০৯:৪৭ এম
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইন বাতিল করেছে। আদালতের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা শিশু-কিশোরদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করেছে।
শুক্রবার ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ এ রায় দেয়। আইনপ্রণেতারা গত জুলাইয়ে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে ইউরোপের প্রথম দেশ হওয়ার পরিকল্পনা ছিল ফ্রান্সের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কিত উদ্বেগের পর এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার পূর্বেই সাংবিধানিক পরিষদ এই আইন বাতিল করে।
আরও পড়ুন: ফরিদপুর-দৌলতদিয়া ৪০ কিলোমিটারজুড়ে যেন মৃত্যুফাঁদ
সাংবিধানিক পরিষদ জানিয়েছে, আইনটির প্রথম ধারা পর্যালোচনা করেছেন তাঁরা। এই ধারায় ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। পরিষদ মনে করে, এই বিধান শিশু-কিশোরদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতায় ব্যাপকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, যা প্রয়োজনীয় বা নির্দেশিত নয়।
অনলাইন সেবা ব্যবহারের আগে বয়স প্রমাণের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিষদ। পরিষদের মতে, বয়স যাচাইয়ের এই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি।
আদালতের রায়ের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো দ্রুত নতুন আইন তৈরির জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুকে নতুন একটি খসড়া আইন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, নতুন আইন তৈরির সময় সাংবিধানিক পরিষদের দেওয়া সব পর্যবেক্ষণ বিবেচনা করা হবে।
সরকার যত দ্রুত সম্ভব নতুন খসড়া তৈরির কাজে শুরু করবে। ম্যাখো ২০২৭ সালের শুরুর দিকে নতুন সংস্কার কার্যকর করতে চান, এমনটাই তাঁর দপ্তর জানিয়েছে। গত মাসে আইনপ্রণেতারা বিলটি পাস করার পর প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু এর কিছু অংশ পর্যালোচনার জন্য সাংবিধানিক পরিষদে পাঠান। ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদে নয়জন সদস্য রয়েছেন। কোনো আইন দেশটির সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করে এই পরিষদ।
আরও পড়ুন: গোপালগঞ্জে শিশু মুহিন হত্যার দায়ে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড
বাতিল হওয়া আইনে উল্লেখ ছিল, সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। নতুন সব অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করার নিয়ম চালু করার কথা ছিল। পরিকল্পনা ছিল যে, পরবর্তী জানুয়ারিতে একই বয়স যাচাইয়ের নিয়ম পুরোনো অ্যাকাউন্টগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হবে। প্রেসিডেন্ট ম্যাখো পূর্বে সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আইনটি নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল।
আইনের বিরোধীরা এর বাস্তবায়ন নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর বয়স কীভাবে নির্ভুলভাবে যাচাই করা হবে, সে সম্পর্কেও প্রশ্ন ছিল। বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, সেটাও স্পষ্ট ছিল না। এছাড়া তরুণরা প্রযুক্তিগতভাবে বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারবে কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল। এত অল্প সময়ে কিভাবে এ ধরনের বড় নিষেধাজ্ঞা তৈরি ও কার্যকর করা সম্ভব, সে বিষয়েও সমালোচনা ছিল। সাংবিধানিক পরিষদের রায়ে বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থার উদ্বেগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের প্রবেশ সীমিত করার লক্ষ্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়াও সম্প্রতি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে দেশটি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পরও দেশটির অনেক নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছেন। ফ্রান্সও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সাংবিধানিক পরিষদের রায়ের কারণে দেশটির পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজাতে হবে।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে ফলাফল মানবেন কি ট্রাম্প?
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রস্তাব এখন কেবল ফ্রান্স বা অস্ট্রেলিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক মাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা গেছে। মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন আইন প্রস্তাব করা হতে পারে। যুক্তরাজ্যও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের পরিকল্পনা করছে।
জুনে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন যে, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১৬ ও ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীদের জন্য রাত ১২টার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর কিছুটা সীমাবদ্ধতার একটি ঐচ্ছিক ব্যবস্থা করা হবে।
আরও পড়ুন: বিচারকের ছেলের গাড়িচাপায় স্কুটিচালকের মৃত্যু, পুলিশপ্রধান বরখাস্ত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন