ঢাকা সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

দিল্লির বায়ুদূষণ মোকাবেলায় নতুন কড়াকড়ি কার্যকর


দিল্লির বায়ুদূষণ মোকাবেলায় নতুন কড়াকড়ি কার্যকর

ভারতের রাজধানী দিল্লির বাতাসের গুণগত মান বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক পরিচিতি লাভ করেছে। বায়ুমান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দিল্লির নাম প্রায়শই নেতিবাচক তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। আজ, ১ নভেম্বর, দিল্লির বায়ুদূষণ পরিস্থিতি ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্তরে পৌঁছেছে।

আজ সকালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির সামগ্রিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বিভিন্ন স্থানে ২৪৮ থেকে ৩৮১-এর মধ্যে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাতাসে অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।

শীতকালে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শীতকালীন বায়ুদূষণ মোকাবেলায় দিল্লি-এনসিআর এলাকায় কঠোর নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। আজ ১ নভেম্বর থেকে শুরু করে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর থাকবে। কর্তৃপক্ষ আগামী মাসগুলোতে ধোঁয়াশা কমাতে এবং বাতাসের গুণগত মান উন্নত করতে এই কঠোর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে।

আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম, ইরান-কাতারের আলোচনার প্রভাব

বর্তমান আবহাওয়া দিল্লিতে অত্যন্ত শুষ্ক এবং শান্ত। শীতের শুরুতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে তাপমাত্রার বিপরীতমুখী অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ধোঁয়া, ধূলিকণা এবং গাড়ির ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসের ওপরের স্তরে মিশে যেতে না পেরে দিল্লির আকাশকে ঢেকে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লির এই তীব্র দূষণের প্রায় ৪১ শতাংশ অতিরিক্ত যানবাহন নির্গমন থেকে আসে। এছাড়া, ধুলোবালি (২১.৫ শতাংশ), শিল্প-কারখানার ধোঁয়া (১৮.৬ শতাংশ) এবং আশেপাশের রাজ্যগুলোতে ফসলের অবশিষ্টাংশ বা খড় পোড়ানো পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দূষিত বাতাসের কারণে বাসিন্দাদের চোখ, বুক এবং গলায় জ্বালাপোড়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অ্যাজমা রোগীদের জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, বায়ুমান রক্ষায় দিল্লির মুখমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরনো গাড়ির চলাচল নিষিদ্ধ করা, বাসা থেকে কাজ করা, নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত যেসব যানবাহন ভারত স্টেজ-৬ (বিএস-৬) নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলোর জাতীয় রাজধানীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে নয়ডা, গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ এবং গাজিয়াবাদ থেকে আসা আনুমানিক ১০ লাখ পুরোনো পেট্রোল ও ডিজেল চালিত যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সিএনজিচালিত যানবাহন এবং জরুরি পরিবহন যেমন অ্যাম্বুলেন্স ও দমকলের জন্য এই নিয়মের আওতামুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন: তুরস্কের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে দক্ষিণ কোরিয়াকে অংশীদার করার ইঙ্গিত এরদোয়ানের

মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ধূলিকণা তৈরি করে এমন সব ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ এবং ঘরের বাইরের নির্মাণ কার্যক্রম ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকবে। তবে নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে কিছু নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় জনমুখী অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ব্যতিক্রম থাকবে। ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণ মানদণ্ড মেনে ঘরের ভেতরের ফিনিশিং, প্লাম্বিং এবং ইলেকট্রনিক্সের কাজ এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বাধাগ্রস্ত হবে না।

সরকারি আদেশ অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোকে তাদের অর্ধেক কর্মী সশরীরে অফিসে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বাকি কর্মচারীদের বাড়ি থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জরুরি পরিষেবাগুলোকে এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।

যানজটের চাপ কমাতে বিভিন্ন নাগরিক সংস্থার অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অফিসগুলো সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে।

অন্যদিকে, দিল্লি সরকারের অফিসগুলো সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এছাড়া, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে অনেক পাবলিক লটে পার্কিং ফি দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনের মালিকানাধীন ও পরিচালিত পার্কিং সুবিধাগুলো এই ফি বৃদ্ধির আওতামুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন: সৌদি উপকূলে তেলবাহী জাহাজে দুই দফা হামলা, নাবিকরা নিরাপদ

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির পেট্রল পাম্পগুলোতে ‘নো পিইউসি (পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট), নো ফুয়েল’ নীতি কার্যকর হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য দিল্লির ৫০০টি পেট্রল পাম্পে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যা গাড়ির নম্বর প্লেট ও তথ্য স্ক্যান করবে। যদি কোনো যানবাহনের পিইউসি সার্টিফিকেট বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ সনদ অবৈধ পাওয়া যায়; তবে পাম্প অপারেটর পেট্রল, ডিজেল বা সিএনজি দিতে অস্বীকৃতি জানাবে।

মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ এনফোর্সমেন্ট টিম, অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন ক্যামেরা এবং একটি এআই-চালিত ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার নিয়োজিত থাকবে। নিয়ম অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ই-চালান ইস্যু করা হবে।

প্রতিবেশী শহর এবং দিল্লির মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের তাদের যানবাহনের নির্গমন মানদণ্ড পরীক্ষা করার এবং ভারী জরিমানা বা সীমান্ত চেকপয়েন্ট থেকে ফেরত পাঠানো এড়াতে আগে থেকেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও বাসিন্দাদের এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। নিয়মিত আপডেটের জন্য যাত্রীদের দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের অফিশিয়াল হ্যান্ডেলগুলো চেক করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ইরানকে ‘কঠোর আঘাত’ করতে হবে

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

শ্রীলঙ্কার যুদ্ধবিধবা ও নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০১:৪০ পি.এম


শ্রীলঙ্কার যুদ্ধবিধবা ও নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : গির্জার বাইরের একটি স্থানে বসে সারধাদেবী থাদচানামূর্তি হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার তালিকা থেকে একে একে নামগুলো উচ্চারণ করেন। তালিকায় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ১২৪ জন স্বামী, বাবা ও ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার বাট্টিকালোয়া থেকে এএফপি জানায়, ষাটের কোঠায় থাকা এই তামিল নারী এরপর একটি প্ল্যাকার্ড হাতে তুলে নেন। তিনি আরও তিনজনের সঙ্গে যোগ দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় ব্যস্ত শহর বাট্টিকালোয়ার সড়কে ‘ন্যায়বিচারের দাবিতে পদযাত্রা’ শুরু করেন। নিখোঁজ স্বজনদের পরিণতি জানার জন্য তাদের এই ধারাবাহিক প্রতিবাদ রবিবার ছিল টানা ১ হাজার ৬০৪তম দিন।

১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের যুদ্ধ চলে। তামিলরা দেশটির প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।

এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) হাতে কয়েক দশ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, অপহৃত হন, নির্যাতনের শিকার হন অথবা নিহত হন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৫ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও নিখোঁজদের অধিকাংশের পরিণতি এখনো অজানা।

অভিযোগ, আদালতে আবেদন, প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সরকারের বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি, কোনোটিই এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেনি।

‘তাকে আর কখনো দেখিনি’

থাদচানামূর্তির জীবনের ঘটনা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে উত্তর খুঁজতে পরিবারগুলোর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তার ৩৪ বছর বয়সী স্বামী নাল্লাথাম্বির গুলিবিদ্ধ মরদেহ তাদের কৃষিজমিতে পাওয়া যায়। তার মাথায় গুলি করা হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, একজন সেনাসদস্য তাকে হত্যা করেছেন। স্বামীকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের কাছে যান। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল, “আপনি যদি বলেন আপনার স্বামীকে একজন সেনাসদস্য হত্যা করেছে, তাহলে তারা আর কখনো তাঁকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেবে না।”'

তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করি। স্বামীর মরদেহ উদ্ধার করি এবং ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ পাই, যা বর্তমান বিনিময় হারে ১৫১ ডলার। এরপর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।’

২০০০ সালের জানুয়ারিতে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে নাভানীথান নিখোঁজ হন। থাদচানামূর্তির বিশ্বাস, তামিল বিদ্রোহীরা নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তাঁকে অপহরণ করেছিল। তিনি বলেন, ‘তাঁকে আমি আর কখনো দেখিনি। ২০১৬ সালে আমি কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। জবাবে তারা জানায়, তার পরিণতি অজানা। আমাকে শুধু নিখোঁজ হওয়ার একটি সনদ দেওয়া হয়েছিল, সত্যটা নয়।’

লক্ষ্মী সিলভার অভিজ্ঞতাও খুব বেশি ভিন্ন নয়। ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে কলম্বো যাওয়ার পথে বাসে থাকা অবস্থায় তার স্বামী নিখোঁজ হন। একটি চেকপোস্টে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। লক্ষ্মী বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে বলেছিলেন, তারা “টাইগার” ছিল।’ তিনি তামিল বিদ্রোহীদের বোঝাতে এ শব্দ ব্যবহার করেন।

পুলিশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে তাঁর করা আবেদনগুলোর কোনো জবাব মেলেনি। যাঁদের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে ঝামেলা না বাড়ানোর পরামর্শ দেন। ১৯৯৪ সালে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তার স্বামীর মৃত্যু সনদ দেন। সেখানে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল ‘অজ্ঞাত’। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ষাটের কোঠায় থাকা লক্ষ্মী সিলভা স্বীকার করেন, ‘আমি এখন আর মনে করি না যে তিনি ফিরে আসবেন।’ তিনি বলেন, ‘এখন আমি শুধু সন্তানদের জন্য বেঁচে আছি।’ তবে অন্যরা এখনো নীরবতা মেনে নিতে রাজি নন।

৬১ বছর বয়সী রাজেশ্বরী চিত্রাভাদিভেল বলেন, ‘আমি সব সময় আশা ধরে রেখেছি।’ তার দেয়ালে কয়লা দিয়ে আঁকা গোঁফওয়ালা এক হাস্যোজ্জ্বল পুরুষের প্রতিকৃতি ঝুলছে। ছবিতে স্ত্রী ও মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেনাকাটা করতে গিয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর থেকে রাজেশ্বরীর স্বামী নিখোঁজ।

১৯৯৮ সালে কর্তৃপক্ষ তাকে একটি মৃত্যু সনদ দেয়। এর দুই বছর পর রেড ক্রস তাকে শনাক্ত করার জন্য এক ব্যক্তির মরদেহ দেয়। সংস্থাটি জানায়, সেটি তার স্বামীর মরদেহ হতে পারে। রাজেশ্বরী বলেন, ‘মরদেহটি চেনার উপায় ছিল না। তাই আমি এখনো বিশ্বাস করি।’

এ ধরনের ঘটনার বিচার ও সত্য উদ্ঘাটনের দাবিতেই নারীরা প্রতিদিন প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এ আন্দোলনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ‘মাদার্স অব দ্য প্লাজা দে মায়ো’ আন্দোলনের মিল রয়েছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দেশটির সামরিক স্বৈরশাসনের সময় নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের পরিণতি জানতে ওই নারীরাও বছরের পর বছর বিক্ষোভ করেছিলেন।

‘এক গভীর নীরবতা’

নিয়মিত পদযাত্রায় অংশ নেওয়া আন্দোলনকর্মী সারালা ইমানুয়েল বলেন, ‘আমরা গোপনে আশা করেছিলাম, হাজার হাজার মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু কিছুই বদলায়নি, এখনো এক গভীর নীরবতা বিরাজ করছে।’

২০০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কার নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধকালীন অপরাধ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ২০২৪ সালে অনুরা কুমারা দিসানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে আশার সঞ্চার হয়।

দেশটির প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ হওয়া এবং হামলার’ তদন্ত এবং একটি স্বাধীন জাতীয় কৌঁসুলি দপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুই বছর পর গত সেপ্টেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে সরকার ‘দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর জরুরি প্রয়োজন’ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।

প্রস্তাবিত স্বাধীন কৌঁসুলি দপ্তর সম্পর্কে এএফপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি শ্রীলঙ্কার আইন মন্ত্রণালয়। তামিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাসামানিক্কাম আর. শানাকিয়ান বলেন, ‘দুয়েকটি আলোচিত মামলায় কিছু তদন্ত হচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই নেই।’

তিনি বলেন, ‘পরপর আসা সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পায়।’ তিনি উল্লেখ করেন, দেশটির অধিকাংশ মানুষ সিংহলি বৌদ্ধ এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক। তিনি বলেন, ‘তারা জানে, এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই ফিরে আসবে।’

‘জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন’

২০১৮ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিণতি নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়ে সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিবিষয়ক দপ্তর (ওএমপি) প্রতিষ্ঠা করে। দপ্তরটির হিসাবে, তাদের কাছে বর্তমানে ২২ হাজার নিখোঁজের মামলা নথিভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। গত তিন বছরে দপ্তরটি মাত্র ২৪ জনের সন্ধান পেয়েছে।

দপ্তরটির সদস্য মিরাক রহিম স্বীকার করেন, ‘যেসব পরিবার দুই, কখনো কখনো তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য এটা স্পষ্ট যে কাজ যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক নথি হারিয়ে গেছে এবং মানুষ নিজেদের স্মৃতি থেকে ঘটনাগুলো পুনর্গঠন করেছে।’

ক্লান্ত হলেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাদচানামূর্তি পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা চাই না, শুধু সত্য ও ন্যায়বিচার চাই। আমাদের দুর্ভোগের ভার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দিতে আমি রাজি নই।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

শিবচরে জামায়াত নেতার বসতঘর ভাঙচুর, ক্ষুব্ধ কয়েকশ নারী-পুরুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মাদারীপুর প্রতিনিধি

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০১:৫৭ পি.এম


শিবচরে জামায়াত নেতার বসতঘর ভাঙচুর, ক্ষুব্ধ কয়েকশ নারী-পুরুষ

 

মাদারীপুরের শিবচরে তাইজুল ইসলাম নামে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার বসতঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন। রবিবার (১ নভেম্বর) সকালে উপজেলার নিলখী ইউনিয়নের পশ্চিম চরকামারকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকশ নারী-পুরুষ একত্র হয়ে তার বসতঘরটি ভাঙচুর করেন।

তাইজুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা। সম্প্রতি তাকে ঘিরে একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার এমন কর্মকাণ্ডে গ্রামের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার সকালে কয়েকশ নারী-পুরুষ একত্র হয়ে তাইজুল ইসলামের বসতঘরটি ভেঙে ফেলেন। তবে এ ঘটনায় বাড়িটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এর আগে গত ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শিবচর উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তাইজুল ইসলামকে নিলখী ইউনিয়ন শাখার সব ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে তার বিরুদ্ধে নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে থাকা নারী তার স্ত্রী বলে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন তাইজুল ইসলাম।

এ বিষয়ে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বসতঘর ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি এখনো অবগত নন। বিষয়টি জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

মধুপুরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক ও সনদপত্র বিতরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আঃ হামিদ, মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০১:৫৯ পি.এম


মধুপুরে জাতীয় যুব দিবস পালিত, যুব ঋণের চেক ও সনদপত্র বিতরণ

দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের মধুপুরে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, আলোচনা সভা, যুব ঋণের চেক ও প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস পালিত হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে মধুপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বর্ণাঢ্য র‍্যালির মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। পরে উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতিয়ার রহমান, বিআরডিবি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, মধুপুর প্রেসক্লাবের সহসভাপতি আব্দুল হামিদ, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা সুমি এবং সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুবকদের দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও ঋণ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানে যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করতে যুব ঋণের চেক বিতরণ, প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের মধ্যে সনদপত্র প্রদান এবং নতুন প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন করা হয়।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা কাজে লাগিয়ে তরুণ-যুবকরা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বাজারে আগুন, পকেটে টান: মধ্যবিত্তের নীরব কান্না, নিম্ন আয়ের মানুষের হাহাকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মাছুদুর রহমান আসলাম

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০২:০২ পি.এম


বাজারে আগুন, পকেটে টান: মধ্যবিত্তের নীরব কান্না, নিম্ন আয়ের মানুষের হাহাকার

 

দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা মানুষ, বাড়ছে জনক্ষোভ, আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিন বাড়ছে সংসার খরচ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকির দাবি, নীরব অর্থনৈতিক সংকটে মধ্যবিত্ত, কঠিন চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ।
দেশে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও শাকসবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষাব্যয় এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যয়। সব মিলিয়ে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও গভীর অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।

বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনে জীবিকা নির্বাহ করা বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পরিবহনশ্রমিক এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর কাছে সংসার চালানো এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসের শুরুতে যে বেতন হাতে আসে, তার বড় অংশই বাড়িভাড়া, বাজার ও যাতায়াত খরচে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষ দিকে অনেক পরিবারকে ধারদেনা কিংবা সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ বাড়ছে। মানুষের অভিযোগ, আয় বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে জীবনযাপনের ব্যয়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।

সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো আয়ের তুলনায় ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। একজন বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মাসিক আয় নির্দিষ্ট থাকলেও বাজারদর, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। প্রতিনিয়ত এসব খাতে ব্যয় বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা থাকলেও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বা বেতন স্কেল বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী বা সাধারণ জনগণের তো এক টাকাও আয় বাড়েনি। উল্টো সবকিছুর দাম বাড়ায় আমাদের সংসার চালানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

তিনি বলেন, আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে মাসের বাজার করা সম্ভব হতো, এখন সেই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যের অর্ধেকও কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব করে চলতে হচ্ছে।

আমিনুল ইসলামের মতো অসংখ্য বেসরকারি চাকরিজীবীর অভিজ্ঞতা এখন প্রায় একই। কেউ সন্তানের শিক্ষার ব্যয় কমাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকের ক্ষেত্রে সঞ্চয় করার সুযোগ তো দূরের কথা, মাসের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।


জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু যানবাহনের জ্বালানি খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্পকারখানা, পণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। নতুন মাসে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও আগের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো সাধারণ মানুষের ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতিতে অনুভূত হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রির বিষয়টি সামনে এসেছে। জ্বালানি তেলের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহন ও অন্যান্য পরিবহন পরিচালনায় বাড়তি খরচ হচ্ছে। পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে। আর সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বাজারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়লে ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়।

এ ছাড়া ডিজেলনির্ভর কৃষিযন্ত্র, সেচপাম্প ও উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষককে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়তে হতে পারে। এতে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক চাপের শিকার হন।


জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়, দোকানপাটের খরচ এবং সেচনির্ভর কৃষির ব্যয় বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল একটি নিয়মিত পরিচালন ব্যয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বা সেবামূল্য তাৎক্ষণিকভাবে বাড়াতে পারে না। ফলে তাদের মুনাফা কমে যায়। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা হলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বাড়তি চাপ পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের সাধারণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এসব খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের হিসাব নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের দুরবস্থা দৃশ্যমান হলেও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট অনেকটাই নীরব। কারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ টিসিবি, ওএমএস কিংবা বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সামাজিক মর্যাদা, আত্মসম্মান ও লোকলজ্জার কারণে এসব কর্মসূচির সুবিধা নিতে সংকোচ বোধ করেন।

ফলে বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি প্রকাশ না করে অনেকেই নিজের প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন একাধিক সদস্য। বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুল-কলেজের বেতন, যাতায়াত, চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে। কোনো সদস্য অসুস্থ হলে কিংবা হঠাৎ অতিরিক্ত কোনো ব্যয় তৈরি হলে পুরো মাসের বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়।

বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে চাকরির অনিশ্চয়তা, সীমিত বেতন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়ে বাড়তি বেতন দাবি করতে পারেন না। আবার যে বেতন পান, তা দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করাও সম্ভব হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। তাঁদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, বিনোদন, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সবচেয়ে কঠিন প্রভাব পড়ছে দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের ওপর। তাঁদের অধিকাংশের আয় দৈনিক কিংবা অনিয়মিত। কোনো দিন কাজ থাকলে আয় হয়, আবার কোনো দিন কাজ না থাকলে পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় দিয়ে বর্তমানে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে সামান্য পরিমাণ চাল, ডাল, তেল ও সবজি কিনতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। কেউ তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে তুলনামূলক কম দামের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, পরিবহন, সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এসব কারণের পাশাপাশি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, অযৌক্তিক মুনাফা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে।

একই পণ্য উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে থাকে। ফলে উৎপাদক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হয়।

এখানে প্রশ্ন উঠছে, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহ ব্যবস্থায় কারা কতটা মুনাফা করছেন এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ কী—তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না।

বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান, মজুত পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কোনো ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট যদি অযৌক্তিকভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা জরিমানা করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত তথ্য দেশের সামগ্রিক মূল্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে। কারণ খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। অন্যান্য ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও প্রতিদিনের খাবারের প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থনীতির প্রচলিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আয় অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারত, এখন একই অর্থে সেই পরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হয় না।

এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতাও সংকুচিত হয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।


বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অন্যতম দাবি হলো জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ বিবেচনায় ভর্তুকি কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যসহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এসব খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সাধারণ মানুষের ওপরও বাড়তি চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

প্রয়োজনে কৃষি, গণপরিবহন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য ডিজেল ও সেচ সুবিধায় সহায়তা দেওয়া হলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ভর্তুকির সুবিধা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। ভর্তুকির নামে কোনো অনিয়ম, অপচয় কিংবা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বাড়তি লাভের সুযোগ তৈরি হলে তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্যও খাদ্যসহায়তা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। টিসিবি ও ওএমএস কর্মসূচির আওতা, পণ্য সরবরাহ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়ানো যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে প্রকৃত সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে সহায়তা নিতে পারেন। ডিজিটাল নিবন্ধন, নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র এবং স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচনব্যবস্থা চালু করা গেলে এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সংগ্রহ এবং ভোক্তার কাছে সহনীয় দামে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।


দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকারখানা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের একটি বড় অংশের আয় নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও কাজের ধরন অনুযায়ী। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নয়, বেসরকারি খাতের কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব আয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষ তাঁদের আয় দিয়ে কতটা প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন, পরিবার নিয়ে কতটা স্বস্তিতে থাকতে পারছেন—সেটিও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।


সাধারণ মানুষের ক্ষোভের পেছনে শুধু বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি নয়, বরং জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়ছে। ফলে মানুষের সঞ্চয়, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন মাস শেষে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হন, তখন সেটি শুধু আর্থিক সংকট থাকে না; পারিবারিক ও সামাজিক চাপেরও কারণ হয়ে ওঠে। সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানো কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করা—এসব স্বাভাবিক প্রত্যাশাও অনেকের কাছে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

মানুষের প্রত্যাশা, সরকার এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন না হয়ে পড়ে। বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় এবং স্থির আয়ের এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। তাই শুধু আশ্বাস কিংবা সাময়িক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে বিলাসী জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চায় না। তারা চায় ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সহনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং সম্মানজনকভাবে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ।

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সুফল যদি সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ এবং মাসিক পারিবারিক বাজেটে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক স্বস্তি কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করে। কারণ মানুষের ধৈর্যেরও সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করার আগেই জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৮
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:১৯
ইশা ০৬:৩১
সূর্যোদয় : ০৬:০৫ সূর্যাস্ত : ০৫:১৯
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%