১০:৫৭ এম
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতকে কেউ সামরিক কৌশলের লড়াই হিসেবে দেখছেন, কেউ বা ভূ-রাজনীতির বাস্তববাদী একটি সংঘর্ষ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব পরাশক্তি ও তাদের মিত্রশক্তি দ্বারা যে ইরান অর্ধশত বছর ধরে নিষেধাজ্ঞাপীড়িত, একঘরে হয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করতে পারেনি, এমনকি আধূনিক বিশ্বে একটি যুদ্ধবিমানও কিনতে দেয়া হয়নি তেমন একটি দেশ নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়েই বিশ্বের পরাশক্তি তথা বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের মত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ও বিধ্বংসী প্রতিরোধ এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের কোন যুদ্ধের সমীকরণও সেখানে হিসেব মেলাতে পারছে না। কিন্তু বিশ্বাসী মানুষের কাছে ইতিহাস কখনো কখনো কেবল অস্ত্রের ইতিহাস নয়; বরং এটি ঈমান, ধৈর্য, পরীক্ষা এবং আল্লাহর সাহায্যের ইতিহাসও। তবে কি ইসলামের ইতিহাসের বদর, খন্দক ওহুদ, ইয়ামামার যুদ্ধের মত ইরানের পক্ষ হয়ে আল্লাহর ফেরেশতারাও যুদ্ধ করছে?
দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে ইরান এমন এক রাষ্ট্র, যাকে পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাবশালী মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা—নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে দুর্বল করে রাখার চেষ্টা করেছে। অথচ আজ সেই রাষ্ট্রটিই বিশ্বের সুপার পাওয়ার এবং দীর্ঘ কয়েক দশকের অপরাজেয় বিশ্ব মোড়ল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ৫ মাসে ইতিহাসের সেরা ও মারাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ।
একে কেউ কেউ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা বা সামরিক পরিকল্পনার ফল বলতেই পারে। সে ব্যাখ্যা অমূলক নয়। কিন্তু একজন ঈমানদার মানুষের কাছে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনাই কি কেবল দৃশ্যমান শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? নাকি অদৃশ্য জগতেরও কোনো বাস্তবতা রয়েছে, যার কথা পবিত্র কুরআন ও ইসলামের ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়?
দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী শক্তির ক্রমাগত গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী যুদ্ধে পবিত্র ভূমি মুসলিম ও ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের প্রথম কিবলা আল-আকসার মাটিতে বিশ্বাসী ও খাঁটি মুসলিমদের রক্ত ঝরছে। নারী, শিশু ও নিরীহ মানুষের মৃত্যু বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিশ্বাসঘাতক ও মার্কিন ইহুদীদের দালাল অনেক রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও আজ প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, কাতার, কুয়েত ও ওমান সহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা ও বিলাসিতার লোভে তাদের নীতি, আদর্শ যে বিসর্জন দিয়েছে এমন অবস্থান নিয়েও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব দেশ প্রকাশ্যে বা নীরবে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনে গণ হত্যাকারী ইসরাইলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা তো দূরের কথা, মৌখিক ভাবেও তারা এই বর্বরতা ও মুসলিম নিধনের কর্মকান্ডকে ঘৃনা প্রকাশ করছে না। ফলে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকদের বিশ্বাস, মুসলিম উম্মাহর এই বিভক্তিই ফিলিস্তিনের ট্র্যাজেডিকে দীর্ঘায়িত করেছে যেখানে মহান রাব্বুল আলামিন নিজে হয়তো বাধ্য হয়ে বর্বর ইহুদিবাদীদের দমনে মাঠে তার ফেরেশতাদের নামিয়ে দিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটেই একজন বিশ্বাসীর মনে প্রশ্ন জাগে—মানুষ যখন তার সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তখন কি আল্লাহর সাহায্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয় না ? ইসলামের ইতিহাস তো বারবার সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বদর, উহুদ, খন্দক, তাবুক, সিফফিন, মুতা' ইয়ারমুকের মতো অনেক অসম যুদ্ধে দৃশ্যমান শক্তির চেয়েও বিশ্বাসীদের অল্প শক্তিও বড় হয়ে উঠেছিল । আল্লাহর রাসুল ও তার সাহাবীদের ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি অবিচল বিশ্বাস তাদেরকে অসম শক্তির যুদ্ধেও জয়লাভ করিয়েছিল।
তাই আজকের ঘটনাপ্রবাহকেও অনেক ঈমানদার মানুষ কেবল সামরিক শক্তির হিসাব দিয়ে নয়, বরং আল্লাহর অদৃশ্য ফয়সালার সম্ভাবনার আলোয় দেখার চেষ্টা করছেন। এটি নিছক একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও কাল্পনিক বিষয় নয় বরং তা বাস্তবেই ইসলামের ইতিহাসে এমন অসম যুদ্ধের ঘটনাগুলো ঘটেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও অসংখ্য নবী রাসুলের পদচারণায় মুখরিত হওয়া পবিত্র ও পূণ্যভূমি ফিলিস্তিনে যুগের পর যুগ ইহুদী খ্রীষ্টানদের গণহত্যায় নিরীহ মুসলিমদের রক্ত ঝরছে এবং এখনো তা বর্তমান। গত বছর দুয়েক এর মধ্যেই নির্বিচার গণহত্যায় প্রায় ৭৫ হাজার বিভিন্ন বয়সী যুবক, বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও নিরীহ মানুষের মৃত্যু বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। একই সঙ্গে বহু মুসলিম দেশের নিষ্ক্রিয়তা বা সীমিত প্রতিক্রিয়া নিয়েও মুসলিম বিশ্বে গভীর হতাশা বেড়েই চলেছে। দীর্ঘ ঈমানি পরীক্ষার পর অনেকের বিশ্বাস, মুসলিম উম্মাহর এই দীর্ঘ পরীক্ষা একদিন না একদিন আল্লাহর বিশেষ ফয়সালার দিকে গড়াবে এবং হয়তো এখন সেটা ইরানের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে।
ইসলামের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—বদর, উহুদ, খন্দকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুসলমানরা সংখ্যায় ও অস্ত্রে পিছিয়ে ছিল। তবুও কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহ তাঁর নির্দেশে ফেরেশতাদের মাধ্যমে মুমিনদের সাহায্য করেছেন।
সেই ঘটনাগুলো মুসলমানদের বিশ্বাসের-ই অংশ। সেখান থেকেই প্রশ্ন—আজ যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্র এমন এক অসম লড়াইয়ে টিকে থাকে, যা কেবল প্রচলিত সামরিক হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে মনে হয়, পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের কল্পনা ও চিন্তাতেও যা ধরা পড়ছে না, তখন একজন বিশ্বাসী মানুষ কি এ সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারেন না যে, ইরানের মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহ তাঁর অদৃশ্য সাহায্য দান করছেন? খোদা ভীরু বিশ্বাসীদের কাছে এই প্রশ্ন অমূলক নয়।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটা নিশ্চিত নয় যে, আল্লাহর ফেরেশতারা ইরানের পক্ষে যুদ্ধ করছেন। তবে ইসলামের ইতিহাসের সেই অসম যুদ্ধগুলোর কথা স্মরণ করলে এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়। কারণ অদৃশ্য জগতের চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই। তবে একজন ঈমানদার হিসেবে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন, তখন তিনি এমনভাবে সাহায্য করেন যা মানুষের হিসাব-নিকাশকে অতিক্রম করে যায়। ইসলামের ইতিহাসের সেই অসম যুদ্ধগুলোতেও এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর আল্লাহ যেখানে তার বান্দার পক্ষে দাঁড়িয়ে যান তখন তার সৃষ্টি জগতের সমস্ত শক্তি দিয়েও তার বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব নয়।
বাস্তববাদীদের মতে সাম্প্রতিক বিশ্বশক্তিগুলোর ইতিহাসও আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একসময় রোমান সাম্রাজ্য ছিল অপরাজেয় শক্তি, এরও অনেক পরে সাম্প্রতিক বিশ্বে চোখে দেখা ক্ষমতাধর স্পেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মতো প্রতিটি পরাশক্তিই নিজেদের ক্ষমতাকে স্থায়ী মনে করেছিল যা আজকে রোমান সাম্রাজ্যের মতো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করেছে, পৃথিবীতে কোনো আধিপত্যই চিরস্থায়ী নয়। স্থায়ী কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর ফয়সালা।
আজ যদি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরাইল মনে করে যে, সামরিক শক্তির জোরে একটি জাতিকে চিরতরে ধ্বংস করা যাবে, কিংবা তাদের মিত্র শক্তিগুলো মোনাফেক, মুসলিম নামধারী রাষ্ট্রগুলো যদি মনে করে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করবে এবং ইরানকে পরাজিত করবে তাহলে তারাও হয়তো সেই মারাত্মক ধ্বংসলীলায় পরিণত হবে যা তাদের কল্পনারও বাইরে। ইতিহাস তাদের জন্যও একই শিক্ষা গ্রহণ করার ইঙ্গিত প্রদান করে। শক্তি যত বড়ই হোক, তা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা আল্লাহর ইচ্ছার কিংবা ক্ষমতার ঊর্ধ্বে নয়।
ইহুদীবাদী ইসরাইল ও বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দূর্বল মনে করা ইরানের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে দেখে মনে হয় এটি কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয় বরং এটি সম্পূর্ণ একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। আধ্যাত্মবাদীদের সূত্র মতে, এটা একটা শক্তিশালী বিশ্বাস যে, সারা বিশ্বের মুসলিমদের উপর ইহুদি খ্রিস্টানদের দীর্ঘদিনের গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ, নিপীড়ন, রক্তপাত ও ঈমানের পরীক্ষার পর আল্লাহ চাইলে তাঁর অদৃশ্য সাহায্যের দরজা খুলে দিতে পারেন। সেই সাহায্য কীভাবে আসে, তা মানুষের পক্ষে সবসময় উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, যা হয়তো ইরানের পক্ষে এখন ঘটছে।
তাই আজ যখন ইরানের প্রতিরোধ অনেকের কাছে বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছে, তখন একজন বিশ্বাসী হিসেবে অনেক বিশ্বাসীদের মনে হয়—এটিকে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা সামরিক প্রযুক্তির শক্তি হিসেবে নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ও সাহায্যের সম্ভাবনার আলোকেও দেখা যেতে পারে। যদি সত্যিই আল্লাহ তাঁর সত্যিকারের মুমিন বান্দাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি-ই সেই সিদ্ধান্তের সামনে স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। যারাই তার বিপক্ষে যুদ্ধে নামবে তারা সকলেই পরাজিত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এমনকি মক্কা মদিনা ধারনকারী সৌদি আরবও। কারণ তারাও ইহুদি নাছারাদের প্রথম শ্রেণীর তাবেদার। আল্লাহ চাইলে শুধু মাত্র মক্কা মদিনাকে রক্ষা করে তাদেরকেও ধ্বংস করতে পারেন।
এটি ইসলামের ইতিহাসের সকল অসম যুদ্ধে মুসলিমদের জয় লাভের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি যুদ্ধ বলে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও অনুমান করা মোটেও অমূলক নয়, কারণ অদৃশ্য জগতের জ্ঞান একমাত্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক ও সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে-যা অবিশ্বাসীদের উপলব্ধি যোগ্য নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন