০৫:২৬ পি.এম
ভেনেজুয়েলায় সম্প্রতি সংঘটিত ভূমিকম্পে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৩ হাজার ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
এছাড়াও, ধসে পড়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী নবজাতক সন্তানের সঙ্গে অলৌকিকভাবে উদ্ধার হয়েছেন এক মা। তিনি কিভাবে এই ছোট শিশুকে জীবনযুদ্ধে স্থিতিশীল থাকার শক্তি দিয়েছে, সেটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন।
দায়ানা পাতিনো নামের ঐ নারী বলেন, তার ছেলে হুয়ান ডেভিড তাকে অন্ধকার গর্তে বেঁচে থাকার এবং সচেতন থাকার জন্য অশেষ শক্তি যুগিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হুয়ান বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমি আমার বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেছি। তখনও সে শ্বাস নিচ্ছিল, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার ওর ছোট নাকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতাম।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের মানববন্ধন: সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার প্রতিবাদ
মা ও শিশুর এই অলৌকিক উদ্ধারের ভিডিওটি এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান তৈরি করেছে। গত বুধবারের পর পর ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পের ফলে অন্তত দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানির পর, শিশুটি এখন নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের “সবচেয়ে নির্মম প্রাকৃতিক বিপর্যয়” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে দেশটিতে আরও ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উদ্ধার তৎপরতা চলছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অন্য কোনো জীবিত মানুষ বের করার আশা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।
রোববার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্লিনিকের চিকিৎসাধীন দায়ানা বিবিসির সঙ্গে মাটির নিচে কাটানো সেই ভীতিকর সময়ের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। সেখানে তিনি তাঁর সন্তানের সঙ্গে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিলেন।
আরও পড়ুন: অবকাশকালীন ছুটির পর সুপ্রিম কোর্টের কার্যদিবস ২৫ অক্টোবর
দেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলের লা গুয়াইরায় নিজেদের আট তলার অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে থালাবাসন ধোয়ার সময় ভূমিকম্প আঘাত হানে। তিনি এটিকে “সামান্য মৃদু কম্পন” ভেবে অসাবধানতায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে বেরিয়ে যান।
তিনি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, হঠাৎ তার মনে হলো তিনি বাতাসে ভাসছেন। এরপরই তিনি উপলব্ধি করলেন যে তিনি পানি আর কাদামাটির নিচে তলিয়ে যাচ্ছেন এবং গভীর অন্ধকারের মধ্যে আছড়ে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে বাতাসে উড়ার পরেও তিনি তার সন্তানকে হারাননি, সেটি আজও তার কাছে মিরাকল। ধসে পড়া আসবাবপত্রের নিচে তিনি পুরোপুরি চাপা পড়ে গিয়েছিলেন।
দায়ানা বলেন, গর্তে পড়ার সাথে সাথে তিনি চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু বুঝতে পারেন, তাঁর দুঃখের আহ্বানের উত্তর দেওয়ার মতো সেখানে কেউ নেই।
তিনি ঘোষণা করেন, আমি বুঝতে পারলাম অযথা চিৎকার করে আমি আমার শক্তি নষ্ট করবো না—যখন প্রয়োজন হবে, তখন আমি চিৎকার করবো, যখন আমি কাছে মানুষের কণ্ঠস্বর বা পায়ের আওয়াজ শুনতে পাব।
আরও পড়ুন: ইসহাক সরকার ও তারেক আদেল এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হচ্ছেন
“আমি জানি না কিভাবে আমি এতটা শান্ত থাকতে পেরেছি। কারণ আমার বাম পা তখন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছিল। আমি একটুও নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। এবং আমার কপালটি একটি শক্ত পাথরের সঙ্গে চাপা ছিল।”
দায়ানা বিশ্বাস করেন, পিঠের নিচে যখন তিনি একটি বাইবেল অনুভব করেন, তখন যেন নতুন লক্ষ্যে বেঁচে থাকার উপলব্ধি পেলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সেখান থেকেই মূলত তার বেঁচে থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল।
ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারের মধ্যেও তিনি উপরে দিকে একটি চাঁদের মতো ছোট আলোর বিন্দু দেখতে পান। দায়ানা জানাচ্ছেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তার ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম শুনে তিনি অনুভব করেন, সহায়তার হাত এসে পৌঁছেছে।
“আমি নিজেকে বললাম, এটাই আমার শেষ সুযোগ। আমি আমার ফুসফুসের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। আমি সর্বদা চিৎকার করে বললাম ‘আমি এখানে’। এবং ও উপর থেকে বলেছিল, আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, এবং কথা দিচ্ছি যে আমি তোমাকে বের না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়বো না।”
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সবুজায়ন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন
তার ভাই সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে সংবেদনশীল এবং জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশুকে নিরাপদ অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করা হয়।
ভূমিকম্পের ফলে দায়ানার দুই পায়ে বড় আঘাত হয়েছিল। কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায়, শিশু হুয়ান বিশেষ কোনো আঘাত পায়নি।
দায়ানার স্বামী গার্সন ভূমিকম্প আঘাত হানার মুহূর্তে বাড়ি ফিরে গাড়ি পার্ক করার কাজে ছিলেন। তিনি সীমানা প্রাচীর টপকে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সক্ষম হন।
কিন্তু সামনে তাঁদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি ধূলিসাৎ হতে দেখে তিনি সবচেয়ে খারাপ কিছুর আশঙ্কা করেছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানের ফিরে আসার সেই মুহূর্তকে “অলৌকিক ঘটনা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন গার্সন।
আরও পড়ুন: খুলনায় সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী দুই সপ্তাহে দুবার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্ধার কল্পনার ভিডিও দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে আবেগময়ভাবে কাঁধের মধ্যে ছেলে হরির ওপর হাত রেখে আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গার্সন; যেন সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।
স্মৃতিচারণ করতে গার্সন বিবিসিকে জানান, এটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ধরে নিয়েছিলাম তারা আর নেই। কিন্তু যখন আমি আমার ছেলেকে অক্ষত দেখলাম, তখন মনে হলো আমি নিজেই নতুন জীবন পেয়েছি। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল আমার মৃত শরীর পুনর্জীবিত হয়েছে।
ভূমিকম্পের ফলে গার্সন ও দায়ানার সাজানো সংসার এবং সবকিছু ধূলির সাথে মেশে গেছে। তাঁদের প্রিয় পোষা কুকুরটি এখনও নিখোঁজ হওয়ায় তারা গভীরভাবে শোকাহত। তবে এই দম্পতি জানিয়েছেন যে, তারা এখন সম্পূর্ণ নতুন করে জীবন শুরু করবেন।
“আমরা আমাদের সবকিছু হারিয়েছি, তবে আমরা বেঁচে আছি, এটি সবচেয়ে বড় কথা, আমরা আমাদের হারানো সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে তুলবো,” দৃঢ়তার সাথে বলেন গার্সন।
আরও পড়ুন: গুয়াতেমালায় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে দুর্নীতিবিরোধী সাবেক কৌঁসুলিকে হত্যা
সূত্র: বিবিসি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন