্কাকেও বাছাইয়ে বাধা টপকে আসতে হয়েছিল। সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে শুধু নেদারল্যান্ডস মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশকে হারিয়ে আইএইচএফ নেশন্স ট্রফির চ্যাম্পিয়ন ভারত
২০২৭-এ আবার নতুন কাঠামো
২০২৭ বিশ্বকাপে আবার নতুন ধরনের কাঠামো। ১৪ দলের টুর্নামেন্টে বাছাই পেরোনো তিন দলের সুপার সিরিজ, ১২ দল নিয়ে গ্রুপ পর্বের পর সাত দল নিয়ে হবে সুপার সেভেন পর্ব।
ফলে বড় দলগুলোর মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হওয়ার সুযোগ থাকছে, আবার ছোট দলগুলোর জন্য মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ার পথও কঠিন হচ্ছে।
টুর্নামেন্টে ভারত, পাকিস্তান ও বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে একই গ্রুপে রাখা হয়েছে। এতে দর্শক ও সম্প্রচারমূল্যের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
একসময় বিশ্বকাপের সৌন্দর্য ছিল—একটি ম্যাচই বদলে দিতে পারে পুরো হিসাব। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ যেমন ভারতকে হারিয়েছিল, তেমনি আয়ারল্যান্ড হারিয়েছিল পাকিস্তানকে। দুটি অঘটন শুধু দুই পরাশক্তিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করেনি, টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক বাস্তবতারও কঠিন পরীক্ষা নিয়েছিল।
এর পর থেকে বিশ্বকাপের কাঠামো বারবার বদলেছে। বড় দলগুলোর বেশি ম্যাচ, বড় ম্যাচের নিশ্চয়তা এবং সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক আকর্ষণ—সব কিছুর ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—বিশ্বকাপ কি শুধু সবচেয়ে বেশি দর্শক টানা দলগুলোর মঞ্চ নাকি ছোট দলগুলোর অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন