১২:২৬ পি.এম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের ‘আত্মহত্যার’ কারণে তার প্রেমিক ইয়াছিনের ধারাবাহিক ‘মানসিক নিপীড়ন’কে দায়ী করছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্তকালে ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে দাবি করেন তার পক্ষের আইনজীবী।
বিডিনিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের একটি বাসায় আত্মহত্যা করেন অথৈ। তার প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ তুলে, পরদিন সূত্রাপুর থানায় মামলা করে মৃতের বাবা প্রণব মজুমদার।
এসময়ে ইয়াছিন লালবাগ এলাকার ‘জমিদারি ভোজ’ রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তদন্তের পর ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
কয়েক মাস কারাভোগের পর ইয়াছিন জামিন পান। কিন্তু আদালতে হাজির থাকায়, গত ২৬ এপ্রিল জামিন বাতিল করে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই আলমগীর হোসেন জানান, ১৯ মে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর ১৪ জুলাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। যেহেতু মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত, আদালত বদলির আদেশ দেন, বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সোহানুর রহমান।
তদন্তকারী এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, “মামলার তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দিয়েছি। কী কারণে আত্মহত্যা করেছে, ভিকটিমের মনের বক্তব্য আমার জানা সম্ভব নয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, অথৈ ও ইয়াছিনের বাড়ি পাশাপাশি; তারা চট্টগ্রামের একটি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ইয়াছিন বিভিন্ন সময় অথৈকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও তার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার পরে, অথৈ ২০২২-২০২৩ সেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হন এবং তিনি সূত্রাপুর এলাকার একটি মেসে থাকতেন।
অথৈ যখন ঢাকায় স্থানান্তরিত হন, ইয়াছিনও একই পথে এগিয়ে যান। তিনি লালবাগের ‘জমিদারি ভোজ’ রেস্তোরাঁয় চাকরি নেন। এরপর থেকে ইয়াছিন আবারো অথৈকে ‘উত্যক্ত’ করতে শুরু করেন।
এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ‘প্রেমের সম্পর্ক’ গড়ে ওঠার বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হচ্ছে, এরপর তারা মোবাইল ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। তবে প্রেমের সম্পর্ক হওয়ার পর থেকেই ইয়াছিন ‘অপমানজনক কথাবার্তা ও অপবাদ’ দিয়ে অথৈকে মানসিক নিপীড়ন করতে থাকেন। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল, অথৈ তার ক্যাম্পাসে একটি সংগীত উৎসবের অনুশীলন শেষে মেসে ফিরছিলেন।
গেটের সামনে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াছিন সংগীত উৎসবে অংশগ্রহণ করতে তাকে বারণ করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এসময় ইয়াছিন অপমানজনক কথাবার্তা বলেন।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চার খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, ইয়াছিনের এ ধরনের আচরণ মেনে নিতে না পেরে অথৈ বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে হয়তো সিলিং ফ্যানের সঙ্গে নিজের গাছ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ইয়াছিন ঘটনার সময় ও আগে মোবাইলে কথাবার্তা থেকে ধারণা করেন যে, অথৈ আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। এরপর ইয়াছিন মেসের মালিক এবং আশপাশের লোকজনকে নিয়ে অথৈয়ের রুমের দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দেখে, অথৈ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। তাকে দ্রুত নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার বলেছেন, ‘মেয়েটা মারা যাওয়ার পর আমি খুব ভেঙে পড়েছি। অসুস্থ হয়ে গেছি। সন্তান হারানোর বেদনা সেই বাবা বোঝেন যে ভুক্তভোগী। সেই বেদনা কীভাবে কাটবে, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানেন না।’
প্রণব মজুমদার জানান, অথৈ তার দুই মেয়ের মধ্যে ছোট। বড় মেয়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। প্রণব মজুমদার পিতৃভাবনায় পরিকল্পনা করেছিলেন, দেশে পড়াশোনা শেষে তিনি অথৈকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবেন। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা পূরণ হয়নি তার।
তিনি বলেন, ‘মেয়েটার বিষয়ে অনেক আশা ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তা আর হলো না। মেয়েটাকে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য করা হলো। আমি যার জন্য মেয়েকে হারিয়েছি, তার সাজা চাই।’
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় দাবী করেছেন, ‘মামলার অভিযোগপত্র আসছে। আসামির মানসিক টার্চারে ভিকটিম আত্মহত্যা করে। তাদের ফিজিক্যাল রিলেশনের একটি ছবি ছিল আসামির মোবাইলে। ওই ছবি দিয়ে ভিকটিমকে ভয় দেখাতো। মানসিক টর্চার করতো। তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। সিআইডি পুলিশের ফরেনসিক রিপোর্টে ওই ছবি পাওয়া গেছে। আসামি প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিল, এমন কিছু নেই। ফরেনসিক রিপোর্টে ছবি পাওয়া গেছে, এটা জানার পরই সে স্ট্রোক করেছে। তার আইনজীবীর জুনিয়র জানিয়েছে, সে মারা গেছে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেছেন, ‘ছেলেটা খুব ভালো। কিন্তু সে সিরিয়াস অসুস্থ ছিল। মরার মতো অবস্থায় ছিল। বেশ কয়েকদিন আগে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে— তার পরিবার এটা জানিয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবীকে বিষয়টি জানিয়েছি। আগামী তারিখে আদালতকেও অবহিত করব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন