০৩:০৮ এম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি কিছু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। দ্রত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা এসব লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে।
যখন ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়, তখন বোঝা যায়, সরকার এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। তবে এর ভেতরে কিছু কঠিন আপসও স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: রিজভী: বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দিয়েছিল আওয়ামী সরকার
মোট সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও, এর বড় একটি অংশ সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য নিয়মিত খাতে চলে যায়। এর মানে হল, উন্নয়ন প্রকল্প অথবা নতুন সেবায় ব্যয়ের জন্য সরকারের প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা সরাসরি উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে, ব্যয়ের অগ্রাধিকারে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ, প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি জীবনমান এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, এই বাড়তি বরাদ্দ কতটা বাস্তব ফল বয়ে আনবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষভাবে ব্যবহার হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সেবার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হবে। যেমন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ সরবরাহ এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে, শিক্ষা খাতে ব্যয় তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন তা শিক্ষার মান এবং কর্মসংস্থানের উপযোগিতা বাড়াবে।
সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমও কার্যকর হবে, যখন সহায়তা সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়েও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকার একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতেও চায়। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্বলতার বড় একটি অংশ সরবরাহজনিত, যেমন—জ্বালানি সংকট, ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা, আমদানি সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা। এই পরিস্থিতিতে, কেবল সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নাও হতে পারে, যদি না উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এসব বাধা দূর করা যায়।
আরও পড়ুন: সরকারকে সেলিম উদ্দিনের আহ্বান, গণরায়ের বিরুদ্ধে না গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়ান
পরিশেষে, নাগরিকরা বাজেটকে ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে নয়, বরং এর ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবে। হাসপাতালের সেবা, শিক্ষার মান, সামাজিক সহায়তার কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে। ব্যয়ের পরিকল্পনা সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো—এই বরাদ্দ বাস্তবে মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।
লেখক : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন