০২:০৩ এম
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নে স্থাপিত মেগাপ্রকল্পের কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কারণে কৃষি পেশায় ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার ফলে এই এলাকার জনগণকে তাঁদের চিরাচরিত স্বাধীন পেশা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছে। বর্তমানে কোনো উপায় না পেয়ে এই মানুষগুলো স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাও খুব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণগবেষণায় এ চিত্র ফুটে উঠেছে। স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত গণগবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে ‘আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক একটি গণগবেষণাপত্রে এই সংকটের চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের বাস্তবায়নে এবং প্রকাশিত এই গণগবেষণায় একশন এইড বাংলাদেশ সহায়তা করেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, চিরায়ত স্বাধীন পেশা কৃষিতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের অঞ্চলটি নিয়ে ৪৫৭ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত জরিপে বলা হয়েছে, সেখানে কৃষি ছিল প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। জরিপে অংশ নেয়া ১৬১ জন কৃষক জানিয়েছেন, তারা এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে পেশায় সচল ছিলেন এবং ছিলেন স্বাবলম্বী। কিন্তু মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নের পর কৃষি পেশায় টিকে আছেন মাত্র ৫১ জন। অন্যদিকে বাকি ১১০ জন পেশা হারিয়েছেন। এই মানুষগুলো সরাসরি তাঁদের আয়ের মূল উৎস এবং স্বাধীন পেশা কৃষিকাজ হারিয়েছেন।
জরিপে উত্তরদাতাদের মধ্যে গৃহিনীর সংখ্যা ৯৮ জন থেকে বেড়ে ১৫২ জন হয়েছে। কিন্তু যাঁদের সংখ্যা বেড়েছে, তাঁরা আগে কৃষিকাজ করতেন। একইভাবে, প্রকল্পের আগে উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৯ জন দিনমজুর ছিলেন, পরে তাঁদের সংখ্যা বেড়ে ৭১ জন হয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার ৭ জনের জায়গায় বেড়ে ৩২ জন হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে এসব পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতায় ধ্বস নেমেছে এবং সামাজিক সংকট বেড়ে গেছে। ঐ নির্দিষ্ট জনগণ প্রকল্পের আগে ভালো বা খুব ভালো আছেন বলে জানিয়েছিলেন ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে ভালো বা খুব ভালো আছেন বলে মতামত দিয়েছেন মাত্র ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ। ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বলেছেন, বর্তমানে তাঁদের খারাপ বা খুব খারাপ অবস্থা। একই সঙ্গে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং বহুমাত্রিক ঝুঁকি, সুপেয় পানির সংকট এবং জলাশয়ের মরণদশা, বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব, ক্ষতিগ্রস্ত জীববৈচিত্র এবং বাস্তুসংস্থানের সংকট বেড়ে চলেছে। বলা হয়েছে, বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে। মেগা প্রকল্পের আগে ধানখালীর নদী কিংবা খালে ইলিশসহ ত্রিশের অধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত যা এখন নাই বললেই চলে। একইভাবে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য সংকট, বহুমাত্রিক রোগবালাই, এবং নারীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গণগবেষণা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। এর প্রভাবকে জীবনমুখী পর্যবেক্ষণের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় ধানখালীর ৮টি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর বিস্তারিত সামাজিক ও পরিবেশগত জরিপ চালানো হয়েছে। এছাড়া উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রাজশাহীবাসী: রাসিক প্রশাসক
সোমবার দুপুরে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন ‘পায়রা’ অনুষ্ঠিত গণগবেষণার ফলাফল বিষয়ক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য মেজবাহউদ্দিন মাননু। প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা টেনমং, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মোকসেদুল আলম, সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার, কলাপাড়া থানার এসআই আব্দুল হামিদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, গণগবেষক মেহেদী হাসান এবং হালিমা আয়েশা। বিষয়ের উপর পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা করেন একশন এইড বাংলাদেশের এসোসিয়েট প্রোগ্রাম অফিসার মারজিয়া জাহান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ। এই অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ, সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, গণগবেষকবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ বিষয়ে উল্লেখ্য, কলাপাড়ার ধানখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা (বিসিপিসিএল) এবং একই উৎপাদন ক্ষমতার পটুয়াখালী (আরএনপিএল) দুটি বিদ্যুত প্লান্ট সচল রয়েছে। আরো একটি (আশুগঞ্জ) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব জমি অধিগ্রহণের ফলে সরাসরি অন্তত ৬৮৫ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। ফলে এসব পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে অন্তত দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়েছে এবং ক্ষতির কবলে পড়েছে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকার মানুষ এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক আন্দোলন করছেন। তাঁরা সরকারের এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন