০৮:২৯ পি.এম
দেশে বর্তমানে ৪৪০টিরও বেশি স্থানে সীমিত পরিসরে ৫জি সেবা চালু হয়েছে। এই কার্যক্রমের আরও সম্প্রসারণের জন্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার কাজও চলছে। তবে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদন খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রস্তুতির ওপর পূর্ণাঙ্গ ৫জি সেবা চালুর বিষয়টি নির্ভর করবে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫জি ইকোসিস্টেম ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত খাতগুলো চিহ্নিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্পেকট্রাম পরিকল্পনা, ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধির কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিক পর্যায়ে ৫জি সেবা চালুর প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তবে ইতোমধ্যে আবাসিক ও শিল্প এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সীমিত আকারে ৫জি সেবা চালু করা হয়েছে। রাজধানীর আবাসিক এলাকা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও রেস্তোরাঁসহ প্রায় ৪০টি স্থান বর্তমানে ৫জি নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে।
আরও পড়ুন: অ্যানথ্রোপিকের সতর্কবার্তা: এআই মানবজাতির জন্য ‘বিপর্যয়কর ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে
মন্ত্রী বলেন, ঢাকার বাইরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা ও সিলেটের ৪শ’টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানও সীমিত পরিসরের ৫জি সেবা চালু হয়েছে। সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তরে তিনি এ কথা জানান। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চললেও ৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে যেসব খাত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, সেসব খাতের প্রস্তুতিও জরুরি।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোন কোন শিল্পখাত ৫জি প্রযুক্তি ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে উপযোগী, তা নির্ধারণেও কাজ চলছে।
দেশের প্রস্তুতি কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ট্রান্সমিশন অবকাঠামো শক্তিশালী করা। ‘৫জি সক্ষমতার জন্য বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নিরবচ্ছিন্ন ট্রান্সমিশন সেবা নিশ্চিত করতে দেশের ৬৪ জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলাকে ব্যাকআপ অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের (ওএফসি) মাধ্যমে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে জেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে উপজেলায় উচ্চগতির ব্যান্ডউইথ সরবরাহের জন্য এএসওএন (অটোমেটিক্যালি সুইচড অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক)-সক্ষম ডিডব্লিউডিএম সরঞ্জাম স্থাপন করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর এলাকাতেও ব্যাকআপ সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সরকারের পাঁচ বছরে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য: মাহবুব আনাম
মন্ত্রী বলেন, অপটিক্যাল ফাইবার ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রায় ৭৯ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ৫জি সম্প্রসারণের জন্য আরও শক্তিশালী ট্রান্সমিশন অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
প্রযুক্তিটির বাস্তবায়নে সরকার বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। মোবাইল অপারেটরদের প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ৫জি সেবার জন্য ২.৩ গিগাহার্টজ ও ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড থেকে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ৫জি সম্প্রসারণ এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি) একটি স্পেকট্রাম রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। সে অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ৩.৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে নতুন স্পেকট্রাম উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা প্রদান ও মান উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার গ্রাহকবান্ধব ইন্টারনেট শুল্ক চালু করেছে এবং ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইন্টারনেটের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশকে এআই কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার: তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী
সেবার মান নিশ্চিত করতে কোয়ালিটি অব সার্ভিস ও এক্সপেরিয়েন্সের মানদণ্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে সেবামান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতের ৫জি সেবার প্রস্তুতির লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটক দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৪২০টি স্থানে উচ্চগতির ৪জি সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে।
মন্ত্রী জানান, টেলিটক ইতোমধ্যে ভয়েস ওভার ওয়াইফাই (ভিওওয়াইফাই), ভয়েস ওভার এলটিই (ভিওএলটিই) চালু করেছে এবং সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীর জন্য চারটি স্থানে পাইলট ৫জি সেবা চালু করেছে। চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডেটার গতি বাড়াতে ও নেটওয়ার্কের আওতা সম্প্রসারণে বৈদেশিক সহায়তায় আরও দুটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার নতুন ৪জি সাইট এবং ১ হাজার ৬০০টি ৫জি সক্ষম সাইট স্থাপন করা হবে। এতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা ও কভারেজ আরও উন্নত হবে।
আরও পড়ুন: টেলিটক ৭০০ মেগাহার্টজে ফোর-জি সম্প্রসারণের জন্য জেডটিই’কে কার্যাদেশ দিল
স্থলভিত্তিক অবকাঠামোর পাশাপাশি ৫জি সেবার ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) বর্তমানে সি-মি-উই ৪ এবং সি-মি-উই ৫ সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করছে।
দুটি ব্যবস্থার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ২২০ জিবিপিএস। এর মধ্যে ৯৯.৯৯৯ শতাংশ নেটওয়ার্ক নির্ভরযোগ্যতা বজায় রেখে দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ১০০ জিবিপিএস সরবরাহ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে সি-মি-উই ৬ কনসোর্টিয়ামের আওতায় দেশের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পটি শেষ হলে আরও ৩০ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ যুক্ত হবে। এতে বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা প্রায় ৩৮ হাজার জিবিপিএসে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: পাঁচ বছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণ ১৬.৫৭% কমেছে
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে দেশে ব্যাপক পরিসরে ৫জি সেবা চালুর ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে সরকারের চলমান উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশ সীমিত পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে ব্যাপকভিত্তিক ৫জি গ্রহণের ভিত্তি নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ৫জি সেবায় উত্তরণ ক্যাবল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও স্পেকট্রাম প্রাপ্যতার ওপর নয়, বরং মূল শিল্পখাতগুলো এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারে কতটা প্রস্তুত তার ওপরও নির্ভর করবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন