১২:৪৪ পি.এম
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সফরের সময় তিনি নয়াদিল্লির পরিবর্তে মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক করবেন। এছাড়া, গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে তার। জয়শঙ্করকে মুম্বাইয়ে যেতে হবে রুবিওর সাথে বৈঠকের জন্য, এই মন্তব্যের পর বিতর্কের মাত্রা বেড়ে গেছে, যা মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের পক্ষ থেকে এসেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার নিজ দেশের মাটিতে তলব করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। বাণিজ্য, শুল্ক এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, রুবিওর ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে রোববার উজবেকিস্তানের সমরকন্দ থেকে। সেখানে তিনি মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে ‘সি৫+১’ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। সোমবার মুম্বাইয়ে জয়শঙ্করের সাথে বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং জ্বালানি সহযোগিতাও আলোচনায় আসবে। রুবিও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
আরও পড়ুন: মিশিগানে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে প্রতিবেশীদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন
এরপর, জামনগরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন তিনি। এই শোধনাগারটি পরিচালনা করে ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ।
সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, সেখানে আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনাতেও তার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রুবিও কেন নয়াদিল্লি যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি। গত মে মাসে তিনি চার দেশের জোট কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিতে নয়াদিল্লি গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এই জোটের সদস্য।
এ সফরে জ্বালানি ও বিনিয়োগের বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জামনগর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্রগুলোর একটি। ভারতের অর্থনৈতিক দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। ওয়াশিংটন ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার জন্য উৎসাহিত করছে।
আরও পড়ুন: ১০ বছর পর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে বের হতে পারবে সদস্য দেশগুলো
গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর মার্কিন সরকার বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ভেনেজুয়েলার তেল বাজারজাত করছে। রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। গত ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত হতে যাওয়া এটি প্রথম শোধনাগার। মার্চে প্রকল্পটির ঘোষণা দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে।
রুবিওর সফরসূচি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের বক্তব্যের পর। তিনি বলেন, রুবিও মুম্বাইয়ে ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন এবং জয়শঙ্করসহ নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে তার সাথে দেখা করবেন বলে ওয়াশিংটন ‘প্রত্যাশা’ করছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল রুবিওর সফর সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। কেন তিনি নয়াদিল্লি যাচ্ছেন না, সেটিও ব্যাখ্যা করেননি। দ্য হিন্দু জানিয়েছে, তখন জয়সওয়াল বলেছিলেন, যথাসময়ে সরকার এ বিষয়ে ঘোষণা দেবে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের সমালোচনা করেন বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি মন্তব্য করেন, রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ‘বেশ অস্বাভাবিক’।
আরও পড়ুন: কিউবায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য শেরিটকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও শুক্রবার এক্সে লেখেন, রুবিও ‘নিজের কর্মচারীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন’।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য পবন খেরা আরো কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘ভারতের মাটিতে একটি বিদেশি সরকারের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করা—মোদি সরকারের মানদণ্ডেও এটি নতুন এক নিম্নস্তর।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েনের বড় কারণ বাণিজ্যনীতি ও রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা। গত বছরের আগস্টে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ভারতীয় অধিকাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছালে শুল্কের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে এরপর বাণিজ্য আলোচনা আর এগোয়নি।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ চলতি মাসে বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা এক জায়গায় এসে থেমে গেছে। তবে বৃহস্পতিবার বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেন, চুক্তির প্রথম ধাপের আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: তেহরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আব্বাস আরাগচির আলোচনা
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা সুবিধাজনক অবস্থানে না থাকলে নয়াদিল্লি চুক্তিতে সই করবে না।
বাণিজ্যের বাইরেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং জানান, তার দপ্তর আটটি কোম্পানিকে শ্রম সনদ দেওয়ার একটি কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে বাদ দিয়েছে। বিদেশি কর্মীদের জন্য গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে নিয়োগদাতাদের এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ। বাদ পড়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো ও এইচসিএল রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি বিষয়ক কার্নেগি এনডাউমেন্টের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো সমীর লালওয়ানি চলতি সপ্তাহে এক লেখায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ভারতের জনমত রেকর্ড পরিমাণে খারাপ হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ এ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, এসব ঘটনা ভারতকে আবার রাশিয়ার তেলের দিকে ঝুঁকতে প্রভাবিত করেছে।
আরও পড়ুন: গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বোমাবর্ষণে দুই শিশুসহ নিহত ৭
তবে রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন লালওয়ানি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে।
তার ভাষায়, রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে মানুষের ধারণার অবনতি হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের কৌশলগত ভিত্তির অবনতির চেয়ে দ্রুত।
রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নতুন মার্কিন শুল্কের আশঙ্কাও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছিল। গত মাসে ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ নামে একটি আইনে সই করেন। এ আইনের আওতায় রাশিয়ার তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রুশ তেল ক্রেতা ভারত ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছিল, নতুন শুল্ক আরোপ করা হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ কমানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প শুক্রবার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে ওই নিষেধাজ্ঞাসংশ্লিষ্ট শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে চাইছে তার প্রশাসন।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন