০৬:৪০ এম
টাপুর-টুপুর বৃষ্টির শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ ও শীতল বাতাস— বৃষ্টি অনেকের কাছে প্রশান্তি, ভালোবাসা এবং রোমান্টিক অনুভূতির প্রতীক। কিন্তু একই বৃষ্টি সবার মনে আনন্দের সুর তোলে না। অনেকের কাছে মেঘলা আকাশ মানে অকারণ বিষণ্নতা, ক্লান্তি, একাকিত্ব কিংবা মন খারাপের অনুভূতি।
আপনিও যদি বৃষ্টির দিনে অস্বাভাবিকভাবে মনমরা অনুভব করেন, তাহলে জানুন— এটি কিছু অস্বাভাবিক নয়। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘলা আকাশ বা দীর্ঘ সময় সূর্যালোকের অভাব অনেক মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্নতার লক্ষণকে বাড়িয়ে তোলে। এই অবস্থার জন্য সাধারণভাবে ‘রেইনি ডে ব্লুজ’ (Rainy Day Blues) বলা হয়।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বৃষ্টি নিজেই বিষণ্নতার কারণ। বরং বৃষ্টির আবহাওয়া বেশিরভাগ সময় আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে এবং আগে থেকে থাকা বিষণ্নতা বা ‘সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার’ (Seasonal Affective Disorder—SAD)-এর লক্ষণগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন: পুরুষদের চেয়ে নারীরা কেন বেশি দিন বাঁচেন?
কেন বৃষ্টির দিনে মন খারাপ বেশি হয়?
মনোবিদদের মতে, বৃষ্টির দিনে মন খারাপের পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
১. সিজনাল ডিপ্রেশন বা ঋতুভিত্তিক বিষণ্নতা।
সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার (SAD) হচ্ছে এক ধরনের মানসিক সমস্যা, যা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে— বিশেষ করে শীতকাল বা দীর্ঘ সময় মেঘলা আবহাওয়ার মধ্যে— বেশি সাধারণ হয়। এ সময় বহু মানুষের অকারণে মনমরা, ক্লান্ত ও অনুৎসাহী অনুভূতিতে ভোগান্তির মুখে পড়েন।
আরও পড়ুন: শীতের ছুটিতে ঘুরে আসুন বাংলাদেশের ৮ দর্শনীয় স্থান
২. সূর্যালোকের অভাব।
সূরের আলো আমাদের শরীরে সেরোটোনিন নামের একটি রাসায়নিকের উৎপাদনে সহায়তা করে, যা ভালো মেজাজ বজায় রাখতে সাহায্য করে। মেঘলা দিনে সূর্যালোক কমে যাওয়ার কারণে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এর পাশাপাশি মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদনেও পরিবর্তন আসে, যা ঘুমের রুটিন বিঘ্নিত করতে পারে। পর্যাপ্ত বা নিয়মিত ঘুমের অভাব মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে দেয়।
৩. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ।
অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য প্রভাব বিভিন্ন মানুষের মনে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন ঘটে, সেখানে হতাশা ও উদ্বেগের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
আরও পড়ুন: মেঘমুক্ত আকাশে পঞ্চগড় থেকে দৃশ্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা, উচ্ছ্বসিত প্রকৃতিপ্রেমীরা
৪. ঘরবন্দি জীবন ও একঘেয়েমি।
বৃষ্টির কারণে বাইরে হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘ সময় ঘরে থাকতে হলে একঘেয়েমি, অলসতা ও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে, যা মন খারাপের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বৃষ্টির দিনে মন ভালো রাখার সহজ ও কার্যকর উপায়—
মন খারাপ লাগা স্বাভাবিক হলেও কিছু ছোট অভ্যাস আপনাকে ভালো থাকতে সহায়তা করতে পারে।
আরও পড়ুন: বুধবার ১২ রাশির অর্থভাগ্যে সতর্কতা, জেনে নিন রাশিফল
লাইট থেরাপির সাহায্য নিন।
সিজনাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে লাইট থেরাপি কার্যকর বলিয়া মনে হয়। প্রতিদিন সকালে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোতে কিছু সময় কাটালে সেরোটোনিনের কার্যকারিতা বাড়তে পারে এবং মেজাজও উন্নত হতে পারে।
ঘরেই শরীরচর্চা করুন।
বৃষ্টি মানে ব্যায়াম বন্ধ রাখার কারণে নয়। ঘরের মধ্যেই হালকা ব্যায়াম, নাচ, যোগব্যায়াম, ইউটিউব ফিটনেস ভিডিও অনুসরণ করা অথবা ঘরের কাজে শরীরকে সক্রিয় রাখা সম্ভব। নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে ভালো রাখতে সহায়ক।
আরও পড়ুন: ৫৩ বছরেও ফিট থাকার জন্য শচীন ছেড়ে দিলেন দুই বদঅভ্যাস
পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করুন।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম কম হলেও সমস্যা হয়, আবার অতিরিক্ত ঘুমও বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।
প্রিয় মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুন।
বৃষ্টির দিনে নিজেকে একা না রেখে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করুন। ভিডিও কল, অনলাইন গেম, একসঙ্গে বই পড়া বা ছোট্ট আড্ডা মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। মানুষ সামাজিক জীব; তাই সম্পর্ক ও যোগাযোগ মানসিক সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি।
আরও পড়ুন: ২৮ অক্টোবর: ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা
কখন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন?
মন খারাপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তাহলে দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি—
দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
সারাক্ষণ ক্লান্তি বা শক্তির ঘাটতি অনুভব করা।
আত্মহত্যার চিন্তা বা নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা তৈরি হওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতায় ভুগলে এমন একজন থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো, যিনি আবহাওয়াজনিত বিষণ্নতা বা Seasonal Affective Disorder (SAD) সম্পর্কে অভিজ্ঞ।
বৃষ্টি প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। কারো কাছে এটি আনন্দের, আবার কারো কাছে এটি অকারণ বিষণ্নতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই বৃষ্টির দিনে মন খারাপ লাগলে নিজেকে দোষারোপ করার কিছু নেই। বরং নিজের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিন, নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত আলো, শরীরচর্চা এবং প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যকে জীবনের ভিত্তি করুন।
আর যদি দেখেন মন খারাপ দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে ঘিরে রাখছে বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে, তাহলে অবশ্যই পেশাদার সহায়তা নিন। মনে রাখবেন, সময়মতো যত্ন নিলে ‘রেইনি ডে ব্লুজ’ সাময়িকই থাকে— এবং একটু সচেতনতা ও যত্নই মেঘলা দিনেও ফিরে আসতে পারে মনের রোদেলা আলো।
সূত্র: হেলথলাইন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন