০৪:১৩ পি.এম
আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতে তার চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিক্যাল টিমের অভিযুক্ত সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ডের দাবি তুলেছে। বুয়েনস এইরেসের আদালতে মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এই শাস্তির দাবির পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে মারা যান ১৯৮৬ বিশ্বকাপের এই মহানায়ক।
বুয়েনস এইরেসের শহরতলি তিগ্রেতে একটি ভাড়া বাসায় হৃদ্রোগ এবং অ্যাকিউট পালমোনারি এডেমাতে (ফুসফুসে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া) আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসায় চরম গাফিলতির অভিযোগে গত এপ্রিল থেকে তৎকালীন সাতজন চিকিৎসাকর্মীর বিরুদ্ধে বিচারকার্য চলছে।
আরও পড়ুন: নুডুলস খেয়ে একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনস্তত্ত্ববিদ ও নার্সদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল টিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে কিংবদন্তির শেষ দিনগুলোয় তারা চরম অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। অভিযুক্তরা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী প্যাট্রিসিও ফেরাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আসামিদের চরম বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সম্পূর্ণ সহায়হীন অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল এবং কার্যত তাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে চিকিৎসকেরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম মেনে চলেননি এবং যেসব জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ নেওয়া আইনি ও নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক ছিল, তা থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থেকেছেন।
আইনি পরিভাষায় আসামিদের বিরুদ্ধে ‘ডোলো ইভেঞ্চুয়াল’ অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, যার অর্থ হলো—নিজের কোনো অবহেলা বা কাজের পরিণতি মৃত্যু ডেকে আনতে পারে জেনেও তা জেনে-বুঝে চালিয়ে যাওয়া।
আরও পড়ুন: গুয়াতেমালায় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে দুর্নীতিবিরোধী সাবেক কৌঁসুলিকে হত্যা
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত প্রধান চিকিৎসক লিওপোল্ড লুকের জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ডের দাবি জানান। এছাড়া টিমে থাকা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, নার্স, মনস্তত্ত্ববিদ ও সমন্বয়কদের জন্য অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৪ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা দাবি করেছেন যে ম্যারাডোনার এই মৃত্যু ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং তারা নিজেদের সাধ্যমতো দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিটি আসামি একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে ব্যক্তিগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
মৃত্যুর আগে চিকিৎসকেরা অবহেলা ও অনিয়ম ঢাকতেই ম্যারাডোনাকে কোনো হাসপাতালে না রেখে বাসায় চিকিৎসা দেওয়ার বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে সেই ভাড়া বাসায় হাসপাতালের প্রয়োজনীয় বিছানা, ডিফিব্রিলেটর (হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক করার জরুরি বৈদ্যুতিক যন্ত্র), ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স বা ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
বেশ কয়েকজন নিরপেক্ষ চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই ম্যারাডোনার শরীরে এডেমা (অঙ্গ ফুলে যাওয়া), ট্যাকিকার্ডিয়া (অস্বাভাবিক দ্রুত হৃৎস্পন্দন) ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো অতি বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলেও নিয়োজিত চিকিৎসকেরা সময়মতো কোনো পদক্ষেপ নেননি। রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী আইনজীবী কোসমে ইরিবারেন বলেন, ‘ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার মৃত্যু কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এই মর্মান্তিক পরিণতির আলামত অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।’
আরও পড়ুন: রাশিয়ার দাবি: সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে ইউক্রেনের ১২৬টি ড্রোন ভূপাতিত
বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্কের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাবেক এই ফুটবল রাজপুত্রের মৃত্যুর আগের কিছু শিউরে ওঠার মতো ছবি আদালতে প্রদর্শন করেন। ছবিতে ফুটবলের এই বরপুত্রকে পেটে অস্বাভাবিক ফোলাভাব নিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেই করুণ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে আদালতে উপস্থিত ম্যারাডোনার দুই মেয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক পর্বটি শেষ হতে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগবে এবং এরপরই বহুল প্রতীক্ষিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। উল্লেখ্য, এর আগে আড়াই মাস বিচারকাজের পর গত বছর মামলাটি বাতিল করা হয়েছিল, কারণ ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারক মামলাটি নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে অংশ নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন