১১:০৯ এম
বরগুনা জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, নদ-নদী, ম্যানগ্রোভ বন, লাল কাঁকড়ার বিচরণ, জেলেদের জীবনসংগ্রাম এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্যের জন্য পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা ধারণ করে। জেলার দক্ষিণে অবস্থিত হরিণঘাটা বনাঞ্চল, শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত, টেংরাগিরি সংরক্ষিত বন, ফাতরার বন, পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর নদীর মোহনা এবং পাথরঘাটা ও তালতলীর উপকূলীয় জনপদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাব এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে এই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বরগুনা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র এবং উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
হরিণঘাটা বনাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানে বন, নদী ও সাগরের মিলন, সবুজের সমারোহ এবং বন্য প্রাণীর বিচরণ এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, তালতলীর শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। জোয়ার-ভাটার বৈচিত্র্য, বিস্তৃত উপকূল, সূর্যাস্তের দৃশ্য এবং নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম। এর সঙ্গে স্থানীয় জেলেপল্লি, মাছের আড়ত, সামুদ্রিক খাদ্য, নৌভ্রমণ এবং উপকূলীয় লোকজ সংস্কৃতিকে যুক্ত করা সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে এসব আকর্ষণকে একটি পর্যটনপথে যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে।
বরগুনার পরিবেশবিদ সাংবাদিক আরিফুর রহমান মন্তব্য করেন, "পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে বরগুনার সবচেয়ে বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।" তিনি বলেন, হরিণঘাটা, টেংরাগিরি ও শুভসন্ধ্যার মতো স্থানগুলোকে ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে উন্নয়নের নামে বন, নদী, সৈকত ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণ নষ্ট হবে। তাঁর মতে, পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: কাঁঠালিয়ায় ৫০ চুল্লিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি
জেলা পর্যটন উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ জানান, বরগুনার পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, "পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মানসম্মত খাবার, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত আবাসন এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।" পাশাপাশি পর্যটন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দেশব্যাপী প্রচার প্রয়োজন। তাঁর মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে পর্যটনকে কেন্দ্র করে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নৌযান, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে।
জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, "পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন শুধু দর্শনীয় স্থান নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, এর সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।" তিনি উল্লেখ করেন, পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, কর্মসংস্থানে এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ সৃষ্টি এবং জনসাধারণের চলাচলের অধিকার রক্ষা করা জরুরি। তাঁর মতে, পর্যটন উন্নয়নের নামে যেন সাধারণ মানুষের জমি, জীবিকা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও প্রশাসনকে নজর দিতে হবে। স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা থাকলে পর্যটন বরগুনার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন হরিণঘাটা, শুভসন্ধ্যা, টেংরাগিরি ও অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানকে যুক্ত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা। পাশাপাশি সড়ক ও নৌযোগাযোগ উন্নয়ন, পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশপথে নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপদ নৌযান, প্রশিক্ষিত গাইড, জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য অনলাইন তথ্যসেবা, নির্ভরযোগ্য বুকিংব্যবস্থা এবং আকর্ষণীয় ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটক আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় খাবার, শুঁটকি, সামুদ্রিক মাছ, মধু, হস্তশিল্প ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন গাইড, উদ্যোক্তা, পরিবহনকর্মী ও আতিথেয়তা খাতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রাজধানীসহ বড় শহরমুখী মানুষের চাপও কিছুটা কমবে।
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে 'ম্যাংগো পিল টি'
তবে বরগুনার পর্যটন উন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় ভাঙন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। তাই পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে দুর্যোগসহনশীল নকশা, পরিবেশগত সমীক্ষা এবং বন ও সৈকতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন উদ্যোক্তা, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
বরগুনার পর্যটন সম্ভাবনা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ নয়, এটি নতুন কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হরিণঘাটা থেকে শুভসন্ধ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। আর সেই পথ ধরেই বরগুনা অর্জন করতে পারে উপকূলীয় পর্যটন ও অর্থনীতির নতুন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন