০২:৪৪ পি.এম
সমাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছয় শব্দের একটি পোস্টের মাধ্যমে অভিজিৎ দীপকের জীবন পরিবর্তিত হয়। মে মাসে হতাশা থেকে তৈরি করা ওই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টটি দ্রুত একটি বৃহৎ রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলনটির নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
২০২৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের অন্যতম বৃহৎ রাজপথের আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছেন ৩০ বছর বয়সী দীপ। বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ইতোমধ্যে দিল্লির রাজপথ ছাড়িয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট
আরও পড়ুন: আর্কটিকে উপস্থিতি বাড়াতে নতুন কৌশল ঘোষণা করছে ইইউ
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মে মাসে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক বক্তব্যে বেকার তরুণদের এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু মানুষকে ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই ১৬ মে দীপ এক্সে লেখেন- ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে হয়?’
এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। দিল্লির ইউটিউবার মেঘনাদসহ কয়েকজন সেটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট। অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ শুরু হয়।
কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও গণমাধ্যমের মালিকানার মতো বিষয়গুলো সামনে আসে।
দীপকের ভাষায়, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা না পাওয়া তরুণদের জন্য একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
আরও পড়ুন: বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ডে’: চীনা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর আহ্বান
কে এই অভিজিৎ দীপকে?
অভিজিৎ দীপকের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে। তিনি দলিত সম্প্রদায়ের একটি নিও-বৌদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা ভগবানরাও দীপকে মহারাষ্ট্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী। মা অনিতা দীপকে গৃহিণী।
ছাত্রজীবনের শুরুতে প্রকৌশল পড়লেও দীপ সে পথে বেশিদিন চলেননি। পরে তিনি সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ নিয়ে পড়াশোনা করেন পুনেতে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বোস্টন ইউনিভার্সিটির কলেজ অব কমিউনিকেশন থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। বিশেষ করে মিম, ব্যঙ্গ, রসিকতা ও সহজ ভাষায় রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশল তাকে তরুণদের কাছে পরিচিত করে তোলে।
আরও পড়ুন: ভারত-চীন সম্পর্কের মোড় ঘোরেনি মোদি-শি বৈঠকেও
আম আদমি পার্টির সঙ্গে পথচলা
২০২০ সালে দীপ আম আদমি পার্টির (এএপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে তিনি মিমনির্ভর ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরে তিনি দিল্লি সরকারের শিক্ষা বিভাগের যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। ২০২৩ সালে এএপির মিডিয়া টিম থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান। যদিও বর্তমানে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তার নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টিও নিজেদের স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে।
বোস্টন থেকে দিল্লির রাজপথে
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩১ শতাংশে নেমেছে
অনলাইনে আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। হুমকির কথা জানালেও দীপ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। জুনে বোস্টন থেকে ভারতে ফিরে আসেন।
গত ৬ জুন দিল্লিতে পৌঁছে তিনি বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনী গ্রহণ করেন। দলিত অধিকার ও সামাজিক সমতার প্রবক্তা আম্বেদকর তার রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
এরপর দিল্লির জন্তর মন্তরে শুরু হয় ককরোচ জনতা পার্টির রাজপথের কর্মসূচি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নির্ধারণ এবং সরকারের জবাবদিহির দাবি সামনে আসে।
আন্দোলন বড় হতে থাকলে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রতিবাদ শিবির গড়ে ওঠে। দীপ কখনো মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছেন, কখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন, আবার কখনো আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের দাবি মেনে নেবে না ইরান: মাসুদ পেজেশকিয়ান
রাজপথে সংঘাত
গত ২০ জুলাই হাজারো আন্দোলনকারী সংসদের দিকে মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। বিভিন্ন স্থানে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য উভয় পক্ষেই আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এরপর দীপ ঘোষণা করেন, আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচি চলবে, তবে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নতুন করে রাজপথের মিছিল স্থগিত রাখা হবে।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই আসে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আন্দোলনকারীরা এটিকে নিজেদের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেন।
আরও পড়ুন: ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে: আব্বাস আরাগচি
শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। পরে এর পরিধি বৃদ্ধি পায়। তরুণদের কর্মসংস্থান, রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব, বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজনৈতিক নিয়োগ, গণমাধ্যমের মালিকানা ও সরকারের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় আসে।
দীপ বারবার বলেছেন, তাদের লক্ষ্য কোনো সরকার পরিবর্তন নয়; বরং ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় তরুণদের জন্য জায়গা তৈরি করা। তিনি আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
হুমকি, সমালোচনা ও বিতর্ক
আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়ার পর দীপ ও তার পরিবারের কাছে হুমকির বার্তা আসার অভিযোগ উঠেছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বার্তার স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাইয়ে এক নারী প্রতিবাদ কর্মসূচির মঞ্চে দীপকের দিকে নীল কালি ছুড়ে দেন। ওই নারী অভিযোগ করেন, ককরোচ জনতা পার্টির কর্মকাণ্ডে হিন্দু দেবতা রামের প্রতি অসম্মান করা হয়েছে। দীপকের পক্ষ থেকে আন্দোলনের রাজনৈতিক ও ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র তুলে ধরা হয়।
এদিকে আন্দোলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন দীপ। এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন