ঢাকা রবিবার, ০১ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৬ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
রবিবার, ০১ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৬ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

ঘর অগোছালো থাকলে কি মনের ওপরও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব?


ঘর অগোছালো থাকলে কি মনের ওপরও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব?

সারাদিনের কাজ শেষে যখন কেউ ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে বসতে চান, তখন যদি সোফায় ছড়িয়ে থাকা কাপড়, টেবিলে জমে থাকা কাগজপত্র, মেঝেতে পড়ে থাকা খেলনা কিংবা রান্নাঘরের অপরিষ্কার বাসনপত্র দেখে বিরক্তি অনুভব করেন, তখন বিষয়টিকে নিছক ঘর পরিষ্কারের ঝামেলা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানসিক স্বস্তির সম্পর্ক বিদ্যমান।

অগোছালো ঘর ও মানসিক চাপের সম্পর্ক

ঘর অগোছালো থাকলে কি সত্যিই মন খারাপ হয়? ২০২৫ সালের আগস্টে Journal of Environmental Psychology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫০১ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, ঘরের অগোছালো অবস্থা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। যাঁরা নিজেদের ঘরকে বেশি অগোছালো মনে করেছেন, তাঁদের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি বেশি এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি ও মানসিক সুস্থতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।

আরও পড়ুন: জাফলং ও রাতারগুল: সিলেটের বৈচিত্র্যময় পর্যটন কেন্দ্র

তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অগোছালো ঘরই মানসিক অশান্তির একমাত্র কারণ। আগে থেকেই মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তির পক্ষে ঘর গোছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, সম্পর্কটি দুই দিক থেকেই কাজ করতে পারে।

চোখের সামনে বিশৃঙ্খলা থাকলে মনের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। ঘরে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছড়িয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথায় চাবি রাখা হয়েছে, জরুরি কাগজপত্র কোথায়, কিংবা কাপড়ের স্তূপের মধ্যে পছন্দের পোশাকটি খুঁজে পাওয়া—এ ধরনের ছোটখাটো সমস্যা প্রতিদিনের বিরক্তি বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ঘরে ফিরেই যদি অসমাপ্ত কাজের তালিকা চোখে পড়ে, তাহলে অবসর সময়েও মনে হতে পারে অনেক কিছু এখনো করা বাকি। ফলে বাড়িতে থেকেও বিশ্রামের অনুভূতি পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ঘরের পরিবেশ কি মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত? ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক ডারবি স্যাক্সবে ও রেনা রেপেত্তির ২০১০ সালের একটি গবেষণায় ৩০ জন দ্বৈত-আয়ের দম্পতির বাড়ির পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেসব নারী তাঁদের ঘরকে বেশি চাপপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দিনের সঙ্গে নেতিবাচক মেজাজ বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে। তাঁদের কর্টিসলের দৈনিক ওঠানামার ধরনও তুলনামূলকভাবে কম খাড়া ছিল, যা কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আরও পড়ুন: আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছেন ২০ মুসলিম বিজ্ঞানী

গবেষণাটি ছোট পরিসরের হওয়ায় এর ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলা যায় না। তবে বাড়ির পরিবেশ যে মানুষের মানসিক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তা বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

অগোছালো ঘর থেকে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অনেকেই ঘর অগোছালো দেখে মনে মনে ভাবেন, ‘এতটুকু কাজও কেন করতে পারছি না?’ কর্মজীবী মানুষ, ছোট সন্তানের অভিভাবক কিংবা যাঁদের ওপর পরিবারের বেশির ভাগ দায়িত্ব থাকে, তাঁদের জন্য ঘর গোছানো আরও একটি অসমাপ্ত কাজের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

ফলে শুধু ঘরের বিশৃঙ্খলা নয়, নিজের প্রতি বিরক্তি ও অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অথচ ক্লান্তি, সময়ের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা মানসিক চাপের মতো বাস্তব কারণেও ঘর অগোছালো থাকতে পারে। তাই ঘর গোছানো না থাকাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি আমাদের বিশ্রাম, অভ্যাস ও দৈনন্দিন অনুভূতির সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় অগোছালো পরিবেশের সঙ্গে কম মানসিক সুস্থতা ও বেশি নেতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে অগোছালো ঘর সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়।

আরও পড়ুন: ই-বর্জ্য দূষণ রোধে তরুণদের সচেতন হওয়ার আহ্বান

চলবে....

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

অটিজম থেকে স্বাভাবিক জীবনের পথে রাহির বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:১০ এম


অটিজম থেকে স্বাভাবিক জীবনের পথে রাহির বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা

রাহি নামের একটি ছোট ছেলে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। যখন রাহির বয়স দুই বছর, তখন তার মা-বাবা লক্ষ্য করেন যে রাহি অন্য শিশুদের মতো সাড়া দেয় না। তার নাম ধরে ডাকলে সে তাকায় না, চোখের সামনে হাত নাড়লেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না এবং একা একা খেলতে পছন্দ করে। প্রথমে রাহির মা-বাবা মনে করেন, এটি হয়তো তার স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। রাহি কথা বলা শুরু করেনি এবং মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক আচরণ, যেমন বারবার হাত নাড়া বা একই কাজ পুনরাবৃত্তি করা করে।

তিন বছর বয়সে রাহির মা-বাবা তাকে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, রাহি অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত। এই খবরটি রাহির পরিবারের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তারা প্রথমে হতাশায় ভুগলেও মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শে ঢাকার একটি অটিজম বিশেষায়িত স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই স্কুলটি ছিল জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’।

রাহিকে স্কুলে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (Individualized Education Plan—IEP) তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল স্পিচ থেরাপি—রাহির যোগাযোগদক্ষতা উন্নত করার জন্য; অকুপেশনাল থেরাপি—তার সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য; আচরণগত থেরাপি (ABA—Applied Behavior Analysis)—তার পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ কমানো এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া উন্নত করার জন্য; এবং গ্রুপ থেরাপি—অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। রাহির মা-বাবাও স্কুলের কাউন্সেলিং কর্মসূচিতে অংশ নেন, যেখানে তারা শেখেন, কীভাবে রাহির সঙ্গে ধৈর্যশীল ও সহায়ক আচরণ করতে হয়। তারা বুঝতে পারেন, রাহির সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া গেলে সে সমাজে অবদান রাখতে পারবে।

রাহির মতো শিশুদের গল্প প্রমাণ করে যে অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক যত্ন, শিক্ষা ও সমাজের সমর্থন দিয়ে অটিস্টিক শিশুরা তাদের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে এবং সমাজে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে আরো সচেতনতা এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি অটিস্টিক শিশু তার জীবনের গল্প নিজেদের মতো করে লিখতে পারে। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের ফলে অনেক শিশু স্বাভাবিক জীবনযাপনে সক্ষম হয়েছে।

অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, যা শিশুদের সাধারণত জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং সীমিত আগ্রহের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে।

অটিজম একটি স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারÑঅর্থাৎ এর লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কিছু ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও অনেকের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন অটিজমে আক্রান্ত। শহরাঞ্চলে এই হার তুলনামূলক বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৪৫০ জন।

অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি। তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। জিনের ত্রুটি বা মিউটেশন অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রেট সিনড্রোম বা ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোমের মতো জেনেটিক ডিজঅর্ডারের সঙ্গে অটিজম যুক্ত হতে পারে।

গর্ভকালীন ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন : জিকা ও রুবেলা), বায়ুদূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক (মার্কারি ও লেড) এবং খাদ্য সংরক্ষণের রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মা-বাবার বেশি বয়স, গর্ভকালীন জটিলতা এবং মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন বা রাসায়নিক কার্যকলাপ অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।

অটিজমের লক্ষণ

অটিজমের লক্ষণ সাধারণত শিশুর ১৮ থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, চোখে চোখ না রাখা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা। একই কাজ বারবার করা এবং নির্দিষ্ট বস্তু বা ক্রিয়াকলাপের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহও এর লক্ষণ। এছাড়া কথা বলতে দেরি, অস্বাভাবিক সুরে কথা বলা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগে অসুবিধা হতে পারে। নির্দিষ্ট শব্দ, আলো, স্পর্শ বা টেক্সচারের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা উদাসীনতাও দেখা যায়।

দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে।

সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট এ ক্ষেত্রে কাজ করছে।

চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ

অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন থেরাপি ও শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের উন্নতি সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। অনেক অভিভাবক তাদের শিশুর অটিজম শনাক্ত করতে পারেন না।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে অটিজমবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক অনুদান প্রদান করে।

নীতিমালা ও আইনি কাঠামো

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ : এই আইনের আওতায় অটিস্টিক ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়। মন্ত্রণালয় এই আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৮ (খসড়া) : অটিস্টিক ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

মায়ের ভূমিকা

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বিকাশে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়েরা শিশুর আচরণের প্রাথমিক লক্ষণ, যেমন চোখে চোখ না রাখা ও কথা না বলা, শনাক্ত করতে পারেন। মায়েরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে শিশুকে ভাষা, সামাজিকতা ও দৈনন্দিন কাজ শেখাতে পারেন। ধৈর্য, ভালোবাসা ও সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন তার মা। মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কাউন্সেলিং গ্রহণ করা উচিত। মায়েরা সমাজে অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর মা-ই পারেন তার শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবন উপহার দিতে।

বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক কাজ বাকি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আরো সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাথমিক শনাক্তকরণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিশুরা সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

কালিয়াকৈরে উজান বিলে অবৈধ জাল ও বাঁধ ধ্বংস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:১১ এম


কালিয়াকৈরে উজান বিলে অবৈধ জাল ও বাঁধ ধ্বংস

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উজান বিলে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে পরিচালিত এই অভিযানে ৫৫টি নিষিদ্ধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় এবং এক অসাধু জেলেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন কালিয়াকৈর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামসুন নাহার শিলা। অভিযানের সময় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা, মৎস্য দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, একটি অসাধু চক্র উজান বিলে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রিং জাল ও কারেন্ট জালের সাহায্যে মা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোনা নির্বিচারে নিধন করে আসছিল। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৩৫টি রিং জাল ও ২০টি কারেন্ট জাল জব্দ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি বিলের অবৈধ বাঁধ ভেঙে দিয়ে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, কারেন্ট ও রিং জালের কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। মা মাছ ও পোনা রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও জেলেরা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং নিয়মিত নজরদারির দাবি তুলেছেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

শিক্ষাঙ্গনে শিশুর সুরক্ষায় ইসলামের নৈতিক তাগিদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:১১ এম


শিক্ষাঙ্গনে শিশুর সুরক্ষায় ইসলামের নৈতিক তাগিদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো একটি শিশুর মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা বিকাশের পবিত্রতম স্থান। এখানে বাবা-মায়ের পর শিক্ষকেরা শিশুদের পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ মানুষ গড়ার দক্ষ কারিগর। তবে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় ও মাদরাসার মতো ধর্মীয় বিদ্যাপীঠে কোমলমতি শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের খবর প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে উঠে আসছে, যা আমাদের বিবেককে চরমভাবে দংশন করছে। যে হাত পরম স্নেহে খাতা-কলম ধরিয়ে শিশুকে আলোর পথ দেখানোর কথা, সেই হাত যখন লালসার বশবর্তী হয়ে অবুঝ শিশুর শরীর ও মনকে ক্ষতবিক্ষত করে, তখন সমাজ ও মানবতার আর কোনো গৌরব অবশিষ্ট থাকে না। ইসলাম প্রতিটি শিশুর পূর্ণ নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছে।

ইসলামে সমাজের সবচেয়ে নিষ্কলুষ, নিষ্পাপ এবং মহান আল্লাহর দেওয়া বিশেষ আমানত বা জান্নাতের ফুল হিসেবে শিশুদের ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের প্রতি অন্তহীন স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শনকে বিশ্বনবী (সা.) ঈমানের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ এবং জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পবিত্র বাণী অনুযায়ী, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ ইসলামের এই সুস্পষ্ট মূল নীতি প্রমাণ করে, শিশুদের কোনোভাবেই অবহেলা, নিষ্ঠুরতা বা কোনো প্রকার লাঞ্ছনার পাত্র বানানো যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন। মদিনার রাস্তাঘাটে শিশুদের দেখলে নিজে আগে সালাম দিতেন। আনাস (রা.)-এর মতো শিশু সাহাবিকে দীর্ঘ ১০ বছর পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে উম্মতকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অথচ আজ একশ্রেণির কুচক্রী ও বিপথগামী মানুষ শিক্ষকের পবিত্র লেবাস গায়ে জড়িয়ে এই জান্নাতি ফুল-পাখিদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ক্ষমার অযোগ্য জঘন্যতম অপরাধ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন একজন শিক্ষক কর্তৃক কোনো শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তা কেবল একটি দৈহিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক জগৎকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম মানুষের শারীরিক ও মানসিক—উভয় প্রকার সুরক্ষার ব্যাপারে সমান গুরুত্বারোপ করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বনী আদম বা মানবজাতিকে সর্বোত্তম সম্মানে ভূষিত করার কথা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ যখন কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোনো শিশুর এই পবিত্রতা হরণ করে, তখন সে মূলত আল্লাহর দেওয়া সেই সর্বজনীন মানবিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত হানে। একজন শিশুর মানসিক সুস্থতা ও আত্মসম্মান বজায় রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরি, কারণ ইসলামে মানুষের ইজ্জত বা সম্মান রক্ষা করাকে শরিয়তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বা ‘মাকাসিদ আশ-শারিআহ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে প্রিয় নবী (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র ও হারাম করা হলো, যা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।’

ইসলামের বিচারব্যবস্থায় ব্যভিচার, ধর্ষণ এবং যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নকে সবচেয়ে গুরুতর, হীন ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় এটি একটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ এই নিষেধাজ্ঞা কেবল চূড়ান্ত অপরাধের জন্যই নয়, বরং অপরাধের দিকে ধাবিত করে এমন প্রতিটি কুদৃষ্টি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, অসৎ উদ্দেশ্যমূলক অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণকেও ইসলাম ‘চোখের জিনা’ বা ‘হাতের জিনা’ হিসেবে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের রক্ষা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং যারা শিক্ষকদের পরম বিশ্বাসে ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণামূলক ও পাশবিক আচরণ ইসলামের দৃষ্টিতে ‘খেয়ানত’ বা আমানতের চরম লঙ্ঘন।

শিক্ষকতার আসনটি একটি পবিত্র আমানত। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তারা সফল মুমিন।’ অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার মধ্যে প্রকৃত ঈমান নেই।’

ইসলামে শিক্ষকতাকে অত্যন্ত সম্মানিত এবং একটি গুরুদায়িত্বপূর্ণ ‘রাঈ’ বা অভিভাবকত্ব হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। বুখারি শরিফের সুপরিচিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ সুতরাং, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানের জন্য দায়বদ্ধ নন, বরং তার কাছে পড়তে আসা প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার ওপর অর্পিত দ্বীনি কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে একজন পরম করুণাময় শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরম মমতা, ধৈর্য ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, কখনো কোনো শিশুর মনে ভয় বা ক্ষোভের জন্ম দেননি। কোনো শিক্ষক যখন সেই মহান আদর্শ ভুলে লালসার বশবর্তী হয়ে শিশুর ক্ষতি করে, তখন সে দুনিয়ার আইনের পাশাপাশি পরকালে আল্লাহর দরবারেও চরম জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে।

ভয়াবহ এই সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ইসলামি মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা ও নৈতিক শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেবল তাদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাই নয়, বরং তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা, তাকওয়া ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষালয়গুলোকে এমন একটি নিরাপদ দুর্গে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে প্রতিটি শিশু কোনো ধরনের ভয় ও নির্যাতনের শিকার না হয়ে তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। সমাজের আলেম-ওলামা, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকেও এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা ইসলাম সমর্থন করে না।

আসুন, পবিত্র ইসলামের সুমহান ও ইনসাফভিত্তিক শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভালোবাসাময় পৃথিবী গড়ে তুলি। কারণ আজকের সুরক্ষিত ও সুস্থ শিশুই আগামী দিনের একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন আদর্শ সমাজের কারিগর।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

লুলার জয়, ট্রাম্পের জন্য লাতিন আমেরিকায় বড় ধাক্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:১৩ এম


লুলার জয়, ট্রাম্পের জন্য লাতিন আমেরিকায় বড় ধাক্কা

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে একটি অসাধারণ রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছেন। প্রথম রাউন্ডে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সমর্থিত ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে লুলার ৪৫ শতাংশের বিপরীতে এগিয়ে ছিলেন। এই ফলাফল তার সমর্থকদের মধ্যে পরাজয়ের শঙ্কা তৈরি করে। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে লুলা ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে চমকপ্রদ জয় লাভ করেন, যেখানে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পান।

লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে লুলার এই জয় নির্বাচনের পূর্ববর্তী সব জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করে রাজনীতিতে তার নাটকীয় পুনরুত্থান ঘটিয়েছে, যা খুব কম মানুষই আশা করেছিলেন। লুলার এই জয় কেবল কট্টর ডানপন্থিদের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে থামায়নি, বরং পুরো অঞ্চলে ডানপন্থিদের ধারাবাহিক নির্বাচনি জয়ের ধারাকেও ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপমূলক এজেন্ডার ওপরও বড় আঘাত হেনেছে।

প্রথম রাউন্ডে বলসোনারো অপ্রত্যাশিতভাবে লুলাকে পরাজিত করার পর সেই ফলাফল ব্রাজিলসহ পুরো অঞ্চলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। লুলার সরকারের শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে এই পরাজয় ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটের আগের তিন সপ্তাহে এক অসাধারণ রাজনৈতিক গণসংহতি গড়ে ওঠে, যা লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির ধীরগতির নির্বাচনি প্রচারণাকে ব্রাজিলের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রূপান্তরিত করে।

লুলার সরকারের গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের আশঙ্কা ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলের অর্থনীতি মোট ৯ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বেকারত্বের হার ২০২২ সালের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে, যা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এছাড়া জাইর বলসোনারোর শাসনামলে ব্রাজিল জাতিসংঘের ‘ক্ষুধা মানচিত্রে’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু লুলার আমলে দেশটি সেই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়ের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা তার পূর্বসূরির আমলের ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তবে লুলার শাসনামলে সবকিছুই যে খুব ভালো ছিল, তা নয়। লাখ লাখ ব্রাজিলীয় ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জালে আটকে পড়ে উচ্চ সুদের হারের সঙ্গে লড়াই করছেন। অনলাইন জুয়ার ব্যাপক বিস্তার অনেক পরিবারের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ফল এসব নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সমাজে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর জবাবে লুলা সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেন, যার মধ্যে ছিল ঋণ মওকুফের ব্যাপক উদ্যোগ, অনলাইন বাজি ধরার ওপর বিধিনিষেধ, সামাজিক সুবিধার পরিধি বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি প্রদান এবং কর্মসপ্তাহ ছয় দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন করা। এই নীতিগুলোর লক্ষ্য ছিল সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর সঙ্গে ভোটারদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক উদ্বেগের যোগসূত্র পুনঃস্থাপন করা।

অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো ভিন্ন এক রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে সরকারি ব্যয় ব্যাপক কমানো, বেসরকারীকরণ, কর হ্রাস এবং অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ছিল। তার প্রস্তাবের মধ্যে আরো ছিল এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগার ব্যবস্থার আদলে পাঁচটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগার নির্মাণ এবং ভারী অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া।

ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ফ্লাভিও তাকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও তিনি ক্ষমা করার অঙ্গীকার করেন। তার সমর্থকদের কাছে এটি ছিল বিচারিক নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হওয়া বিষয়গুলোকে উল্টে দেওয়ার একটি সুযোগ। অন্যদিকে বিরোধীদের মতে, এটি ছিল ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেওয়ার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করার হুমকি।

দ্বিতীয় রাউন্ডে তরুণ ভোটাররা তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে শুরু করলে লুলার নির্বাচনি প্রচারণায় নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়। এই প্রচারণা বলসোনারোর পক্ষে কাজ করা মেটা তথা ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টদের প্রচারণাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কেবল ব্রাজিলের গণতন্ত্র নয়, বরং দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়। কেননা লুলার পুরো মেয়াদজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে, দেশটির ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, জাইর বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রকাশ্যে ফ্লাভিওর প্রার্থিতাকে সমর্থন জানিয়েছে।

মে মাসে ট্রাম্প ওভাল অফিসে ফ্লাভিও বলসোনারোকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এর দুদিন পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধী সংগঠনকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন এবং এই পদক্ষেপটির জন্য ফ্লাভিও প্রকাশ্যেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এসব কর্মকাণ্ড ব্রাজিলের নির্বাচনি রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরো সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এবং ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’ বিরোধী সম্প্রসারণশীল যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেশটিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের পথও প্রশস্ত করতে পারে। বিশ্ব দেখেছে, কীভাবে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে এনে কারাগারে আটকে রেখেছে।

ট্রাম্প যখন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আধিপত্যের বলয়ে টেনে আনতে চাইছেন, লুলা তখন তা প্রতিরোধ করতে তার দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সংগঠিত অপরাধ দমনে যেকোনো সহযোগিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে। লুলা নির্বাচনকে জনগণের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাছাই হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যেখানে একদিকে ছিল নিজস্ব পথে চলা একটি সার্বভৌম ব্রাজিল, অন্যদিকে ছিল ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে নতিস্বীকার করা ব্রাজিল। রোববারের নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে, জনগণ সার্বভৌম ব্রাজিলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ফিরে আসার পর থেকে হন্ডুরাস, চিলি, বলিভিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে ডানপন্থি শক্তি নির্বাচনে একের পর এক জয় পেয়েছে। তবে লুলার পুনর্নির্বাচন ইঙ্গিত দেয়, ডানপন্থি সেই জোয়ার এখন স্তিমিত হয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ব্রাজিলের নির্বাচনের এই ফল লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের নেতৃত্বের শক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিয়মিত লুলার সমালোচনা করেন এবং ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে মিলেই ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন। চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের জনপ্রিয়তায়ও ধস নেমেছে।

অন্যদিকে লুলার বিজয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম। লুলা পরাজিত হলে শেইনবাম লাতিন আমেরিকায় আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন। কেননা এই অঞ্চলের অনেক দেশই মেক্সিকোর উত্তরের প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর বিপরীতে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল এবং বৃহত্তম অর্থনীতির দুটি দেশ ব্রাজিল ও মেক্সিকো অদূর ভবিষ্যতেও বামপন্থি আদর্শের পথেই যে অটল থাকবে, তা লুলার বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত করে দিয়েছে।

তবে লুলার বিজয়ে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থি প্রবণতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু তারপরও এ কথা বলা যায়, লুলার বিজয় লাতিন আমেরিকায় উগ্র ডানপন্থি ঢেউকে থামিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাদের আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ হবে না। যদিও ট্রাম্পের হুমকি এখনো রয়ে গেছে, তবে তার প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টি হয়তো এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে।

লুলার বিজয়ের তাৎপর্য ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিজয় গণতন্ত্র, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের সার্বভৌমত্বের প্রবক্তাদের কাছে কট্টর ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৭
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:২০
ইশা ০৬:৩২
সূর্যোদয় : ০৬:০৪ সূর্যাস্ত : ০৫:২০
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%