১০:৫৮ এম
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে পুলিশ হেফাজতে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় 'দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ ফৌজদারি তদন্ত' করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এইচআরডব্লিউ জানায়, গত ৫ আগস্ট পুলিশ হেফাজতে আনমোল ও আমিনা নামে পরিচিত দুই ননদ-ভাবির মৃত্যু হয়েছে।
তাদের মধ্যে একজন নারী এবং অপরজন ১৭ বছর বয়সী কিশোরী। তবে তাদের পুরো পরিচয় প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। এই দুই মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জানায় এইচআরডব্লিউ। একই সঙ্গে, ২০২২ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ ও শাস্তি আইন করার পরও পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে সম্ভাব্য ৪ পরিস্থিতি ২৭ অক্টোবর
এইচআরডব্লিউর জ্যেষ্ঠ এশিয়া সহযোগী পরিচালক প্যাট্রিসিয়া গসম্যান বলেন, "লাহোরে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনা পাকিস্তানের আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের প্রভাব থাকা চলবে না।" তিনি আরো বলেন, "কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে মামলা করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।"
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে, ৪ আগস্ট দুপুর প্রায় ২টা ৪৫ মিনিটে লাহোর পুলিশ এক বাসিন্দার কাছ থেকে অভিযোগ পায়।
ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, "দুই নারী তার বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরি করেছে।" অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ জানায়, স্থানীয় বাসিন্দারা দুই ননদ-ভাবিকে আটক করে পুলিশের কাছে তুলে দেন। ওই দিন বিকেলেই পুলিশ একটি প্রাথমিক তথ্য প্রতিবেদন (এফআইআর) করে। পরে দুই নারীকে আলাদা থানায় নেওয়া হয়। তাদের একজনকে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে লিটন রোড থানায় এবং অন্যজনকে টাউনশিপ থানায় রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, থানায় নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুই নারীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আনমোল থানার ভেতরেই মারা যান বলে জানা গেছে। আমিনাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু ঘটে।
আরও পড়ুন: গাড়িচাপায় দুই পা হারালেন অস্ট্রেলীয় এমপি হেলেন হেইনস
এইচআরডব্লিউ জানায়, পুলিশ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে দেরি করায় দুই নারীর ময়নাতদন্ত করতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দুই নারীর পরিচয়পত্র যাচাই করতে সমস্যা হওয়ায় এই দেরি হয়েছে। তবে, হেফাজতে মৃত্যুর পর মরদেহ পরীক্ষা করতে অপ্রয়োজনীয় দেরি হওয়াকে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে মনে করছে এইচআরডব্লিউ। বিশেষ করে, যে পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা তদন্তের আওতায় আসতে পারেন, সেই বিভাগের কারণে যদি ময়নাতদন্তে এতো দেরি হয়, তাহলে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। চিকিৎসা পরীক্ষকেরা আরও পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছেন।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, দুই নারীর পরিবারের সদস্যরা পুলিশের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি করেছেন। তারা জানান, দুই নারীকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর তারা টাউনশিপ থানায় যান। সেখানে পুলিশ তাদের জানায়, দুই নারীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তাদের জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরদিন, ৬ আগস্ট পরিবারের কাছে দুই নারীর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মরদেহ দুটির কাপড় ছেঁড়া ছিল এবং শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে। তারা আরও দাবি করেছেন, চুপ থাকার বিনিময়ে পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশের আরেক দাবি হলো, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দুই নারী দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবহার করতেন। অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের কারণে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় পরে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত শুরু করেছেন। এইচআরডব্লিউ জানায়, তদন্তকারীরা টাউনশিপ থানায় যান। তারা মর্গে মরদেহ পরীক্ষা করেন এবং পুলিশ সদস্য ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেন। তবে এইচআরডব্লিউ বলেছে, পাকিস্তানের আইনে ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ফৌজদারি তদন্তের বিকল্প নয়।
২০২২ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ ও শাস্তি আইনে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব ফেডারেল তদন্ত সংস্থার (এফআইএ) ওপর দেওয়া হয়েছে। এই তদন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকর তদারকিতে হওয়ার কথা। কিন্তু এই দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন
লাহোরে পুলিশ হেফাজতে দুই নারীর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২ আগস্ট লাহোরের গাজিয়াবাদ থানার ভেতরে এক প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় একজন সহকারী উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে ওই থানায় কর্মরত ৭৮ জন পুলিশ সদস্যকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এই দুই ঘটনা সামনে আসার পর পাকিস্তানে পুলিশ হেফাজতে থাকা নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলছে, পাকিস্তানে পুলিশ হেফাজতে মারধর, যৌন সহিংসতা, ঘুম থেকে বঞ্চিত করা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা তারা আগেও নথিভুক্ত করেছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। হেফাজতে থাকা নারীদের যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে। খাবার বা অন্য সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগও সংস্থাটি নথিভুক্ত করেছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, পাকিস্তানের সংবিধানে নির্যাতন নিষিদ্ধ। আটক ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। পাকিস্তান নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নির্যাতনবিরোধী সনদেরও সদস্য। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তান শিশু অধিকার সনদেরও সদস্য। এই সনদ অনুযায়ী, কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার, আটক বা কারাদণ্ড দেওয়া হলে তা অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে। শিশুকে আটক করা কেবল শেষ উপায় হিসেবে এবং যত কম সময় সম্ভব তত সময়ের জন্য করা উচিত।
এইচআরডব্লিউ ২০২২ সালে পাকিস্তানে একটি বিশেষ আইন করার পরও সেটির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে ফেডারেল তদন্ত সংস্থা লাহোর হাইকোর্টকে জানায়, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ওই আইনের অধীনে ৩৬৪টি তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫২টি আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি মামলায় পরিণত করা হয়। পাঞ্জাব প্রদেশে ২৬৬টি তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১৯টি ঘটনায় প্রাথমিক তথ্য প্রতিবেদন বা এফআইআর করা হয়। ফেডারেল তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, 'অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি আইনের কার্যকর প্রয়োগে বাধা তৈরি করছে'। এ ছাড়া, ২০২২ সালের আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা অনুমোদন করা হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। অর্থাৎ, আইন পাস হওয়ার কয়েক বছর পর তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা অনুমোদন করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে ২০২২ সালের আইনের অধীনে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, তদন্ত অবশ্যই পাঞ্জাব পুলিশের বাইরে থাকা তদন্তকারীদের দিয়ে করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তে পাওয়া সব আলামত সংরক্ষণ ও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে এবং যারা তদন্তে প্রভাব ফেলতে বা তদন্তে বাধা দিতে পারেন, তাদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে একই সঙ্গে তাদের আইনি অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছে। কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড মেনে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
আরও পড়ুন: রাশেদ খান: এনসিপি ল্যাপটপ ও ছাগল চোরদের আশ্রয়স্থল, জামায়াত অপরাধীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র
এইচআরডব্লিউ পাকিস্তানকে হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বাড়াতে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলেছে সংস্থাটি। এসব ব্যবস্থার মধ্যে আইনজীবীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চিকিৎসা পরীক্ষা, হেফাজত-সংক্রান্ত সঠিক নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের সদস্যদের দ্রুত আটকের খবর দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। নারী বন্দিদের সঙ্গে আচরণ এবং নারী অপরাধীদের কারাগারের বাইরে রাখার ব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘের নিয়ম মেনে চলারও আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। এসব নিয়মকে সাধারণভাবে ‘ব্যাংকক নিয়ম’ নামে পরিচিত। সংস্থাটি সাধারণ থানার হাজতখানার বাইরে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে, আটক ব্যক্তিরা যাতে প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারেন, সে জন্য গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলেছে, আনমোল ও আমিনার মৃত্যুর ঘটনা পাকিস্তান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে, ২০২২ সালের আইন সরকার কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে, সেটি এই ঘটনায় স্পষ্ট হবে। সংস্থাটির ভাষ্য, থানাগুলো এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে আইন প্রয়োগ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সেখানে এমন কোনো ঘটনা তোলা উচিত নয় যেখানে মানুষ নির্যাতনের শিকার হবে এবং এর জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন