১১:৫৮ এম
সম্প্রতি ভারতে তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর সব সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে এই আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নতুন কৌশল নিয়েছে তরুণদের মন পেতে।
নিজেদের ক্ষয়ে যাওয়া ইমেজ পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর মোদি এখন ইনস্টাগ্রামের রিল ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওতে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। এক সময়ে নিখুঁত ও মাপা রাজনৈতিক বার্তার পাট চুকিয়ে, ইনস্টাগ্রামের রিল এবং শর্ট ভিডিও তাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মোদি বর্তমানে বাইক জ্যাকেট এবং সানগ্লাস পরে র্যাপ গানের তালে কিংবা জনপ্রিয় সিটকম ‘ফ্রেন্ডস’-এর থিম সংয়ের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত মেজাজে নিজেকে তুলে ধরছেন। এমনকি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি ‘হাই, ফ্রেন্ডস’ বলে অনানুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতা বদলের অংশ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের জেন জি প্রজন্মের অনেকেই হয়তো নরেন্দ্র মোদীকে বন্ধু হিসেবে দেখেন না। তবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত কথা বলার চেষ্টা করছেন। ৭৫ বছর বয়সী এই নেতা, যিনি দীর্ঘকাল ধরে পূর্বলিখিত বক্তৃতা এবং সতর্কভাবে সাজানো উপস্থিতির মাধ্যমে শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, সম্প্রতি আরও অনানুষ্ঠানিক একটি ভঙ্গি গ্রহণ করেছেন ইনস্টাগ্রামে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে সম্ভাব্য ৪ পরিস্থিতি ২৭ অক্টোবর
মোদির টাইমলাইন, যেখানে এক মাস আগেও খুব যত্ন করে বাছাইকৃত পোস্ট দেখা যেত, সেখানে এখন খোলামেলা বিষয়বস্তুও দেখা যাচ্ছে। ‘আমার সঙ্গে প্রস্তুত হোন’ ধরনের একটি ভিডিও এবং তরুণদের উদ্দেশে সেলফি ধাঁচের বেশ কয়েকটি বার্তা, যাদের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন তিনি।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি জেন জি প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় একটি উক্তি তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমার বংশের মধ্যে আমিই প্রথম রকেট, চিপ এবং ড্রোন তৈরি করেছি।’
ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ১০ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে, যা তাকে এই প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সর্বাধিক অনুসরণকৃত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মে তার যোগাযোগের ধরণটি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলের কেন্দ্রে কখনোই ছিল না।
ডিজিটাল কর্মকৌশলে পারদর্শিতার জন্য দলের খ্যাতি ২০১৪ সালের নির্বাচনে জিততে সাহায্য করেছিল। তবে, চলতি বছর ভারতে যুব বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ব্যঙ্গাত্মক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনটি মিম, লাইভস্ট্রিম এবং ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, আস্তে আস্তে একজন কেন্দ্রিয় সরকারের মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।
আরও পড়ুন: গাড়িচাপায় দুই পা হারালেন অস্ট্রেলীয় এমপি হেলেন হেইনস
লেখক ও ভাষ্যকার অনুরাগ মাইনাস ভার্মা বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি তাদের বার্তা প্রচারের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক পেজ এবং এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনলাইনে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি ৩৫ বছরের কম বয়সী এবং ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে জেন জি, যারা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে, দেশের অন্যতম বৃহত্তম ভোটব্যাংক গঠন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তাদের মন জয় করার অর্থ হলো ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বাড়ানো। যেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে ব্যক্তিগত কন্টেন্ট বেশি সাড়া জাগাতে পারে। ইনস্টাগ্রামে মোদির পোস্টগুলো প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পরই সেই পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তরুণ ব্যবহারকারীরা দ্রুত অবজ্ঞার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়।
অনেকেই তার প্রথম রিলটি নিয়ে উপহাস করেছিল—যেটিতে তিনি যুব বিক্ষোভে প্রথম নীরবতা ভেঙেছিলেন। কিন্তু যা সত্যিই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, তা হলো মোদির ‘বন্ধুরা’ বলার পর দীর্ঘ নীরবতা। ভিডিওটির বিভিন্ন অংশ কাট করে নানাভাবে প্রকাশিত হয়, যা দ্রুতই অনলাইনে ট্রেন্ডিং হয়ে যায়। ভিডিওর আলো ও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নিয়েও উপহাস করা হয়েছিল।
তবে কিছু তরুণ ব্যবহারকারী এই প্রচারণার প্রশংসাও করেছেন। বিজেপি কেন তার বয়সী মানুষদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায় জানিয়ে ২২ বছর বয়সী গিন্নি মালিয়া বলেছেন, ‘এই আকস্মিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির সময়টাই আমাদের বিশেষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।’ শুধুমাত্র মোদির অ্যাকাউন্টই নয়, বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলোও তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন কন্টেন্ট ব্যবহার শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক মাধ্যমের রাজনৈতিক ব্যবহার বিষয়ে অধ্যাপনা করেন জয়োজিত পাল। তিনি বলেন, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে তাদের বার্তা প্রচার করতে এবং নিজেদের বয়ান তৈরি করতে এক্স এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে সমর্থকদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে আসছে, কিন্তু ইনস্টাগ্রামে তা কাজ করে না।
প্ল্যাটফর্মটি এমন কন্টেন্টকে প্রাধান্য দেয়, যা বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে, যেমন—বেশি সময় ধরে দেখা, রিপ্লে, শেয়ার এবং কমেন্ট। তবে বিশেষজ্ঞরা জেন জিকে নিজেদের পক্ষে আনতে বিজেপির প্রচেষ্টাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, দলটির নির্বাচনী সাফল্য ইনস্টাগ্রামে তাদের কন্টেন্টের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে এর সাংগঠনিক শক্তি এবং অনুগত সমর্থক গোষ্ঠীর ওপর।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন