১২:২৭ পি.এম
ভারতের উত্তর প্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, গ্রেপ্তার ও উচ্ছেদের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে নতুন একটি প্রতিবেদনে। সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন প্রকাশিত ‘ইলেকশন ওয়াচ উত্তর প্রদেশ ২০২৭’-এর প্রথম সংস্করণে ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই মাসের ঘটনাবলি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুই মাসে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে সংঘটিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে—এমন হামলায় অন্তত চারজন মুসলিম নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২০ বছর বয়সী এক যুবক রয়েছেন, যাকে তার এক আত্মীয়ের বোরকা পরা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করে হত্যা করেন। অন্য এক ঘটনায় ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের উল্লেখ করে এক স্কুলশিক্ষককে গুলি করে হত্যা করেন এক ব্যক্তি।
এই চারটি হত্যাকাণ্ডের পর ২০২৬ সালে উত্তর প্রদেশে সন্দেহভাজন ধর্মীয় বিদ্বেষজনিত হত্যার ঘটনায় নিহত মুসলিমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয়জনে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ ধরনের ঘটনায় সাতজন মুসলিম নিহত হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ৫ আগস্ট শামলিতে পুলিশের গুলিতে এক মুসলিম ব্যক্তি নিহত হন।
আরও পড়ুন: ভোটার স্থানান্তরের আবেদন নিষ্পত্তির শেষ সময় ৫ নভেম্বর
গ্রেপ্তারের আগে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা, যা সাধারণত ‘হাফ এনকাউন্টার’ নামে পরিচিত, তাও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে ২৭টিতে এ ধরনের ঘটনায় অন্তত ৭০ জন মুসলিম গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫২ জনের বিরুদ্ধে গরু জবাই বা গবাদিপশু চুরির অভিযোগ ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুই মাসে অন্তত ১৫২ জন মুসলিমকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন নারী রয়েছেন। এছাড়া অনলাইনে মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করায় কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
একই সময়ে অন্তত আরো ১৬ জন মুসলিম হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরও রয়েছে, যে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে অস্বীকার করায় হামলার শিকার হয়।
প্রতিবেদনে নথিভুক্ত ১৪টি হামলার ঘটনার কোনোটিতেই হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। বরং দুটি ঘটনায় পুলিশ উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: তাইওয়ানে মাইক্রনের ১৫ হাজার কর্মীর ধর্মঘটের ঘোষণা
রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিবেদনটি। এতে ওই দুই মাসে অন্তত ২১টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি বক্তব্যের জন্য মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির এই নেতা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘বাবরের অনুসারী’ হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী বলেন, মাদ্রাসায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মানসিকতা সন্ত্রাসবাদীদের মতো হয়ে যায়। রাজ্যের এক মন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘আমাদের মুসলিম শব্দের প্রয়োজন নেই।’
এসব বক্তব্যের পর কোনো পদাধিকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে একটি আদালত ২০১৩ সালের মুজাফফরনগর সহিংসতার আগে দেওয়া বক্তব্যের ঘটনায় বিজেপি নেতা ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দেন। ওই সহিংসতায় ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগ ও মাদকবিরোধী অভিযানে মন্তব্য করলেন ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী
মুসলিমদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অন্তত নয়টি ঘটনায় মুসলিমদের ৩৪টি বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এছাড়া উত্তর প্রদেশ সরকার রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে প্রায় ৩৭ হাজার মুসলিম শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী নেতাদের গৃহবন্দি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা
আরও পড়ুন: বিএনপির সরকারের আট মাসে সাভার-আশুলিয়ার মানুষের পরিবর্তন না দেখার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের চলাফেরা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। অন্তত ১০টি জেলার ১২টি ঘটনায় বিরোধী নেতাদের গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশি হেফাজতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করা, উচ্ছেদ অভিযানের মুখে পড়া মানুষের কাছে যাওয়া কিংবা মুখ্যমন্ত্রীর সফর চলাকালে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই তিনবার আটক হন।
নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের সর্বাধিক জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে দেশটির মুসলিম জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি মানুষের বসবাস। সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার প্রাক্কালে সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগের প্রমাণভিত্তিক নথি তৈরি করাই তাদের মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে বলে সংগঠনটি মনে করে।
আরও পড়ুন: হুতি হামলার ভয়ে সৌদি আরব বিনিয়োগ সম্মেলন বাতিল করল
সূত্র: মাকতুব মিডিয়া
আরএ
সূত্র: মাকতুব মিডিয়া
আরএ
আরও পড়ুন: ইন্দোনেশিয়ার দাবানলে বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন