০২:২৪ এম
সালাম হলো ইসলামের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। এটি সামাজিক সৌন্দর্যের অন্যতম উদাহরণ। সালাম আদানপ্রদানের মাধ্যমে অন্তর থেকে হিংসাবিদ্বেষ দূর হয়ে যায়। এর ফলে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। রসুল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা প্রকৃত ইমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত ইমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসতে লাগবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার কর (তিরমিজি)।'
অনেকের মনে হতে পারে, সালাম তো স্রেফ এক সম্ভাষণ, যা অন্যান্য ধর্মেও আছে। তাহলে এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আসলে কোথায়? হ্যাঁ, সাধারণত পৃথিবীর সব ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠী ও সংস্কৃতিতেই বিভিন্ন ধরনের সম্ভাষণ প্রচলিত আছে। কিন্তু কোনোটায় কেবল সময়ের বন্দনা করা হয়, আবার কোথাও নিছক কুশলবিনিময় হয়। কিন্তু সালাম সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এটি একটি গভীর অর্থবহ দোয়া। সালামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের এর অর্থ ও তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।
আপনি যখন কাউকে সালাম দিচ্ছেন, তখন আপনি তাকে বার্তা দিচ্ছেন যে আমার পক্ষ থেকে আপনি নিরাপদ, আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুন এবং আপনার ওপর রহমত বর্ষিত হোক। এই বার্তার মাধ্যমে অপরিচিত দুই ব্যক্তির মাঝে যেমন মুহূর্তেই বিশ্বাস ও ভালোবাসা নির্মিত হয়, পরিচিতদের মধ্যে আরও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন: ইসরাইল নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সরকার গঠনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অধরাই
একটি পরিস্থিতির কথা কল্পনা করুন। বিশেষ প্রয়োজনে আপনি সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো জায়গায় গেছেন। সেখানকার মানুষ কিংবা পথঘাট কিছুই আপনার চেনা নয়। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আপনি প্রতি মুহূর্তে এক অজানা শঙ্কায় ভুগছেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, যারাই আপনার সামনে আসছেন, স্মিত হাসিমুখে সালাম দিচ্ছেন। অর্থাৎ আপনার শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। এমতাবস্থায় আপনার মনে কি আর কোনো ভয় থাকবে? থাকবে না। বরং সেই মানুষগুলোকে আপনার অতি আপন মনে হবে।
এটাই সালামের আসল শক্তি। সালামের মাধ্যমে মুসলমানরা পরস্পরের বিশ্বস্ত ভাই হয়ে ওঠে। এ কারণেই রসুল (সা.) চেনা-অচেনা সব মানুষের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচার-প্রসারের কথা বলেছেন।
সালাম প্রধানভাবে সম্প্রীতির বাহন। সালামের কত গুরুত্ব আমরা আরেকটি হাদিস থেকে বুঝতে পারি। একবার এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইসলামের কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম?' তিনি বললেন, 'অসহায়কে অন্নদান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে সালাম দেওয়া (বুখারি)।'
বর্তমান করপোরেট ও আধুনিক জীবনব্যবস্থায় অনেকে সালাম বিনিময়কে কিছুটা আনস্মার্টনেস মনে করেন। তারা পশ্চিমা কায়দায় হাই-হ্যালো বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু সত্য হলো যে সালামের চেয়ে রুচিশীল, গভীর ও আভিজাত্যপূর্ণ সম্ভাষণ আর দ্বিতীয়টি নেই। সালামের ভিতরে যে আন্তরিকতা আর আধ্যাত্মিক সংযোগ থাকে, তা আর কোনো শব্দে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে, লিকুদ পার্টি এগিয়ে
সালাম মানুষকে বিনয়ী ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী করে তোলে। সাময়িক ঝগড়াবিবাদ কিংবা রাগের বশবর্তী হয়ে যে ব্যক্তি নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তার চেয়ে সেই ব্যক্তি অনেক উত্তম, যে অহম ভেঙে সবার আগে সালাম দেয়। রসুল (সা.) বিবদমান দুজনের মাঝে আগে সালাম প্রদানকারীর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, 'কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন রাখা বৈধ নয়। তাদের দেখা হলে একজন একদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, অন্যজন অন্যদিকে। তবে তাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উত্তম, যে আগে সালাম দেয় (বুখারি)।'
আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সালামের ব্যাপক চর্চা প্রয়োজন। আমরা যদি শৈশব থেকেই সন্তানদের সালামের শিক্ষা দিই, তবে তাদের হৃদয়ে বিনয়, সৌজন্য ও পরমতসহিষ্ণুতার বীজ রোপিত হবে। ঘরে প্রবেশের সময় পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া, ছোটদের স্নেহভরে সালাম দেওয়া কিংবা একে অপরকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা- এসব ছোট ছোট আমল একটি পরিবার ও সমাজকে শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির জান্নাতি পরিমণ্ডলে পরিণত করতে পারে।
সালাম হলো সেই চাবি, যা দিয়ে রুদ্ধ হৃদয়ের দুয়ার খোলা যায়। এটি আমাদের দুনিয়ার জীবনে যেমন নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সৌহার্দের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে, তেমনি আখেরাতে বয়ে আনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অফুরন্ত সওয়াব। তাই আসুন, আমরা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সালামের ব্যাপক চর্চা ও প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হই। চেনা-অচেনা সবাইকে সালামের মাধ্যমে দোয়া ও কল্যাণের বার্তা পৌঁছে দিই। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ স্থলভাগে প্রবেশ, উপকূলে তাণ্ডবের আশঙ্কা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন