১০:৪২ এম
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে অব্যবহৃত জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।
কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক জানান, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মাতারবাড়ীর ২৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে অব্যবহৃত ১৭১ একর জমিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিসভায় বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার জন্য প্রস্তুত করা খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামো ঋণের আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ কাঠামোর আওতায় ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সহায়তা রয়েছে।
আরও পড়ুন: নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জে নতুন কূপে গ্যাসের সন্ধান মিলেছে
পরিকল্পনা কমিশনের ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা মিলবে।
প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ শুরুতে ছাই সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ করেছিল। তবে মাত্র ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বাকি ৫২৫ একর জমি অব্যবহৃত রয়েছে।
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি ছাই সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ করা ওই অব্যবহৃত জমির একটি অংশে স্থাপন করা হবে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
প্রকল্পের বিবরণে বলা হয়েছে, ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে বিদ্যমান ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণেরও প্রয়োজন হবে না।
আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মারামারি, আহত ১০
প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) মডিউল, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করতে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ী ও চকরিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের ওভারহেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে। মাতারবাড়ীতে তিনটি এবং চকরিয়ায় একটিসহ মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আশা করছে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থান আমদানি করা সরঞ্জাম দ্রুত খালাস ও পরিবহনে সহায়ক হবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাথমিকভাবে বিবেচিত ৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পল্লী বিদ্যুতের আগুনে ১৫টি বসতঘর পুড়ল
পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে প্রাক-প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।’
সব মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৭ নম্বর লক্ষ্যের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৯ দফা নির্দেশনা, দুই সপ্তাহে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।
তবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে আলোচনার জন্য কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এর মধ্যে রয়েছে একই ধরনের চলমান বা সম্পন্ন প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে প্রধান সরঞ্জামের প্রস্তাবিত মূল্যের বিশ্লেষণ, প্রস্তাবিত অর্থায়ন কাঠামোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন গ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত বলে মনে হলেও সিপিজিসিবিএল মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ বা প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে।
আরও পড়ুন: এবি পার্টি: সরকারের ব্যর্থতা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও প্রকট করেছে
পিইসি সভায় সৌর পিভি মডিউল ও ইনভার্টারের গুণগত মান এবং প্রচলিত বাজারদরও পর্যালোচনা করা হবে। এ ছাড়া যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের জন্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা ‘লট’ হিসেবে উল্লেখ না করে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়ার বিষয়টিও পরীক্ষা করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তারিত বিবরণ চেয়েছে। সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিক তথ্যও দিতে বলা হয়েছে।
বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন