০৭:১২ এম
দেশের বাজারে ফলের দাম চড়া থাকলেও চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় সব ধরনের ফলের কেজি প্রতি অন্তত ১০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা উচ্চ শুল্কহার এবং খরচ বৃদ্ধিকে ফলের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী করছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে আমদানি করা ফলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশি ফলের বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশি ফলের বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশে বিদেশি ফলের বাৎসরিক চাহিদা ৫২০,০০০ থেকে ৫৪০,০০০ টনের মধ্যে রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশি ফলের আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৩৮,০০০ টন, যা গড়ে প্রতি মাসে ৪৫,০০০ টনের কাছাকাছি।
আরও পড়ুন: অক্টোবরের ২৬ দিনে দেশে এসেছে ২৪৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আমদানির পরিমাণ ৪১২,০০০ টন হয়েছে। ৯ মাসে স্বাভাবিক চাহিদা ছিল সর্বোচ্চ ৪০৫,০০০ টন।
চট্টগ্রামের ফলমণ্ডী, যা দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলবাজার, সেখান থেকে ফলের চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি দোকান ও গুদামে বিদেশি ফলের ভাণ্ডার পূর্ণ। সেখানে ধুমধাম বেচাকেনা চলছে। এদিন সাড়ে ছয় কেজির এক ক্যারেট আঙ্গুরের দাম ছিল ১৯০০-২১০০ টাকা। ২৪ কেজির এক ক্যারেট আপেল বিক্রি হয়েছে ৫৩০০-৫৫০০ টাকায়। ২২০ পিচের এক ক্যারেট কমলা বিক্রি হয়েছে চার হাজার টাকায়। ১৫ কেজির এক ক্যারেট মাল্টার দাম ছিল ৪৬০০ টাকা। পাইকারিতে ওইদিন বড় দানার প্রতিকেজি আনার দাম ছিল ৪০০ টাকা।
ফলমণ্ডী পাইকারি বাজার থেকে কয়েকশ মিটার দূরে রেয়াজউদ্দিন বাজার, যেখানে সবচেয়ে সস্তা খুচরা বাজার। এখানে প্রতিটি ফলের দাম প্রতিকেজি অন্তত ৫০ টাকা বেশি। দুই কিলোমিটার দূরে কাজির দেউড়ি কাঁচাবাজার, যেখানে ফলের দোকানের সংখ্যা বেশি। ফলমণ্ডীর পাইকারি বাজারে আঙ্গুরের দাম ছিল ৩২৪ টাকা কেজি, কিন্তু কাজির দেউড়িতে তার দাম ৫০০ টাকা। ফলমণ্ডীতে ২৩০ টাকা কেজির আপেল কাজির দেউড়িতে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৩০০ টাকার মাল্টা ৩৭০ টাকা এবং ২৮০ টাকার কমলা ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দুই নম্বর গেট কর্ণফুলী কাঁচাবাজারের ফলের দোকানগুলোতে একই চিত্র দেখা যায়। এখানকার বিক্রেতা আবুল হাশেম জানান, তারা পাইকারি বাজার থেকে ফল কিনে খরচ যুক্ত করে ১৫-২০ শতাংশ লাভ ধরে দাম নির্ধারণ করেন। তবে বর্তমানে ১০ শতাংশ লাভ হিসাব করেও দাম নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, পাইকারি বাজারে ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে বিক্রির ওপর প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্রেতা দাম শুনে ফল না কিনে চলে যাচ্ছেন। দুই মাস আগে ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। দাম কমার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে তিনি জানান।
আরও পড়ুন: সার আমদানি কমাতে তিনটি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা ফলের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রেফার কনটেইনারে আসে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১,২০০ কোটি টাকার ১,৩৭,০০০ টন আপেল, ৯৫৬ কোটি টাকার ১,০৭,০০০ টন কমলা, ৭২৭ কোটি টাকার ৬৯,০০০ টন আঙ্গুর, ৫৭২ কোটি টাকার ৬৫,৫৮৫ টন মেন্ডারিন এবং ৩৩৮ কোটি টাকার ৩৩,৭৪০ টন অন্যান্য ফল আমদানি হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, আমদানি করা প্রতি কেজি ফলের ভিত্তিমূল্য ৮০ সেন্ট ধরে ১২২ শতাংশ ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ কাস্টম ডিউটি, ২০ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি, ৩০ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ এআইটি রয়েছে। অর্থাৎ, আমদানিকারক দেশ থেকে ১০০ টাকার ফল কিনে বাংলাদেশে আনতে ১২২ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। জাহাজ ও রেফার কনটেইনার ভাড়া যুক্ত হলে ১০০ টাকার ফল বাংলাদেশে পৌঁছাতে ২৪০ টাকার কাছাকাছি খরচ হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির একটি কারণ।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানিয়েছেন, ফলের দাম ২০২৩ সাল থেকেই বাড়তে শুরু করেছে। কারণ, ওই সময় যে ফলে ট্যাক্স ছিল ৩০ টাকা, এখন তা ১১০ টাকা। যে ফলে ট্যাক্স ছিল ৪৫ টাকা, এখন তা ১৪৫ টাকা। জাহাজ ভাড়া ও কনটেইনার ভাড়া সবই গত বছরের তুলনায় কয়েকশগুণ বেড়ে গেছে। খরচ বেশি হলে দাম বাড়বে, এটি স্বাভাবিক।
তিনি আরও জানান, চীন থেকে আসা ফলের দাম এখনো কম রয়েছে। কিন্তু আফ্রিকা থেকে আসা ফলের দাম কিছুটা বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে ওই জাহাজগুলো রুট পরিবর্তন করে আসছে। যে জাহাজের ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল সিঙ্গাপুর, সেই জাহাজ এখন মালয়েশিয়া হয়ে আসছে। ফলে সাপ্লাই চেইনে হঠাৎ ছন্দপতন ঘটেছে। আশা করা হচ্ছে, এ মাসের শেষে বেশ কয়েকটি জাহাজ একসঙ্গে আসবে। তখন ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। অনেক আমদানিকারক লোকসানেও পড়তে পারেন, কারণ এগুলো পচনশীল পণ্য। স্টক করে বিক্রি করার সুযোগ সীমিত।
আরও পড়ুন: জ্বালানি আমদানির দায় মেটানোর চাপে বাড়ল ডলারের দাম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৫৩৮,০০০ টন বিভিন্ন ধরনের ফল বাংলাদেশে এসেছে, যার মূল্য ৪,৯৬৫ কোটি টাকা। এসব ফল থেকে রাজস্ব এসেছিল ৫,৪৫৮ কোটি টাকা। বিপরীতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩,৭৯৯ কোটি টাকার ৪১২,০০০ টন আমদানি করা ফল এসেছে দেশে, যার থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪,৩০০ কোটি টাকা। মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিসরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব ফল আমদানি করা হয়।
এমই
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন