০২:৪০ পি.এম
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য একটি কাঠামোগত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে সম্ভাব্য এই সমঝোতা শুধু সমুদ্রপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরে ইরানের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।
ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে হবে।” তিনি আরও বলেছেন, “ইরান আর বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারবে না।”
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন হতো। এটি বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চেমাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
এছাড়া বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিও এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ‘চোকপয়েন্ট’গুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর ইরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে জলপথটি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে ইরান ও ওমানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা হলেই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত হবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে ইরানের একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ করতে হবে। এরপরই প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হতে পারে।
ঘারিবাবাদির এই বক্তব্য আসে তেহরান ও মাসকাট সরু জলপথটির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট ভৌগোলিক রুটে একমত হওয়ার খবর প্রকাশের এক দিন পর। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ দ্রুত খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
৭ শতাংশ পর্যন্ত ‘সার্ভিস ফি’ চাইছে ইরান। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্যবাহী চালানের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ‘ট্রানজিট’ বা ‘সার্ভিস ফি’ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
অন্যদিকে, ওমান মালাক্কা প্রণালির আদলে একটি স্বেচ্ছামূলক ফি ব্যবস্থার কথা বলেছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় নৌ-নিরাপত্তা, নেভিগেশন, পরিবেশ সুরক্ষা ও উদ্ধারসেবার মতো খাতের জন্য জাহাজগুলো স্বেচ্ছায় অর্থ প্রদান করে। এটি বাধ্যতামূলক টোলের চেয়ে ভিন্ন ব্যবস্থা।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিয়ন্ত্রিত বাধ্যতামূলক ফি ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে। এ নিয়ে আলোচনা চললেও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পাশাপাশি বীমা ব্যয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি, অর্থ পরিশোধের বৈধতা এবং সম্ভাব্য ফি বাস্তবে কীভাবে আদায় করা হবে- এসব প্রশ্নও এখনও অমীমাংসিত।
৭ শতাংশ টোল হলে বছরে কত আয়? হরমুজ দিয়ে যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং পণ্যের মূল্যকে ভিত্তি করে ৭ শতাংশ ফি আরোপ করা হয়- এমন একটি সম্ভাব্য হিসাব করা হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং বছরে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে।
ফি আদায়ের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত অর্থকে ‘নিট মুনাফা’ হিসেবে ধরলে বার্ষিক নিট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
তবে এটি কোনও নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। বরং সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে করা একটি হিসাব।
বাস্তবে ইরানের আয় নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফি কত নির্ধারণ করা হয়, কত শতাংশ জাহাজ তা পরিশোধ করে, কোন কোন জাহাজ বা পণ্য ছাড় পায়, ফি আদায় কতটা কার্যকর হয় এবং বাড়তি খরচ বা আইনি ঝ Risks of that may possibly hinder shippers from continuing to use Hormuz.
এক জাহাজ থেকেই আয় কোটি ডলারের বেশি। বিষয়টি বোঝাতে একটি বড় তেলবাহী জাহাজ বা ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি)-এর উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি ভিএলসিসিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮০ ডলার হলে পুরো চালানের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ডলার।
এর ৭ শতাংশ ফি হলে একটি জাহাজের একবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতেই দিতে হতে পারে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ থেকে ১ কোটি ১২ লাখ ডলার। অর্থাৎ, প্রতিটি বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে আদায় করা অর্থই কয়েক কোটি ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
বিশ্বের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর আয়ের সঙ্গে তুলনা। ৭ শতাংশ ফি থেকে বছরে প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার নিট আয় সম্ভব হলে তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক কয়েকটি কোম্পানির বার্ষিক নিট আয়ের সমপর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। এমনকি এই কাল্পনিক আয় অ্যালফাবেট, এনভিডিয়া, অ্যাপল, মাইক্রোসফট এবং সৌদি আরামকোর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বার্ষিক নিট আয়ের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে।
তবে হরমুজের সম্ভাব্য আয়কে এসব কোম্পানির নিট আয়ের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ করপোরেট মুনাফা ও একটি আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর আরোপিত ফি থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রকৃতি এক নয়। সুয়েজ খালের আয়ের চেয়েও বহুগুণ বেশি? হরমুজের সম্ভাব্য আয়ের আরেকটি চমকপ্রদ তুলনা সুয়েজ খালের সঙ্গে। মিসরের সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খালটি প্রায় ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করেছে। লোহিত সাগরে আগের সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পর তা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হওয়ায় আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে।
এর তুলনায় হরমুজে ৭ শতাংশ ফি থেকে সম্ভাব্য ১৪০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক মোট আয় প্রায় ৩০ গুণের সমান। এমনকি সুয়েজ খালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয়ের সময়ের সঙ্গেও এই কাল্পনিক অঙ্কের ব্যবধান অনেক বেশি। ইরানের অর্থনীতি বিবেচনায় কতটা বড়? হরমুজের সম্ভাব্য আয়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে ইরানের নামমাত্র জিডিপি ছিল আনুমানিক ৩৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ হরমুজ থেকে বছরে ১৪০ বিলিয়ন ডলার মোট রাজস্ব আদায় করা গেলে তা ইরানের পুরো অর্থনীতির প্রায় ৩৯ শতাংশের সমান হবে। ১৩৬ বিলিয়ন ডলার নিট আয়ের হিসাব ধরলেও তা ইরানের জিডিপির প্রায় ৩৭ শতাংশ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই আয় করতে ইরানকে অতিরিক্ত এক ব্যারেল তেলও উৎপাদন করতে হবে না। শুধু বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহনপথে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করেই এত বিপুল অর্থ আদায়ের তাত্ত্বিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
আগের হিসাব ছিল অনেক কম। তবে ৭ শতাংশ ফি থেকে ১৪০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি ইরানের আগের কিছু প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বেশি। এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা ‘নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশগত সেবা’ বাবদ মোট বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ইরানের পক্ষ থেকে হিসাব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া প্রতি ব্যারেলে ১ থেকে ২ ডলার বা প্রতিটি ভিএলসিসির জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলারের মতো নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার ধারণাও আলোচনায় এসেছে। এসব ব্যবস্থায় সম্ভাব্য আয় ৭ শতাংশের হিসাবের তুলনায় অনেক কম হবে।
সবচেয়ে বড় বাধা আন্তর্জাতিক আইন। হরমুজ প্রণালিতে ইরান ইচ্ছামতো ‘টোল বুথ’ বসিয়ে জাহাজ থেকে অর্থ আদায় করতে পারবে কি না—এ নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য অর্থ পরিশোধকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে আরোপ করতে গেলে ইরানকে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক আইনগত বাধার মুখে পড়তে হবে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে ব্যবহৃত প্রণালিতে জাহাজের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’-এর অধিকার রয়েছে এবং সেই চলাচল বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো নৌ চলাচল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে বিধি তৈরি করতে পারে। তবে এসব বিধি বিদেশি জাহাজের প্রতি বৈষম্যমূলক হতে পারে না এবং এর ফলে ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার কার্যত অস্বীকার, বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।
তবে সব ধরনের ফি বেআইনি নয়। এর অর্থ এই নয় যে জাহাজ থেকে কোনও ধরনের অর্থ নেওয়াই আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। ইউএনসিএলওএসের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও জাহাজকে বাস্তবে দেওয়া নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানে ‘সার্ভিস ফি’ ও ‘টোল’-এর মধ্যে আইনি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরান যদি নেভিগেশন, নিরাপত্তা, উদ্ধারসেবা বা পরিবেশ সুরক্ষার মতো বাস্তব ও শনাক্তযোগ্য সেবার বিনিময়ে যুক্তিসংগত ফি নেয়, সেটি এক ধরনের ব্যবস্থা। কিন্তু যদি কোনও জাহাজকে হরমুজ দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার শর্ত হিসেবেই পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেটিকে কার্যত ‘টোল’ হিসেবে দেখা হতে পারে। এ ধরনের বাধ্যতামূলক ফি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আইনি পরিস্থিতি আরও জটিল কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- কোনও দেশই ইউএনসিএলওএস চুক্তি অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা সম্পর্কিত বেশ কিছু নীতি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে এসব নীতি ইরানের ওপর ঠিক কতটা এবং কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে তেহরানের ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ফলে শুধু কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তির একটি ধারা দেখিয়েই হরমুজের সম্ভাব্য ফি ব্যবস্থার পুরো আইনি বৈধতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই কি আসল লক্ষ্য? ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট ইরানের প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রিত ট্রানজিট ব্যবস্থাকে হরমুজের ওপর তেহরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে। তাদের বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরানের এমন নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি পেলে হরমুজে অবাধ নৌ চলাচলের নীতিই দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জলপথটি ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণের জন্য তেহরানের হাতে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা চলে আসতে পারে। অর্থাৎ, হরমুজের ‘সার্ভিস ফি’ নিয়ে বিতর্কটি শুধু কয়েক বিলিয়ন বা শত বিলিয়ন ডলারের রাজস্বের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি বিষয়- আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের কর্তৃত্ব কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে।
৭ শতাংশ ফি: বিশাল সম্ভাবনা, কিন্তু নিশ্চিত আয় নয় কাগজে-কলমে হরমুজ প্রণালির ৭ শতাংশ ফি ইরানের জন্য অভাবনীয় রাজস্বের দরজা খুলে দিতে পারে। যুদ্ধপূর্ব বাণিজ্যিক প্রবাহ পুরোপুরি ফিরে এলে এবং সব জাহাজের ওপর ফি কার্যকর করা গেলে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় সম্ভব—এমনকি কিছু হিসাব অনুযায়ী তা ১৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই হিসাব কার্যকর হওয়ার পথে বড় ধরনের বাধা রয়েছে।
ফি বেশি হলে জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু পাইপলাইন হরমুজের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। ইরানেরও সীমিত বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বীমা ব্যবস্থা, অর্থ পরিশোধের বৈধতা এবং সম্ভাব্য আইনি বিরোধ।
ফি কমিয়ে আনা হলে, তা স্বেচ্ছামূলক করা হলে, কিছু জাহাজকে ছাড় দেওয়া হলে কিংবা ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি করতে হলে ইরানের প্রকৃত আয়ও নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। তাই ৭ শতাংশের হিসাবকে নিশ্চিত রাজস্ব নয়, বরং হরমুজের ভৌগোলিক গুরুত্ব থেকে ইরানের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি উচ্চমাত্রার তাত্ত্বিক চিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জাহাজ চলাচল বজায় রাখা, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ফি কাঠামো তৈরি, অর্থ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও আইনি সমঝোতা- এই চারটি বিষয় নিশ্চিত না হলে কাগজে-কলমের ১০০ থেকে ১৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা বাস্তব রাজস্বে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। অর্থাৎ, হরমুজ নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ‘লিভারেজ’ তৈরি করতে পারে; কিন্তু সেই লিভারেজকে বিশ্বের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর সমপর্যায়ের স্থায়ী আয়ে রূপান্তর করা এখনও অনেক দূরের বিষয়। সূত্র: গালফ নিউজ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন