শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৯:১৫ এম
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মে ২০২৬-এর নীতিপত্র অনুসারে, ২০২৫ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের মধ্যে মুশারাকা ও মুদারাবার সম্মিলিত অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বাই-মুরাবাহা ও বাই-মুয়াজ্জালের অংশ ছিল ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বনির্ধারিত মুনাফা ও ঋণসদৃশ আর্থিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা ইসলামি অর্থায়নের ঝুঁকি ভাগাভাগির লক্ষ্যকে কতটা আড়াল করছে, সে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর আগে আরো মৌলিক একটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগের এই স্বল্প উপস্থিতি কি শুধুমাত্র ইসলামি অর্থায়নের ব্যর্থতা, নাকি ব্যাংক কী করতে পারে এবং কী করা উচিত, সে বিষয়ে আমাদের ধারণার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে?
ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন পরস্পর সম্পর্কিত, কিন্তু অভিন্ন নয়। ইসলামি ব্যাংকিং ইসলামি অর্থায়নের একটি অংশ; আর ইসলামি অর্থায়ন বৃহত্তর ইসলামি অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি অর্থনীতির পরিসরে ব্যাংকের পাশাপাশি বাজার, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের লক্ষ্যও রয়েছে। ব্যাংককে দিয়েই এ পুরো ব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা বিচার করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিলের প্রধান উৎস হচ্ছে আমানত। গ্রাহক প্রত্যাশা করেন, তার অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তা ফেরত পাওয়া যাবে। ব্যাংককে তাই তারল্য, মূলধন পর্যাপ্ততা, আমানত প্রত্যাহারের ঝুঁকি এবং সম্পদ ও দায়ের মেয়াদের অসামঞ্জস্য সামলাতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক এমন অর্থায়ন পছন্দ করে, যা থেকে তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য নগদ প্রবাহ আসে।
মুরাবাহা এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাংক একটি পণ্য কিনে ক্রয়মূল্যের সঙ্গে ঘোষিত মুনাফা যোগ করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। এতে গ্রাহকের পরিশোধযোগ্য দায় নির্ধারিত হয়। ইজারা এবং সম্পদভিত্তিক আরো কিছু অর্থায়নব্যবস্থাও ব্যাংকের জন্য অনুরূপ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পূর্বনির্ধারিত বিক্রয়মূল্য মানেই আদায়ের নিশ্চয়তা নয়; গ্রাহকের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
মুশারাকা ও মুদারাবার অর্থনৈতিক চরিত্র ভিন্ন। এখানে অর্থদাতাকে প্রকল্পের ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। মুশারাকায় মুনাফা চুক্তি অনুযায়ী ভাগ হয় এবং লোকসান বহন করা হয় মূলধনের অনুপাতে। মুদারাবায় স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লোকসান মূলধনদাতা বহন করেন; উদ্যোক্তা হারান তার শ্রম ও সময়। তবে উদ্যোক্তার অবহেলা, অসদাচরণ বা চুক্তিভঙ্গের দায় পৃথকভাবে বিবেচ্য।
এ ধরনের অর্থায়নে মুনাফা অনিশ্চিত হতে পারে। কোনো উদ্যোগ থেকে ফল পেতে দীর্ঘ সময়ও লাগতে পারে। অর্থদাতাকে ব্যবসার প্রকৃতি বুঝতে হয়, পরিচালনার তথ্য পেতে হয় এবং আয় বণ্টন ছাড়াই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সক্ষমতা রাখতে হয়। এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের চেয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রাইভেট ইকুইটি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষকরাও এ অসামঞ্জস্যের কয়েকটি দিক চিহ্নিত করেছেন। অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়নে প্রতিকূল নির্বাচন, নৈতিক ঝুঁকি, তথ্যের অসমতা ও ব্যয়বহুল তদারকি বড় বাধা। অর্থাৎ ব্যাংক ও উদ্যোক্তার কাছে সমান তথ্য থাকে না; ভালো ও দুর্বল প্রকল্প আলাদা করা কঠিন হয়; অর্থ পাওয়ার পর উদ্যোক্তার আচরণ বদলে যেতে পারে; প্রকৃত আয় ও ব্যয় যাচাই করাও ব্যয়সাপেক্ষ।
এ অবস্থায় ইসলামি ব্যাংককে আরো মুশারাকা ও মুদারাবা করতে বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সমস্যা শুধু নামে নয়, মডেলেও। নির্ধারিত পাওনা আদায় এবং স্বল্পমেয়াদি দায়ের বিপরীতে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ধারণের কাঠামোয় প্রকৃত অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন সহজে বসানো যায় না।
বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোয়ও একই দুর্বলতা রয়েছে। শিল্প ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে আমরা ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অথচ এসব খাতে ইকুইটি, বন্ড, সুকুক ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি উপকরণের বড় ভূমিকা থাকা উচিত। পুঁজিবাজারকে প্রবৃদ্ধির অব্যবহৃত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। ইসলামি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর পুঁজিবাজারের ঘাটতি পূরণের ভার মূলত ব্যাংকের ওপর চাপানো হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, শিল্প বা নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগের মেয়াদ সাধারণত ব্যাংকের আমানতের মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘ। গবেষণাটিতেও স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা ও এইচপিএসএম অর্থায়নে তারল্য এবং সম্পদ-দায়ের মেয়াদের অসামঞ্জস্যের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমানতনির্ভর প্রতিষ্ঠানকে অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি মুশারাকায় ঠেলে দিলে এ ঝুঁকি দূর হওয়ার বদলে বাড়তে পারে।
এ বিতর্ক শুধু ইসলামি অর্থনীতির নয়। মূলধারার অর্থনীতিতেও বহু দশক ধরে ব্যাংকের কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা চলছে। হেনরি সাইমনস, আরভিং ফিশারসহ অর্থনীতিবিদদের সমর্থিত শিকাগো পরিকল্পনায় লেনদেনযোগ্য আমানতের বিপরীতে শতভাগ রিজার্ভ রাখার প্রস্তাব ছিল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের মুদ্রা ও লেনদেনসেবা থেকে ঋণ সৃষ্টির কার্যক্রমকে পৃথক করা। পরবর্তী সময়ে মিল্টন ফ্রিডম্যানও শতভাগ রিজার্ভ ব্যবস্থার কিছু রূপ সমর্থন করেন। ভগ্নাংশ রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ে সহজে প্রত্যাহারযোগ্য আমানতের সঙ্গে ঋণ সৃষ্টির সম্পর্ক যে অস্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে, এ চিন্তাধারা সেটিই সামনে আনে।
হাইম্যান মিনস্কি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আর্থিক অস্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করেছেন। দীর্ঘ সমৃদ্ধির সময়ে ঋণ ও পুনঃঅর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে আর্থিক ব্যবস্থা এমন অবস্থায় চলে যেতে পারে, যেখানে আয় দিয়েই আসল ও সুদ পরিশোধ সম্ভব। এরপর এমন অবস্থা আসে, যখন শুধু সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হয়, কিন্তু আসল ফেরত দিতে নতুন ঋণের প্রয়োজন হয়। শেষ পর্যন্ত সুদ পরিশোধেও নতুন ঋণ নিতে হয়। মিনস্কি এগুলোকে যথাক্রমে হেজ, স্পেকুলেটিভ ও পনজি অর্থায়ন বলেছেন। দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতাও এভাবে অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে ভঙ্গুরতা তৈরি করতে পারে।
ইসলামি অর্থায়নের জন্য শিক্ষা হলো, প্রত্যাহারযোগ্য আমানতনির্ভর প্রতিষ্ঠানকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অংশীদারত্বে রূপান্তর করলে তারল্য, সুশাসন ও মেয়াদগত ঝুঁকির প্রশ্ন নতুন করে আসে। শুধু চুক্তির নাম বদলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
তার অর্থ এই নয় যে মুরাবাহাই ইসলামি অর্থায়নের সর্বোত্তম সমাধান, কিংবা ব্যাংক থেকে মুশারাকা ও মুদারাবা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। উপযুক্ত মেয়াদের তহবিল, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে ব্যাংকের অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মুরাবাহার আধিপত্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামি নীতি থেকে বিচ্যুতির চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যথার্থ নয়। এর জনপ্রিয়তা বিদ্যমান ব্যাংকিং কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ফলও হতে পারে।
তাহলে নীতিগত চ্যালেঞ্জ শুধু ব্যাংকের পণ্যতালিকায় মুশারাকা বা মুদারাবার অনুপাত বাড়ানো নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থাকে দুটি পরস্পর পরিপূরক স্তম্ভের ওপর দাঁড় করাতে হবে।
প্রথম স্তম্ভ হবে বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংকিং। এর কাজ হবে লেনদেন ও পরিশোধসেবা, আমানত, বাণিজ্য অর্থায়ন, মুরাবাহা, ইজারা, সালাম এবং পরিবার ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের উপযোগী অর্থায়ন। এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর শরিয়াহ তদারকি, বিচক্ষণ ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও আমানতকারীর সুরক্ষার আওতায় পরিচালিত হতে হবে।
দ্বিতীয় স্তম্ভ হবে বিস্তৃত ইসলামি ঝুঁকি মূলধন ও পুঁজিবাজার। এতে থাকবে মুশারাকাভিত্তিক বিনিয়োগ কোম্পানি, মুদারাবা তহবিল, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি তহবিল, পেনশন এবং তাকাফুলের বিনিয়োগ তহবিল, করপোরেট ও অবকাঠামো সুকুক এবং বিশেষায়িত উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারে এবং ব্যবসার ফল অনুযায়ী ঝুঁকি বহন করতে পারে—এমন মূলধন জোগানোর উপযোগী প্রতিষ্ঠান এখানেই গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের সুকুক বাজার গড়ে তোলার নকশায়ও এ প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুধু সরকারি সুকুক দিয়ে কার্যকর ইসলামি পুঁজিবাজার তৈরি হয় না। প্রয়োজন করপোরেট ইস্যুকারী, শরিয়াহসম্মত লেনদেনযোগ্য উপকরণ এবং সচল ও পর্যাপ্ত তারল্যসম্পন্ন দ্বিতীয় বাজার। সামাজিক অর্থায়নেও বিশেষায়ন দরকার। বিশেষায়িত করজে হাসানা ব্যাংক গড়ে তোলার পেছনেও একই যুক্তি রয়েছে : প্রতিটি সামাজিক আর্থিক লক্ষ্য একটি সর্বজনীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর চাপানোর প্রয়োজন নেই।
অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে গবেষকদের প্রস্তাবিত লক্ষ্য ও প্রণোদনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে শুধু অনুপাত পূরণের চাপ দিলে এমন চুক্তিও তৈরি হতে পারে, যার নাম মুশারাকা হলেও প্রকৃত ফল প্রায় পূর্বনির্ধারিত ঋণসদৃশ মুনাফা। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শতাংশ বদলানো সহজ; অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলানো অনেক কঠিন।
বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই শুধু ইসলামি ব্যাংক এত কম মুশারাকা করছে কেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, মুশারাকা ও মুদারাবা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠান আমরা গড়ে তুলিনি কেন?
ইসলামি ব্যাংককে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ব্যাংককে আরো দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে এমন ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থা দরকার, যা দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকি ভাগাভাগিভিত্তিক মূলধন জোগাতে পারে। ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়নের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। বাংলাদেশের পরবর্তী সংস্কারের সূচনা হওয়া উচিত এ উপলব্ধি থেকে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার। ইসলামি ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে ২০১৬ সালের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কারপ্রাপ্ত। এএওআইএফআইয়ের এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ধর্ম ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্য মানবসমাজের একটি পরিচিত রূপ হলেও, প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব আদর্শ, নীতি এবং স্বাতন্ত্র্যের একটি সুস্পষ্ট সীমা বিদ্যমান। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একত্রে বসবাস করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সচেষ্ট। তবে, সম্প্রীতির অজুহাতে নিজের ধর্মীয় চেতনা ও আকিদার মৌলিক সীমানা অতিক্রম করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন, কৌতূহল বা আনন্দ উপভোগের অংশ হিসেবে অমুসলিমদের পূজামণ্ডপে মুসলমানদের গমন এবং মূর্তিপূজা প্রত্যক্ষ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এমনকি সেখানে তাদের সঙ্গে নাচানাচি ও রঙ মাখামাখির ঘটনা ঘটছে। বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ সামাজিক মেলবন্ধন মনে হলেও, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা তার অনুসারীদের ঈমান ও তাওহিদের ওপর দৃঢ় থাকতে শেখায় এবং যেকোনো ধরনের শিরক বা অনৈসলামিক বিশ্বাসের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।
ইসলাম ধর্মের ভিত্তিটি মহান আল্লাহর একত্ব এবং তার ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই তাওহিদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে রয়েছে ‘শিরক’, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমাহীন অপরাধ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২২ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপ বা উপাসনালয়গুলো মূলত এমন স্থান, যেখানে মূর্তিকে মহান আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে উপাসনা করা হয়। একজন মুসলিম যখন কৌতূহলবশত সেখানে গিয়ে হাজির হয়, তখন তার এই শারীরিক উপস্থিতি পরোক্ষভাবে সেই শিরকের কাজের প্রতি এক ধরনের মৌন সমর্থন বা স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে বিশ্ববাসীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।’ যেখানে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর বিধানের চরম অবাধ্যতা চলছে, সেখানে আনন্দ বা কৌতূহলের অংশীদার হওয়া প্রকারান্তরে সেই গুনাহের আয়োজনে নিজের উপস্থিতি দিয়ে সমর্থন জানানোরই শামিল, যা ঈমানি চেতনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ইসলামি সংস্কৃতি ও জীবনবোধের অন্যতম সৌন্দর্য হলো তার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মানবিক আচরণ ও সামাজিক সদাচরণের নির্দেশ দিলেও, নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে গুলিয়ে ফেলতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। সুরা আল-আনআমের ৬৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ১৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনকে অস্বীকার বা উপহাস করা হয়, সেখানে যেন মুমিনরা উপবেশন না করে। এর সপক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু দাউদ শরিফের এক বিখ্যাত হাদিসে সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদেরই একজন হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইকতিদাউ সিরাতিল মুস্তাকিম’-এ উল্লেখ করেছেন, অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মুসলমানের ঈমানি স্বকীয়তা ধ্বংসের দরজা খুলে দেয়। ফলে সামাজিক উদারতা দেখানোর অজুহাতে ধর্মীয় উৎসবের চত্বরে শামিল হওয়া ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং নিজের আকিদাকে এক মহাঝুঁকিতে ফেলার শামিল।
অবশ্য ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং সমাজ-রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। তাই সাধারণ বিনোদন বা উৎসব উদ্যাপনের বাইরে কিছু ব্যতিক্রমী ও বিশেষ পরিস্থিতিকে ফকিহরা এই নিষেধাজ্ঞা থেকে আলাদা করেছেন। যদি কোনো মুসলিম সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হন এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কিংবা সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক অফিসিয়াল দায়িত্ব অর্পিত হয়, তবে তিনি পূজামণ্ডপে যেতে পারবেন। ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহর দ্বিতীয় খণ্ডের ১১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় এই প্রশাসনিক বা সুরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই যাওয়ার উদ্দেশ্য কেবলই অর্পিত পেশাগত দায়িত্ব পালন, কোনোভাবেই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া বা ধর্মীয় আচারকে উপভোগ করা নয়। এমনকি ঐতিহাসিক নজির থেকে জানা যায়, খলিফা ওমর (রা.) অমুসলিমদের গির্জা বা উপাসনালয় (কানিসা) সুরক্ষার সুযোগ দিলেও মুসলিমদের সেখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সম্পৃক্ত হওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
অন্য ধর্মের উপাসনাকে সমর্থন না করার অর্থ এই নয় যে, তাদের অনুসারীদের অসম্মান করতে হবে; বরং ইসলাম ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিক মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, কিংবা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও চুক্তি রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের শিক্ষা রয়েছে। অতএব হিন্দু প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়, বিপদে সহযোগিতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা নাগরিক দায়িত্ব পালনকে ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে পার্থক্য থাকলেও মানবিক দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই।
সব ধর্মের মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সহনশীলতা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তবে এই সম্প্রীতি প্রদর্শনের অর্থ কোনোভাবেই ধর্মীয় বিধান ও তাওহিদের মূলনীতিকে জলাঞ্জলি দেওয়া নয়। নিজেদের ঈমান, আকিদা ও স্বতন্ত্র ইসলামি সংস্কৃতি বজায় রেখেই আমরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি উদারতা প্রকাশ করতে পারি। মণ্ডপে গিয়ে উৎসব প্রত্যক্ষ না করেও দূর থেকে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখা সম্ভব। অতএব সাময়িক বিনোদন বা আনন্দের মোহ ত্যাগ করে আমাদের উচিত শরিয়তের বিধান মেনে চলা এবং তাওহিদের আলোয় নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করা।
লেখক: স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শের মধ্যে মানবজাতির জন্য অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আধুনিক সভ্যতার উজ্জ্বলতা ও পশ্চিমা জীবনধারার প্রভাবে বর্তমানে নবীজি (সা.)-এর অনেক সুন্দর ও কল্যাণময় সুন্নত উপেক্ষিত ও অবহেলিত হয়ে পড়েছে। অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই কাজগুলো আসলে সুন্নত। নিচে এমন ১০টি অবহেলিত সুন্নতের আলোচনা করা হলো—
১. নামাজের আগে মেসওয়াক করা
মেসওয়াকের সুন্নত বর্তমানে টুথব্রাশ ও পেস্টের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে প্রায় বিলুপ্তির পথে। রাসুল (সা.) মেসওয়াকের গুরুত্ব সম্পর্কে কতটা জোর দিয়েছেন, তা একটি হাদিস থেকে বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ‘যদি না আমার উম্মতের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তবে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করতে বলতাম।’ (বুখারি: ৮৮৭)। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
২. শিশুদের আগে সালাম দেওয়া
বড়দের সালাম দেওয়ার সময় আমরা শিশুদের সালাম দিতে ভুলে যাই। আমরা মনে করি, ছোটরাই কেবল বড়দের সালাম দেবে। কিন্তু ছোটদের সালাম দেওয়া নবীজির (সা.) একটি মিষ্টি সুন্নত, যা শিশুদের নম্রতা শেখায়। আনাস (রা.) একবার একটি শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনটিই করতেন।’ (বুখারি: ৬২৪৭)
৩. খাওয়ার পর আঙুল চেটে খাওয়া
পাশ্চাত্য ফ্যাশনের প্রভাবে বর্তমানে হাত দিয়ে খাওয়া এবং শেষে আঙুল চেটে খাওয়াকে অনেকেই অস্বস্তিকর মনে করেন। অথচ এর মধ্যে রয়েছে খাবারের বরকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন আঙুলে খেতেন এবং খাওয়ার পর আঙুল চেটে খেতেন। (মুসলিম: ২০৩২)
৪. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া
প্লেট থেকে খাবার পড়ে গেলে অস্বাস্থ্যকর মনে করে আমরা তা ফেলে দিই। কিন্তু রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যদি কারো লোকমা পড়ে যায়, সে যেন তা তুলে নেয় এবং ময়লা দূর করে তা খেয়ে নেয়, আর শয়তানের জন্য কিছু ফেলে না রাখে।’ (মুসলিম: ২০৩৩)। এজন্য পরিচ্ছন্ন স্থানে খেতে বসা উচিত।
৫. হাই তোলার সময় মুখ ঢাকা
হাই তোলা অলসতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। নবীজি (সা.) এই সময় হাতের পিঠ দিয়ে মুখ ঢেকে নিতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো হাই আসে, সে যেন যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করে অথবা মুখে হাত দেয়।’ (মুসলিম : ২৯৯৪)। এছাড়া হাই তোলার সময় বিকট শব্দ এবং আঙুল ফোটানোও অনুচিত।
৬. ডানদিক থেকে জুতা পরা
জুতো পরা বা খোলার সময় আমরা কোনো নিয়ম অনুসরণ করি না। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের জীবনের ক্ষুদ্রতম কাজের জন্যও সুন্দর শৃঙ্খলা শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জুতা পরার সময় ডান পা দিয়ে শুরু করো এবং খোলার সময় বাম পা আগে খোলো।’ (বুখারি: ৫৮৫৫)
৭. তিন শ্বাসে পানি পান করা
দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি পান করা ব্যস্ত জীবনের সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রাসুল (সা.) বসে পানি পান করতে বলেছেন এবং তিন শ্বাসে পান করতেন। (বুখারি: ৫৬৩১)। চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, এভাবে পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
৮. ওজুসহ ডান কাত হয়ে ঘুমানো
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওজু করা এবং ডান কাত হয়ে ঘুমানোর সুন্নতটি সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের মতো ওজু করো, তারপর ডান কাত হয়ে শোও।’ (বুখারি: ২৪৭)। এটি মুমিনকে সারা রাত সওয়াব এনে দেয়।
৯. মুচকি হাসি দিয়ে কথা বলা
কর্মব্যস্ততা ও বিষণ্ণতার কারণে মানুষের মুখ থেকে হাসি যেন উবে গেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও একটি সদকা।’ (তিরমিজি: ১৯৫৬)। একটি সুন্দর হাসি সমাজের বহু বৈরিতা দূর করে দিতে পারে।
১০. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা
এটি কেবল দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানের অংশ। রাস্তায় পড়ে থাকা কলার খোসা বা কাঁটা সরিয়ে ফেলার প্রবণতা আমাদের মধ্যে নেই। অথচ নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে... এর মধ্যে সর্বনিম্নটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।’ (মুসলিম: ৫৮)
উপরোক্ত সুন্নতগুলো পালন করতে আমাদের কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা শ্রমের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা ও সচেতনতা। যাপিত জীবনে এই সুন্নতগুলো চর্চা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সোনালি ঐতিহ্যগুলো সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
প্রশ্ন : বর্তমানে অধিকাংশ বাসাবাড়িতে গোসলখানার ভেতরে টয়লেট থাকে। মাঝে কোনো আড়াল নেই। তবে টয়লেটের ফ্লোরটি গোসলখানার ফ্লোরের তুলনায় কিছুটা উঁচু থাকে। আমাদের বাড়িতেও এই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।
জানার বিষয় হলো, এমন গোসলখানায় কি অজু-গোসল করা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেখানে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে কি না?
মাওলানা সালিম বিন আবদুল মালিক, দরলইগাঁও, সিলেট
উত্তর : এ ধরনের গোসলখানায় অজু-গোসল করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই। যদি গোসলখানা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকে এবং টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ না আসে, তাহলে সেখানে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে। তবে যদি সেখানে ময়লা থাকে অথবা টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসে, তাহলে শব্দ করে দোয়া পড়া উচিত নয়; বরং নিঃশব্দে দোয়া পড়া উচিত।
এছাড়া, যদি গোসলখানা না হয়ে শুধুমাত্র টয়লেট হয়, তাহলে সেখানে অজু করার সময় মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে দোয়া পড়া উচিত।
[কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ, বর্ণনা ২৭৮; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, বর্ণনা ১২৩২; মিরকাতুল মাফাতীহ, ২/৫০; রদ্দুল মুহতার, ২/১৯৪]
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সাত আকাশ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে না। কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত সহনশীল, পরম ক্ষমাশীল।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৪৪)
এই আয়াতটি একটি মহান বার্তা বহন করে। যে ব্যক্তি এই আয়াতের উপর গভীরভাবে চিন্তা করবে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে সব সৃষ্টিই তাদের রবের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছে। মানুষ, গাছপালা, নক্ষত্র—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না।’
তিনি বলেননি, ‘কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ শুনতে পাও না।’ তাহলে কি এমন হতে পারে যে আমরা এসব সৃষ্টির তাসবিহের শব্দ শুনতে পারি, কিন্তু তার অর্থ বুঝতে পারি না? কারণ কোনো কথা শোনার পরেই তা বোঝার বিষয়টি আসে। অন্যভাবে বললে, যদি আমরা কাউকে বলি—‘তুমি আমাদের কথা বুঝতে পারছ না’, তাহলে এর অর্থ হতে পারে—আমরা তার সামনে কথা বলছি, সে আমাদের কথা শুনছেও, কিন্তু আমরা কী বলছি, তা সে বুঝতে পারছে না।
এখান থেকে লেখক ধারণা করেছেন যে এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত দিয়েছেন—আমাদের চারপাশের সব কিছু থেকে নির্গত তাসবিহের শব্দ আমরা শুনতে পারলেও সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করতে পারব না।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু বিষয় আবিষ্কার করছেন, যেগুলো নিয়ে এই ভাবনা আরো এগিয়ে নেওয়া যায়—
উদ্ভিদের শব্দ : বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, কিছু উদ্ভিদ থেকে এমন শব্দতরঙ্গ নির্গত হয়, যা মানুষের শ্রবণসীমার মধ্যে পড়তে পারে। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ২০ থেকে ২০,০০০ কম্পাঙ্কের মধ্যে থাকা শব্দ মানুষের শ্রবণযোগ্য সীমার অন্তর্ভুক্ত। তবে উদ্ভিদ থেকে নির্গত কিছু সংকেত এত দুর্বল হতে পারে যে সেগুলো সরাসরি শোনা যায় না; যন্ত্রের সাহায্যে সেগুলোকে বিবর্ধিত করতে হয়।
নক্ষত্র ও কৃষ্ণগহ্বরের শব্দ : বিজ্ঞানীরা কিছু নক্ষত্র ও মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দসংকেত শনাক্ত করেছেন। নিউট্রন নক্ষত্র থেকে আসা সংকেতকে কখনো হাতুড়ির আঘাতের মতো শব্দ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গেও শব্দের ধারণা যুক্ত হয়েছে। এমনকি মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকেত থেকেও বিজ্ঞানীরা শব্দের অনুরূপ উপস্থাপনা তৈরি করেছেন।
জীবন্ত কোষের শব্দ : ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক গিমজেউস্কির (Gimzewski) মতে, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জীবন্ত কোষের কম্পন শনাক্ত করা সম্ভব এবং বিভিন্ন কোষের কম্পনের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে, বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের কোষের কম্পন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রাণী, পোকামাকড় ও অণুজীবের শব্দ : ডলফিন, ঝিঁ ঝিঁ পোকা, পাখি, মৌমাছি এবং অন্যান্য জীব বিভিন্ন ধরনের শব্দ বা কম্পন তৈরি করে।
ভবিষ্যতে বিজ্ঞান হয়তো পরমাণুর কম্পন সম্পর্কেও আরো নতুন তথ্য আবিষ্কার করবে। তখন সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহর তাসবিহ করে—এই কোরআনিক বক্তব্যের তাৎপর্য আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হতে পারে।
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য : আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব কম্পন বা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাহলে এমন কোনো অদৃশ্য শক্তি কি নেই, যা সর্বত্র বিদ্যমান এবং আমরা যা দেখি বা অনুভব করি, তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে?
সেই শক্তি কি মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা হতে পারে না? আর এসব শব্দ বা কম্পন কি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাঁর মহিমা ঘোষণা এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে না?
কেন আল্লাহর তাসবিহ থেকে উদাসীন থাকব?
যদি সৃষ্টিজগতের সবকিছু রাত-দিন আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে ক্লান্ত না হয়ে এবং বিরতি না দিয়ে, তাহলে আমরা কেন আল্লাহর স্মরণ থেকে ভুলে থাকব? যদি এমন ক্ষুদ্র জীবও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে—যাকে খালি চোখে দেখা যায় না, তাহলে আমরা—যারা নিজেদের মুমিন বলে দাবি করি, আমাদের কি আরো বেশি তাসবিহ করা উচিত নয়?
(মাওসুআতুল ইজাজিল ইলমি ফিল কোরআনি ওয়াস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ অবলম্বনে)
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ