০৯:৫৬ পি.এম
ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক অসন্তোষ তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে তিনি তরুণদের কাছে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছেন।
রাহুল গান্ধী ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতি। তার বাবা রাজীব গান্ধীও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে রাহুলকে দীর্ঘদিন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে ৫৬ বছর বয়সে এসে মোদির কঠোর নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন করে নিজের রাজনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি।
রাহুলের বক্তব্য, "ভারতের নাগরিকদের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।" কলেজে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল এবং পরবর্তী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার এই বক্তব্য গুরুত্ব পায়। ওই পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও সামনে আসে। এর কিছু সপ্তাহ পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তার সমালোচনা নতুন করে আলোচনায় আসে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো বদলাচ্ছে: বিশ্লেষক
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীরজা চৌধুরী মন্তব্য করেন, সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনার অভাব রাহুলের বক্তব্যকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। তার ভাষায়, এসব কারণে রাহুল এখন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি কংগ্রেসকে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পথে নিতে পারবেন কি না। এর মধ্য দিয়ে বিজেপির দীর্ঘদিনের ক্ষমতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পথচলা সহজ ছিল না। এক দশকের বেশি সময় ধরে তার দল কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির কাছে একের পর এক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। একসময় তার বাবা রাজীব গান্ধীর দখলে থাকা আসনেও হেরে যান রাহুল। তার মা সোনিয়া গান্ধীও দীর্ঘদিন কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বদলাতে দেশজুড়ে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেন রাহুল। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ নামের ওই কর্মসূচিতে তিনি প্রায় ২ হাজার ৫০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। ১৩৬ দিন ধরে চলা এই যাত্রার অন্যতম লক্ষ্য ছিল তাকে অভিজাত ও সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নেতা হিসেবে দেখার ধারণা বদলে দেওয়া।
আরও পড়ুন: ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র দুই নেতার আটকাদেশ দুই দিন বৃদ্ধি
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বাড়ে এবং বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। ফলে জোটের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করতে হয় দলটিকে। ওই নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পান রাহুল।
এরপরও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা অব্যাহত রাখেন। মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় কারসাজি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিহারের নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ তোলেন।
এক বছর আগে শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও সামনে আনেন রাহুল। তার অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নাম বাদ দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। সমালোচকদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিজেপিবিরোধী বলে বিবেচিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে চেন্নাইয়ের এক জনসভায় রাহুল বলেন, "প্রধানমন্ত্রী মোদি বুঝতে পারছেন না যে তার রাজনৈতিক খেলার সময় শেষ হয়ে আসছে।" তবে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারা তার বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, তরুণদের একাংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেলেও এ ধরনের অবস্থান অন্য ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: মুসলিম বনাম মুসলিম যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে! হাসছে মার্কিন-ইসরাইল
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, কংগ্রেস বড় ধরনের পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছে। তার দাবি, নেতিবাচক রাজনীতি দলটির কোনো উপকারে আসবে না।
তরুণদের অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন রাহুল
চেন্নাইয়ের জনসভায় তরুণদের মঞ্চে ডেকে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ দেন রাহুল। ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ বা ‘তরুণদের কণ্ঠস্বর’ নামের একটি প্রচারণার অংশ ছিল এই আয়োজন। রাজনৈতিক জবাবদিহি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের অসন্তোষ সামনে আনতেই গত জুনে কর্মসূচিটি শুরু করেন তিনি।
সভায় এক তরুণী তার বোনের আত্মহত্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তার বোন মেডিকেল কলেজে ভর্তির কঠিন পরীক্ষার চাপের মধ্যে আত্মহত্যা করেছিলেন। আরেক বক্তা মুসলিম ও নারী হিসেবে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাহীনতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী: ইরান
রাহুলের ‘পিতৃতন্ত্র ধ্বংস করো’ স্লোগানটি সভায় উপস্থিত ১৮ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ঋতিকা র্যাচেল প্রবীণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার মতে, ভারতের মতো দেশে পিতৃতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার কথা কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে শোনা ছিল নতুন ও উৎসাহব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, যিনি ২০০৭ সাল থেকে রাহুলকে চেনেন এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন প্রচারণায় কাজ করেছেন, তাকে বই ও নতুন ধারণার প্রতি আগ্রহী একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার মতে, রাহুল কিছুটা লাজুক এবং সহজাত বক্তা নন। ফলে জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছেন কংগ্রেস নেতা। সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে হাস্যরসের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরছেন তিনি। সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি ফিটনেস ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে নিজের আরেকটি দিকও সামনে আনছেন।
আগস্টে ইনস্টাগ্রামের ‘আস্ক মি এনিথিং’ পর্বে নিজের শরীরচর্চার রুটিন সম্পর্কে জানান রাহুল। মার্শাল আর্ট, সাঁতার, দৌড়, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম ও যোগব্যায়ামের পাশাপাশি উচ্চ প্রোটিন ও কম শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: সহিংসতা ও নিরাপত্তা শঙ্কায় পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য স্থগিত
রাজপথের প্রতিবাদে তার অংশগ্রহণের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জুলাইয়ে বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে মোদির সরকারি বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। সে সময় পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে—এমন ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি মাসেও পুলিশের বাধার মুখে তার প্রতিরোধ এবং ব্যারিকেডের ওপর উঠে পড়ার দৃশ্য আলোচনায় আসে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির বিশ্লেষক আশুতোষ ভার্শনির মতে, এসব দৃশ্য রাহুলকে মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। তবে এর মাধ্যমে মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি।
ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বার্তা নিয়ে এগোচ্ছেন রাহুল।
তরুণদের সমর্থন বাড়ানোর পাশাপাশি বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছেন রাহুল। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ভারতের সংবিধানের একটি কপি হাতে নিয়ে হাজির হওয়ার ঘটনাও তার রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ইস্পাতনগরীতে সাধারণ মানুষ জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে
তিনি কংগ্রেসের স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহ্য সামনে এনে ভারতের সংবিধানে থাকা গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলছেন। একই সঙ্গে বিরোধী জোটের দলগুলোকে নিজেদের মতপার্থক্য পাশে রেখে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
নীরজা চৌধুরীর মতে, রাহুল এখন শুধু বিরোধী দলের নেতা নন; মোদির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও তাকে দেখা হচ্ছে। তার ভাষায়, ভারতের রাজনীতিতে লড়াইটি ক্রমেই ‘মোদি বনাম রাহুল’ রূপ নিচ্ছে।
বিরোধী জোটের শরিক একটি দলের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও মনে করেন, বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষেত্রে কংগ্রেসের জাতীয় পর্যায়ের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিজেপি এমনভাবে রাজনৈতিক পরিসর বিস্তৃত করেছে যে পুরো ব্যবস্থার ওপরই দলটির প্রভাব তৈরি হয়েছে।
রাহুলের বক্তব্য, ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরিচয়ের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "জনমত, মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সংঘাত চলছে।" তার দাবি, কংগ্রেস এসব ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রগতি অর্জন করছে।
তরুণদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে রাহুল কতটা সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার সাম্প্রতিক তৎপরতায় স্পষ্ট, মোদিবিরোধী রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করাকে তিনি এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন