০৭:৫৬ পি.এম
ঢাকা, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ : রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য শৃঙ্খলা আনতে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম জানান যে, নির্ধারিত স্থান ও সময়ের মধ্যে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে হকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি পথচারী ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, সড়কে শৃঙ্খলা আনা এবং নিরাপদ, পথচারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত নগরী গড়ে তোলা।
আজ নগর ভবনে হকার ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিদের সামনে প্রস্তাবিত নীতিমালার বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
আরও পড়ুন: অরেগনের স্কুলে গুলিতে নিহত ৪, আহত ২; শোকে স্তব্ধ শহর
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও উল্লেখ করেন, নিবন্ধিত হকারদের নির্দিষ্ট ব্যবসার শ্রেণি, বসার নির্ধারিত জোন বা অবস্থান, ব্যবসায়িক সময় এবং মাসিক ফি সংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধন সনদে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এছাড়া নিবন্ধিত হকারদের জন্য নির্ধারিত স্থান অন্য কেউ দখল করতে পারবে না এবং ওই স্থান ব্যবহারের নামে হকারদের কাছ থেকে কেউ চাঁদা দাবি করতে পারবে না।
তিনি জানান, হকার নিবন্ধনের জন্য এককালীন ৫ হাজার টাকা ও প্রতি বছর নবায়ন ফি হিসেবে ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য সিটি কর্পোরেশনের স্থান ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার ফি হিসেবে প্রতি মাসে হকার প্রতি ৩ হাজার টাকা ধার্য করা হবে।
প্রশাসক বলেন, নিবন্ধনের আওতায় আসা প্রতিটি হকারকে পরিচয়পত্রের আওতায় স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স প্রদান করা হবে। এই স্মার্ট কার্ডে বারকোড ও কিউআর কোড থাকবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা সহজেই তা যাচাই করতে পারবেন। লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য থাকবে না এবং কোনো হকার ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনকে জানাতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, হকারের ব্যবসার ধরন পরিবর্তনও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া করা যাবে না। নির্ধারিত আকারের বাইরে কোনো স্টল বা ভ্যান বড় করা যাবে না এবং বরাদ্দকৃত স্থানের অতিরিক্ত জায়গা দখল করা যাবে না। শর্ত ভঙ্গ হলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করার কিংবা নিবন্ধন বাতিল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ, বিজিবির বাধা
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও জানান, আবেদন পাওয়ার এক মাসের মধ্যে জায়গা খালি থাকার সাপেক্ষে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। একটি পরিবারের জন্য কেবল একটি লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
তিনি বলেন, নিবন্ধিত হকারদের হালনাগাদ তালিকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হবে। তালিকায় হকারের নাম, পরিচয়, ঠিকানা ও ব্যবসার ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। এর মাধ্যমে নিবন্ধিত হকারদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পথচারীদের চলাচলকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক এই বিষয়টিও বলেছেন যে, হকার বসানোর ক্ষেত্রে এমন রাস্তা ও ফুটপাত নির্বাচন করা হবে, যেখানে হকার বসার পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা অবশিষ্ট থাকে।
প্রধান সড়কে হকার বসানোর অনুমতি থাকবে না। মেট্রো স্টেশন, বাস স্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে যানজট সৃষ্টি না হয়।
আরও পড়ুন: নেত্রকোণায় সাংবাদিক আলিফ হত্যায় অপূর্ব নামে যুবক আটক
এছাড়া তিনি জানা দিয়েছেন, সপ্তাহের ছুটির দিন ও সরকারি ছুটির দিনে নির্দিষ্ট স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ এবং বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকায় অফিস সময়ের পর ‘নৈশকালীন মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। হলিডে মার্কেটে খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। নৈশকালীন মার্কেটের জন্য দিনের বেলা ব্যস্ত কিন্তু রাতের বেলায় তুলনামূলক ফাঁকা থাকা বাণিজ্যিক এলাকার নির্দিষ্ট লেন বিবেচনা করা হবে।
হলিডে ও নৈশকালীন মার্কেটের স্থান নির্ধারণে পথচারী ও যান চলাচলে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী এবং নারীদের অগ্রাধিকারের বিষয়টিও তিনি জানিয়েছেন। খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ, উপাসনালয়ের মাঠ এবং কবরস্থানে কোনো মার্কেট বসানোর অনুমতি নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক জানিয়েছেন, জনস্বার্থ ও নগর উন্নয়নের স্বার্থে যদি কোনো এলাকাকে হকারমুক্ত ঘোষণা করা হয়, তাহলে তা অগ্রাধিকারে আসবে। আবাসিক এলাকায় হকার বসানো নিরুৎসাহিত করা হবে। একই সাথে লাইসেন্সবিহীন হকারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে।
এছাড়া, খাদ্য বিক্রেতা হকারদের স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য প্রস্তুত ও বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া খাদ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে না।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৯০ জন
হকার ব্যবস্থাপনায় সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের সমন্বয়ের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রশাসক বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার হকারদের বিষয়গুলো স্থানীয় পর্যায়েই সমন্বয়ের মাধ্যমে দেখা হবে এবং হকারদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও আলোচনা করবে।
মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত নিবন্ধন ও মাসিক ফি কমানোর দাবি জানান। তারা হকারদের জন্য পুনর্বাসন, সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ এবং অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ ফুটপাতে হকার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রশাসক তাদের বক্তব্য শোনেন এবং নীতিমালার আলোকে বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দেন।
সভায় হকার নেতারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা হকারদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও উপযুক্ত স্থানে পুনর্বাসনের দাবি জানান। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও জুরাইন এলাকায় হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, হকারদের স্বার্থ এবং নগরবাসীর স্বার্থÑদুই দিক বিবেচনা করেই একটি মানবিক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায় সিটি কর্পোরেশন। প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে হকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং একই সাথে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: সরকারি নির্মাণকাজের মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না : আবু সুফিয়ান এমপি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন